kalerkantho


শখ

রেসার কবুতরের হাট

তৌফিক মারুফ   

১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রেসার কবুতরের হাট

বুড়িগঙ্গার ওপারে হাসনাবাদে প্রতি শনিবার বসে রেসার কবুতরের হাট। ছবি : কালের কণ্ঠ

অতীতের কবুতরের পায়ে করে চিঠি পাঠানোর নানা গল্প আজও শোনে নতুন প্রজন্ম। কিছুকাল আগেও কবুতরের পায়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের খবর আসে বিদেশ থেকে।

কিন্তু এটি এখন বাংলাদেশেরও বাস্তবতা। সেটি হচ্ছে প্রযুক্তির সাহায্যে ‘কবুতর রেস’। সহজ কথায় যেটিকে বলা যায় পায়রা ‘দৌড়’ প্রতিযোগিতা। এতে অংশগ্রহণকারী কবুতরগুলোকে বলা হয় ‘রেসার কবুতর’। ভেতরে ভেতরে সচ্ছল পরিবারের তরুণদের মধ্যে এ প্রতিযোগিতা কতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তা দেখা গেল সম্প্রতি এক কবুতরের হাটে।

বুড়িগঙ্গার ওপারে—ঢাকা থেকে পোস্তগোলা সেতু পার হয়ে বাঁয়ে পানগাঁও কনটেইনার ডিপো কিংবা বসুন্ধরা রিভারভিউ এলাকার দিকে ঘুরে হাসনাবাদে পড়তেই পথ আটকে যায় মানুষের ভিড়ে। তবে প্রতিদিন নয়, প্রতি শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে এই কবুতরের হাট। কেবলই এটি পোষা কবুতর বেচাকেনার হাট। পাঁচ-ছয় শ থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা দামেরও একেকটি কবুতর মেলে এই হাটে।

রং-রূপে যেমন বাহার, নামেও রয়েছে বাহারি ঢং। কেবল স্থানীয় ভাষায় ‘চিলা চৈথাল’ই নয়, দোবাজ, পাংকি, সিরাজি, আরমি, হোমা, নাটিং, নান আরো কত-কী!

গত ২৮ অক্টোবর শনিবার ওই হাটে থামতেই চোখে পড়ে একটি খাঁচায় চিলা চৈথালের পাশে গলা ফুলিয়ে হাঁটাহাঁটি করছে রেসার। রেসারের পায়ে রিংয়ের মতো কিছু একটা দেখা যায় একটু কাছে গেলেই। রিং কিসের? প্রশ্ন শুনে বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এইটা রিং না, এইটা হইছে সেন্সর। এইটা মেশিনের লগে লাগাইলেই বোঝা যাইব কত দূর পথ উড়ছে। ’

মাপার দরকার কী? রফিকুল এবার বেশ ভাব নিয়ে বলেন, ‘এইডা কী কইলেন? আপনে তো দেখছি এই জমানার কইতরের কোনো খোঁজখবরই রাখেন  না। এই রেসার কইতর দিয়ে এখনের পোলাপানে বাজি খেলে। ঢাকা থেকে পোলাপান এই কইতর লইয়া চট্টগ্রাম কিংবা খুলনা কিংবা দিনাজপুর যায় গিয়া। সেখানে গিয়ে এই কইতর ছাইড়্যা দিয়া আসে। পরে ঠিক ঠিক এই কইতর উড়াল দিয়া ঢাকায় যার যার বাসাবাড়িতে আসে। পরে এর মালিকরা যার যার কইতর মেশিনে বসাইয়া এর সেন্সরে ওঠা দূরত্ব দেখতে পায়। যার কইতর বেশি উড়ছে সে বাজিতে জিত্যা যায়। ’

রফিকুলের কথা শুনতে শুনতেই হাটে ভিড় করা মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখা যায় ক্রেতাদের প্রায় সবাই কিশোর বা তরুণ বয়সের। দৃশ্যত বেশির ভাগ সচ্ছল বা বিত্তবান পরিবারের সন্তান বলেই মনে হয়। কেউ কেউ আশপাশে পার্কিং করে রেখেছে দামি গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল।

