kalerkantho


দুর্ঘটনা কমাতে চাই বিজ্ঞানভিত্তিক সড়ক

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আজ থেকে জাতীয় দিবস

আশরাফ-উল-আলম   

২২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



দুর্ঘটনা কমাতে চাই বিজ্ঞানভিত্তিক সড়ক

‘সাবধানে চালাব গাড়ি, নিরাপদে ফিরব বাড়ি’—এই প্রতিপাদ্যে আজ রবিবার পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এই প্রথম জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে দিবসটি।

দেশের প্রতিটি জেলায় সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো সংগঠন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)-এর উদ্যোগে এত দিন প্রতিবছর দিবসটি পালন করা হতো। ১৯৯৩ সাল থেকে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে গঠিত এই সংগঠন দিবসটি পালন করে আসছে।

নিসচার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ জুন মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয়ভাবে দিবসটি পালনের অনুমোদন দেন। এ কারণে সরকার এ বছর থেকেই জাতীয়ভাবে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

দুর্ঘটনা কমাতে বিশেষজ্ঞ মত : সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক সড়ক-মহাসড়ক তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. শামসুল হক। জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মহাসড়ক হচ্ছে বিপজ্জনক গতিপথের রাস্তা। আর তাই মহাসড়ক হতে হবে নির্বিঘ্নে চলাচলের উপযোগী।

মহাসড়কে গাড়ি ছাড়া প্রাণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।

মহাসড়কে পথচারীরা ঢুকতে পারবে না। ’

বুয়েটের পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করে এই গবেষক বলেন, মহাসড়কে দুর্ঘটনার মধ্যে পথচারী নিহত হয় ৫৪ শতাংশ। মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হয় ১৩ শতাংশ। পেছনের গাড়ি সামনের গাড়িকে ধাক্কা দেওয়ায় প্রাণহানি হয় ১১ শতাংশ লোকের। অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি উল্টে প্রাণ হারায় ৯ শতাংশ লোক। এ ছাড়া বাকিরা অন্যান্যভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয়।

এই পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করে ড. শামসুল হক বলেন, দুর্ঘটনায় একসঙ্গে অনেক লোকের প্রাণহানি হলেই সেটা গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। কিন্তু নীরবে প্রাণ হারায় পথচারীরা, যা গণমাধ্যমে অনেক সময় প্রকাশ হয় না।

ড. শামসুল হক বলেন, কোটি কোটি টাকা খরচ করে রোড ডিভাইডার নির্মাণ, সড়ক চার লেন, আট লেনে উন্নীত করলে দুর্ঘটনা কমবে না। সেখানে পথচারী চলাচলের আলাদা লেন, অযান্ত্রিক যান চলাচলের আলাদা লেন থাকতে হবে। মানুষ পারাপারের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাহলেই দুর্ঘটনা কমবে। পৃথিবীর সব দেশেই এমন ব্যবস্থা রয়েছে।

ড. শামসুল হক আরো বলেন, পথচারী মৃত্যুর সংখ্যাগত দিক বিবেচনায় নিয়ে মহাসড়ক নির্মাণে গুরুত্ব দিতে হবে। সত্যিকার অর্থে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা সামনে নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক রাস্তা তৈরি করলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমবে।

তবে মুখোমুখি সংঘর্ষের বিষয়টি উল্লেখ করে এই গবেষক বলেন, রোড ডিভাইডার থাকলে হয়তো মুখোমুখি সংঘর্ষের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সে কারণে রোড ডিভাইডার তৈরির পাশাপাশি প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত মহাসড়ক প্রয়োজন। এটিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

দুর্ঘটনার কারণ : বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনা গবেষণা সেন্টার এআরআই দেখেছে, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, নির্ধারিত গতিসীমা না মানা, মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য পরিবহন, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করা, প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চালানো, সামনের গাড়ির সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রাখা, চালকের বদলে সহকারী দিয়ে গাড়ি চালানো, যথাসময়ে যথোপযুক্ত সংকেত দিতে ব্যর্থতা, যথাযথ লেনে গাড়ি না চালানো ও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

নিসচার কর্মসূচি : এবারের নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে নিসচা মাসব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে। এরই মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শিক্ষার্থীদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার, আলোচনা, শোভাযাত্রা করেছে সংগঠনটি। নিরাপদ নামে স্মরণিকা, পোস্টার, লিফলেট প্রকাশ করেছে।

আজও সভা, সেমিনার, শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে নিসচা। প্রতিষ্ঠার ২৪ বছরে দেশব্যাপী সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে সংগঠনটি। সমর্থন পেয়েছে নিসচার কর্মসূচিগুলো। সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। তাদের পাশাপাশি সরকারের স্বীকৃতিতে তাই এবার অন্য রকমভাবে পালিত হচ্ছে দিবসটি।

প্রেক্ষাপট : ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এক সড়ক দুর্ঘটনায় ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন মারা যান। এর আগে ১৯৮৯ সালে ইলিয়াস কাঞ্চনও একবার আহত হন সড়ক দুর্ঘটনায়। স্ত্রী নিহত হওয়ার পর ইলিয়াস কাঞ্চন সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে প্রতিষ্ঠা করেন নিসচা। এটি এখন একটি সফল সামাজিক আন্দোলন।

 


মন্তব্য