kalerkantho


আশরাফের সঙ্গে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে বিএনপিকে

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আশরাফের সঙ্গে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে বিএনপিকে

কিশোরগঞ্জ-১ (সদর ও হোসেনপুর) আসনে দলীয় মনোনয়ন ও নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। কারণ জাতীয় সংসদের ১৬২ নম্বর এই নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভূমিকা ও ত্যাগ কিশোরগঞ্জবাসী আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তাঁর ছেলে সৈয়দ আশরাফের হাতেই এ আসনের ‘রাজদণ্ড’। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, সততা, জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এ নেতার অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানের ওপরই নির্ভরতা আওয়ামী লীগের। তাই এখানে তিনি ছাড়া আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থীর কথা শোনা যায় না।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ মনে করে, রাজনীতি ও দলে বড় কোনো ঘটনা না ঘটলে এ আসনে সৈয়দ আশরাফই হবেন সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী। তাই এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা নিয়ে কোনো মাতামাতি, উত্তেজনা বা সংশয় নেই।

অন্যদিকে নির্বাচন ও দলের মনোনয়ন নিয়ে বিএনপিতেই চলছে নানামুখী আলোচনা ও দৌড়ঝাঁপ। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। সমর্থকদের নিয়ে মতবিনিময়সভা করছেন। নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করে দোয়া ও সমর্থন চেয়ে এলাকায় ব্যানার, পোস্টার লাগাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার এসবে না গিয়ে কেন্দ্রমুখী হয়ে মনোনয়নের প্রত্যাশা করছেন।

জানা গেছে, নেতৃত্ব নিয়ে জেলা বিএনপি আগে থেকেই বিভক্ত। নির্বাচনকে সামনে রেখে এটি আরো বেড়েছে। দীর্ঘদিন পর ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর জেলা বিএনপির সম্মেলন হলেও দলে যে বিভক্তি ছিল, সেটা রয়েই গেছে। বরং দলের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ নিষ্ক্রিয় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য, বর্তমান জেলা কমিটির উপদেষ্টা মাসুদ হিলালী, সহসভাপতি ঢাকা বিভাগীয় সাবেক স্পেশাল জজ রেজাউল করিম খান চুন্নু ও আরেক সহসভাপতি ওয়ালি উল্লাহ রাব্বানীর নাম উল্লেখযোগ্য। কমিটির হয়ে কাজ না করলেও তাঁরা আগামী নির্বাচনে দলের হয়ে নির্বাচন করতে চান বলে শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে জেলা কমিটিতে খুবই সক্রিয় কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ ছাত্রসংসদের সাবেক দুই সহসভাপতি (ভিপি) জেলা বিএনপির প্রথম যুগ সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল ও সাংগঠনিক সম্পাদক ইসরাইল মিয়া প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে মনোনয়ন লড়াইয়ে নেমেছেন। এ ছাড়া কমিটির বাইরে থাকা বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্য সেলের সদস্যসচিব সালাউদ্দিন আহমেদ সেলু দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কেউ কেউ মনে করেন, শুধু মাঠে দৌড়ঝাঁপই মনোনয়ন পাওয়ার মাপকাঠি নয়; একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। কাজেই প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখবে কেন্দ্র।

আওয়ামী লীগ : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সৈয়দ আশরাফ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এর আগের তিনটি নির্বাচনে তিনি বিএনপি প্রার্থী মাসুদ হিলালীকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন। সব মিলিয়ে তিনি পর পর চারবার নির্বাচিত হয়েছেন এই আসন থেকে।

দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করে, এলাকায় কম গেলেও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। তা ছাড়া বড় কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণেও কিশোরগঞ্জবাসীর মুখে মুখে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়। জাতীয় চার নেতার একজন মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে হিসেবেও বাড়তি কদর রয়েছে সৈয়দ আশরাফের। এ কারণে সামনের নির্বাচন নিয়ে এ আসনে আওয়ামী লীগ একটা স্বস্তির জায়গায় রয়েছে। কারণ এখানে তাদের একমাত্র প্রার্থী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। 

তবে দলের কেউ কেউ মনে করেন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগহীনতা ও এলাকায় না আসার কারণে সৈয়দ আশরাফের প্রতি অভিমান ও ক্ষোভ রয়েছে। তাঁরা মনে করেন, নেতাকে দূরের নক্ষত্র হয়ে থাকলে চলে না, সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা দিতে হয়, তাদের দুঃখ-কষ্ট শুনতে হয়। তবে তাঁরাও মনে করেন, এ দিকটা ছাড়া সৈয়দ আশরাফের আর কোনো দুর্বলতা নেই।

২০০৮ সালে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হওয়ার পর নিজ এলাকায় তাঁর বাবার নামে একটি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন, নরসুন্দা প্রকল্পসহ বেশ কিছু বড় প্রকল্প হাতে নেন। এগুলোর কাজও প্রায় শেষের পথে। দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান দুবার। আওয়ামী লীগ এই নেতার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করেই মূলত আগামী নির্বাচনের ছক কষছে।