ঢাকার ধানমণ্ডির একটি ইংলিশ মিডিয়ার স্কুলের ছাত্র রূপম তার এক বন্ধুকে নিয়ে এসেছে কবুতরের হাটে। জানতে চাইলে বলে, ‘বাসায় আমি ছোট সময় থেকেই কবুতর পুষি। আব্বু-আম্মু এটা পছন্দ করেন। এই হাটে আরো এসেছি। আজ এসেছি নতুন কোনো ভালো জাতের কবুতর পাওয়া যায় কি না, তা দেখতে। ’

পুরান ঢাকার বাসিন্দা ও একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আহনাফ বলেন, ‘মাঝেমধ্যেই কবুতরের রেস হয়। এটা বেশ মজার। অনেক দূরে দূরে উড়তে পারে এই কবুতরগুলো। আরো মজা হচ্ছে, এগুলো কিভাবে যেন খুব সহজে বাসা চিনতে পারে। আপনি কোথাও নিয়ে ছেড়ে দিয়ে আসবেন। সে ঠিকই বাসায় এসে হাজির হয়ে যাবে। ’ বিক্রেতা রিমন জানান, প্রতি শনিবার এ হাটে প্রায় ৩০০ বিক্রেতার কাছে কয়েক হাজার কবুতর থাকে, যেখানে রেসার ছাড়াও অন্য সব কবুতরও পাওয়া যায়।

এই শৌখিন কবুতর পালকদের আছে বেশ শক্তিশালী সংগঠন। সারা দেশেই কমবেশি সংগঠিত আছেন এই কবুতর পালকরা। কোনোটি ক্লাব, আবার কোনোটি অ্যাসোসিয়েশন নামে চলছে সংগঠনগুলো; যাদের মাধ্যমে কখনো একই শহরের এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়, আবার কখনো দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে টুর্নামেন্ট। এর বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে সব সময়ই ছোট ছোট গ্রুপের রেস চলতে থাকে।

বাংলাদেশ রেসিং পিজিওন ফেনসিয়ার্স ক্লাবের সহসভাপতি মোহাম্মদ শরীফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কবুতর পোষা অনেক পুরনো একটি প্রচলন। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে আমরা এই প্রচলন ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করছি। আমরা মনে করি, এতে সমাজে ইতিবাচক একটি প্রভাব পড়বে। অশুভ চিন্তাভাবনা থেকে নতুন প্রজন্ম দূরে থাকতে পারবে; বিশেষ করে এটি মাদক কিংবা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ থেকে দূরে রাখার বড় একটি উপায় হতে পারে। সব পরিবারেই সন্তানদের কবুতর পালনে উদ্বুদ্ধ করা উচিত। ’

কবুতর বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে কবুতরের প্রায় ২০টি বিভিন্ন জাত রয়েছে। উল্লেখযোগ্য জাতগুলো হচ্ছে, গিরিবাজ (রেসার), রোলার লোটন, জালালি, গোলা ও সিরাজি। বিদেশি জাতগুলো হলো, কিং, ফ্যানটেল (ময়ূরপঙ্খি), জাকোবিন, মুকী, টিপলার, ফ্রিলব্যাক ও গ্যালাতি রোলার। কবুতর পালনে প্রাপ্যতা অনুযায়ী যেকোনো জাত ব্যবহার করা যায়। সপ্তাহকাল একত্রে রাখলে এদের মধ্যে ভাব ও মিলন হয় এবং একত্রে জোড় বাঁধে। একটি স্ত্রী কবুতর প্রতিবার দুটি করে ডিম দেয়। কবুতরের ডিম ফুটে ছানা বের হতে ১৭-১৮ দিন সময় লাগে। কবুতর সাধারণত ১৬ থেকে ২০ বছর বেঁচে থাকে।


মন্তব্য