kalerkantho


আ. লীগ-বিএনপির প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে তরুণরাও

ফরিদুল করিম, নওগাঁ   

২৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



আ. লীগ-বিএনপির প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে তরুণরাও

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে এরই মধ্যে নওগাঁ-২ (পত্নীতলা-ধামইরহাট) আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। দুই দলেই রয়েছেন একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগে এক রকম গোপন লড়াই চলছে নিজেদের মধ্যে। আর বিএনপিতে বলতে গেলে এ ‘যুদ্ধ’ চলছে প্রকাশ্যে। দুই দলেরই পুরনোদের সঙ্গে তরুণরাও প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে শামিল হয়েছেন।

আসনটি জাতীয় সংসদের ৪৭ নম্বর নির্বাচনী এলাকা। ভারতের সীমান্তঘেঁষা এ আসনের দুটি উপজেলাই আয়তনে বেশ বড়। মূলত উন্নতমানের ধান উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এ এলাকা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য বলা চলে মর্যাদার লড়াই। আসনটি দখলে রাখতে ক্ষমতাসীনদের এবং পুনরুদ্ধারে নামতে হবে বিএনপিকে।

রাজনৈতিক কারণে নওগাঁ জেলার ছয়টি আসনের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর মধ্যে নওগাঁ-২ আসনটি অন্যতম। এখানে ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ১৭ হাজার ৭২৬।

এর মধ্যে পত্নীতলা উপজেলায় এক লাখ ৭৭ হাজার ২০৫ এবং ধামইরহাট উপজেলায় এক লাখ ৪০ হাজার ৫২১ জন ভোটার রয়েছেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনোনয়ন আলোচনায় আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য শহীদুজ্জামান সরকারসহ অন্তত পাঁচজনের নাম আসছে। অন্যরা হলেন নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক, নজিপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র আমিনুল হক, দলের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক প্রকৌশলী ড. আখতারুল আলম, সাবেক সচিব কাজিমদার ওয়ালিউল ইসলাম ও মাহমুদ রেজা মেহেদী। অন্যদিকে বিএনপিতে সাবেক সংসদ সদস্য সামসুজ্জোহা খান জোহা, নওগাঁ বিএনপির সহসভাপতি খাজা নাজিবুল্লাহ চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম লিটন মাঠে কাজ করছেন। জাতীয় পার্টি থেকে হুমায়ন কবির চৌধুরী ও আবিদা আক্তার মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া বিকল্পধারা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আব্দুর রউফ মান্নান ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ধামইরহাট উপজেলা শাখার আহ্বায়ক দেব লাল টুডু নির্বাচন করতে পারেন।



আওয়ামী লীগ : বর্তমানে জাতীয় সংসদে সরকারি দলের হুইপ শহীদুজ্জামান সরকার ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলের টিকিটে প্রথমবার নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী সামসুজ্জোহা খানের কাছে পরাজিত হন। তবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার তিনি বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দশম সংসদ নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিল না। শহীদুজ্জামান আগামী নির্বাচনেও দলের মনোনয়ন চান। দল মনোনয়ন দিলে আসনটি আবার আওয়ামী লীগের দখলে আনতে সক্ষম হবেন বলে তিনি আশাবাদী।

দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে এবং এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকার উন্নয়নে সংসদ সদস্য শহীদুজ্জামান সরকারের কৃতিত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে। তবে এমন অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

নওগাঁয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনা মানুষ হিসেবে শহীদুজ্জামান সরকারের খ্যাতি আছে। তিনি বিভিন্ন সময় ঐতিহাসিক স্থানগুলো সংরক্ষণের বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।

স্থানীয় সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিরা মনে করে, শহীদুজ্জামানের মতো একজন মননশীল মানুষের প্রয়োজন এ আসনে। তারা মনে করে, আগামী দিনে হয়তো এই স্থান হয়ে উঠবে পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় কেন্দ্র।

উল্লেখ্য, পত্নীতলা ও ধামইরহাট উপজেলা প্রাচীন নিদর্শনে ভরপুর। ধামইরহাটে রয়েছে জাতীয় উদ্যান আলতাদীঘি-শালবন, মুসলিম নিদর্শন মাহী সন্তোষ (মুসলিম শাসকের টাঁকশাল ছিল), ভীমের পান্টি (গুরুর স্তম্ভ), জগদ্দল পদ্ম মহাবিহার, আগ্রাদ্বীগুন মহাবিহার। পত্নীতলায় রয়েছে দিবর দীঘি ও দিব্যক জয়স্তম্ভসহ নানা নিদর্শন।

সংসদ সদস্য শহীদুজ্জামান সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নেত্রী নির্বাচন করতে বললে নির্বাচন করব। আমি এত দিন এলাকার জন্য কী কাজ করেছি, সে বিষয়ে শেষ কথা বলবে জনগণ। আমি এলাকার উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করেছি। শতভাগ সফল হয়েছি—এ দাবি আমি করব না। সফলতা-ব্যর্থতা তো আমার আছে। আমার ব্যর্থতা যা আছে, আগামী দিনে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করব। ’