বিএনপি : ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি কিশোরগঞ্জে বিরাট সাফল্য পায়। তখন জেলার সাতটি আসনের মধ্যে সদরসহ পাঁচটিতেই জয়ী হন দলের প্রার্থীরা। দলটির নেতাকর্মীদের মতে, নেতাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কোন্দলের কারণে এরপর আর কোনো নির্বাচনে সুবিধা করতে পারেনি বিএনপি।

সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে তিনবার নির্বাচন করে হেরেছেন জেলা বিএনপির উপদেষ্টা মাসুদ হিলালী। তিনি বর্তমানে দলীয় রাজনীতিতে একেবারেই যুক্ত নন। তবে কোনো গ্রুপের সঙ্গেও ওইভাবে নিজেকে জড়াননি। বর্তমান জেলা নেতৃত্বের প্রতি তাঁর প্রচুর ক্ষোভ রয়েছে। তিনি মনে করেন, এই নেতৃত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

দলীয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর যথেষ্ট প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা এখনো বিদ্যমান। বিএনপির তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী মনে করে, আগামী নির্বাচনে তাঁর প্রার্থী হওয়া উচিত। কিন্তু অনেকটা অভিমানের সুরেই মাসুদ হিলালী বলেন, ‘আমি আর মনোনয়নের জন্য কারো কাছে ধরনা দেব না। যদি দল আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে হয়তো নির্বাচনী মাঠে দেখতে পাবেন আমাকে।’

কিশোরগঞ্জে জেলা বিএনপির কোনো কার্যালয় নেই। রেজাউল করিম খান চুন্নু বিচার বিভাগের চাকরি ছেড়ে ২০০৬ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর শহরের স্টেশন রোডে ব্যক্তিগত জায়গায় সদর উপজেলা বিএনপির বিশাল কার্যালয় স্থাপন করেন। সদরের সভাপতি হিসেবে এ কার্যালয় থেকে তিনি দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। বর্তমান জেলা কমিটির বিরুদ্ধে তাঁরও অনেক অভিযোগ।

তিনি বলেন, ‘জেলার সব কমিটি ভেঙে নতুনভাবে করা হলেও কেবল সদর ও পৌর কমিটি গঠন করা হয়নি। চার বছর ধরে এভাবে চলছে। মূলত আমাকে কোণঠাসা করতে এসব করছে জেলা নেতৃত্ব।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি সারা দেশের জজ অ্যাসোসিয়েশনের তিনবার নির্বাচিত মহাসচিব ছিলাম। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ও ভাইস চেয়ারম্যান ছিলাম। ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সহসভাপতিও করা হয়েছিল আমাকে। কাজেই পদ দিয়ে ধাক্কাধাক্কি আর ভালো লাগে না।’

আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে শতভাগ আশাবাদী জানিয়ে রেজাউল করিম খান বলেন, ‘জেলা বিএনপির কোনো নেতার হাত ধরে আমি রাজনীতিতে আসিনি। গুরুত্ব বহন করি বলেই তারেক জিয়া নিজে আমাকে দলে এনেছেন। কাজেই দলীয় মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে আমার কোনো সংশয় নেই।’

জেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল প্রায় দুই ডজন মামলার আসামি। বেশ কয়েকবার জেল খেটেছেন। সাজার রায়ও হয়েছে তিনটি মামলার। বর্তমানে জামিনে মুক্ত হয়ে দলীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য জনসংযোগ করছেন এলাকায়। দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, ‘মাঠে-ময়দানে অনেক পরীক্ষা দিয়েছি। এবার এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চাই।’

জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইসরাইল মিয়াও এ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পেতে এলাকায় কাজকর্ম করছেন। তাঁর সমর্থকরা জানায়, দলীয় আনুগত্য আর নিবেদিতপ্রাণ নেতা হিসেবে কর্মীদের মধ্যে তাঁর যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আটবার জেল খেটেছেন।

মনোনয়ন প্রসঙ্গে ইসরাইল মিয়া বলেন, ‘আমি মানুষকে নিয়ে কাজ করি। এ কারণে লোকজন আমাকে পছন্দ করে। এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের সঙ্গে থাকতে চাই বলে এ আসন থেকে মনোনয়ন চাই আমি। দল মনোনয়ন দিলে অবশ্যই নির্বাচন করব।’

স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত না হলেও কেন্দ্রীয় বিএনপির তথ্য সেলের সদস্যসচিব সালাউদ্দিন আহমেদ সেলু এ আসন থেকে মনোনয়ন চান। তিনি একসময় কিশোরগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর সমর্থকরা মনে করে, বর্তমান জেলা কমিটিতে তাঁর কোনো পদ-পদবি না থাকলেও নেতাকর্মীদের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

সালাউদ্দিন আহমেদ সেলু বলেন, ‘এর আগেও আমি দলের মনোনয়ন চেয়েছিলাম, তবে দল আমাকে দিতে পারেনি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও মনোনয়ন চাইব, দল মনোনয়ন দিলে কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচন করব।’

জেলা বিএনপির সহসভাপতি ওয়ালি উল্লাহ রাব্বানী অনেক দিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় নন। তবে তিনিও এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। তাঁর সমর্থকরা মনে করে, তিনি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতা। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে দল ভুল করবে না।



মন্তব্য