এদিকে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেতে কাজ করছেন মাহমুদ রেজা মেহেদী। বয়সে তরুণ এ মনোনয়নপ্রত্যাশী বলেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। এর আগেও তিনি এ আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তিনিও এরই মধ্যে এলাকায় ফেস্টুন-ব্যানার টানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এলাকার যুব সম্প্রদায় তাঁর সঙ্গেই থাকবে। তিনি ব্যবসার কারণে ঢাকায় থাকলেও নিয়মিত এলাকায় আসেন। বন্যার্তদের মাঝেও নাকি এবার তিনি তাঁর একটি সংস্থার সহযোগিতায় ত্রাণ বিতরণ করেছেন।

মাহমুদ রেজা বলেন, ‘আমি মনোনয়ন পেলে সবাই আমার সঙ্গে কাজ করবেন। আমি এলাকায় থাকলে মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে পর্যায়ক্রমে ইংরেজির ক্লাস করাই শিক্ষার্থীদের। এলাকায় পর্যটন নিয়েও ভাবনা রয়েছে। আগামী নির্বাচনে দল যদি আসনটি ধরে রাখতে চায়, তবে আমাকে মনোনয়ন দিলে সেটা সম্ভব হবে। ’ বিরোধী দল নিয়ে চিন্তার অবকাশ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আওয়ামী লীগের অনেক এমপি মনে করেন তিনি দলের এমপি নন, বরং দলই এমপির। ’

বিএনপি : নওগাঁ-২ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য সামসুজ্জোহা খান জোহা, দলের জেলা শাখার সহসভাপতি খাজা নাজিবুল্লাহ চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম লিটন মনোনয়ন আলোচনায় আছেন। তাঁদের মধ্যে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও খাজা নাজিবুল্লাহ মনোনয়ন চেয়েছিলেন। আগামী নির্বাচনেও মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে গণসংযোগ, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কর্মিসভা করার পাশাপাশি দলের কেন্দ্র পর্যায়ে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সামসুজ্জোহা খান জোহা মনে করছেন দলের মনোনয়ন তিনিই পাবেন। এ আসনে তিনি তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাই আগামী নির্বাচনেও যে তিনি প্রার্থী হচ্ছেন এ ব্যাপারে নিশ্চিত সাবেক এ সংসদ সদস্য।

সামসুজ্জোহা খান জোহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে বিএনপির প্রার্থীর কোনো পরিবর্তন হবে না। আমার সময় এলাকায় যে উন্নয়ন হয়েছে, তার ধারেকাছেও কেউ আসতে পারবে না। আমি বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) ব্যাটালিয়ন স্থাপন করেছি। সড়ক, সেতু, কালভার্ট নির্মাণ করে পত্নীতলা-ধামইরহাটের প্রত্যন্ত এলাকার সঙ্গে সদরের যোগাযোগ স্থাপন করেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছি। ভোটের বিচার জনগণ করবে। আশা করি, আমি ভালো করব। ’

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা বিএনপির তরুণ নেতা খাজা নাজিবুল্লাহ চৌধুরী আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আশায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এলাকার তরুণদের মাঝে দলের রাজনীতির জোয়ার এনেছেন তিনি। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে মনোনয়ন চেয়ে এলেও দল তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি এলাকাবাসীর কাছে কাছেই থেকেছেন। তিনি ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে নিজের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। এসব বিবেচনায় খাজা নাজিবুল্লাহ চৌধুরীকে বিএনপির একজন যোগ্য প্রার্থী বলে মনে করে নেতাকর্মীদের অনেকেই। তারা বলছে, নাজিবুল্লাহ চৌধুরীর সঞ্চয়ে রয়েছে দেশ-বিদেশের বহু অভিজ্ঞতা, যা থেকে এ তরুণ নেতা এলাকায় উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারবেন।

খাজা নাজিবুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তরুণ নেতৃত্বই এখন জনপ্রিয়। ওপরের নির্দেশেই আমি মাঠে কাজ করে যাচ্ছি। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আমার সঙ্গে আছে। আমি এ আসনে মনোনয়ন পেলে জয়ের বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত। আমি বরাবর এ এলাকার মানুষের সঙ্গে ছিলাম, এখনো আছি। ’ তিনি আরো বলেন, ‘পত্নীতলায় চিনামাটির খনি আছে। এটির বিষয়ে কখনো কেউ উদ্যোগী হয়নি। আমি নির্বাচিত হয়ে এলে খনির বিষয়ে উদ্যোগী হব। এলাকার জনগণের দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ হবে। স্বাবলম্বী হতে পারবে এলাকার মানুষ। ’

জাতীয় পার্টি : বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নওগাঁ জেলা কমিটির সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য বি এম হুমায়ন কবির চৌধুরী আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া দলের জেলা কমিটির সদস্য আবিদা আক্তারও মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে আলোচনা রয়েছে।


মন্তব্য