kalerkantho


চট্টগ্রাম ও সিলেটে অভ্যন্তরীণ কোন্দল

ছাত্রলীগে দুই গ্রুপে সংঘর্ষ নিহত ১, আহত ২৭

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ও সিলেট অফিস   

১৭ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



ছাত্রলীগে দুই গ্রুপে সংঘর্ষ  নিহত ১, আহত ২৭

সিলেটে প্রতিপক্ষের হাতে নিহত ছাত্রলীগকর্মীর স্বজনদের আহাজারি। ইনসেটে নিহত ওমর আহমদ মিয়াদ।ছবি : কালের কণ্ঠ

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গতকাল সোমবার একই দিনে সিলেট ও চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে এক কর্মী নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছে।  

সিলেটের টিলাগড় এলাকায় প্রতিপক্ষ গ্রুপের হামলায় নিহত হয়েছেন ওমর আহমদ মিয়াদ নামের এক ছাত্রলীগকর্মী।

তিনি সিলেট এমসি কলেজে বিএসএস এবং লিডিং ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। আর আহত হয়েছেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য নাজমুল ও কর্মী নাসির।

সংঘর্ষের ঘটনায় ফখরুল ইসলাম নামের এক যুবককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ। তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স শাখার কর্মী।

নিহত মিয়াদ সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপুর অনুসারী বলে জানা গেছে। আর হামলাকারীরা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরী গ্রুপের কর্মী।

এ নিয়ে সিলেটের ওই এলাকায় এক মাসের ব্যবধানে প্রতিপক্ষ গ্রুপের হামলায় ছাত্রলীগের দুই কর্মী নিহত হলেন। এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর একই এলাকায় প্রতিপক্ষ গ্রুপের ছুরিকাঘাতে নিহত হন ছাত্রলীগকর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম।

অন্যদিকে সরকারি চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রলীগের বিবদমান দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে আহত হয়েছে ২৫ জন।

তারা চট্টগ্রাম ও মহসিন কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। পুলিশ দুই পক্ষকেই লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

আগের দিন রবিবারও চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন উপলক্ষে ব্যানার টাঙানো নিয়ে ছাত্রলীগের বিবদমান এ দুই পক্ষে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর জের ধরে গতকাল ক্যাম্পাসে এ ঘটনা ঘটে বলে সংগঠন সূত্রে জানা গেছে।

সংঘর্ষে জড়ানো দুই পক্ষের একটির নেতৃত্বে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগ নেতা মাহমুদুল করিম এবং অন্যটির নেতৃত্বে মহানগর ছাত্রলীগ নেতা সুভাষ মল্লিক সবুজ। সুভাষ মল্লিক আবার চকবাজারের যুবলীগ নেতা নূর মোস্তফা টিনুর অনুসারী। আর মাহমুদুল করিম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনির অনুসারী। রনি আবার মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

চট্টগ্রামে আহতদের মধ্যে ২২ জন মাহমুদুল করিমের অনুসারী। আহত বাকিরা সুভাষ মল্লিক সবুজের অনুসারী।

আহতদের মধ্যে ছাত্রলীগকর্মী হানিফ সুমন, আনোয়ার পলাশ, গিয়াস উদ্দিন, আতরিয়ান ও রাহুল শীলকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে রাহুল ও গিয়াস মহানগর ছাত্রলীগ নেতা সুভাষ মল্লিকের অনুসারী। অপর তিনজন মাহমুদুল করিমের অনুসারী।

এ ছাড়া সংঘর্ষে আহত ছাত্রলীগকর্মী খন্দকার নাইমুল আজম, মুনির ইসলাম, শফিকুল ইসলাম, মামুন, ফাহিম, আমিরুল করিম, আলাউদ্দিন, পিয়াস ও রাকিবকে নগরের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। অন্যদের নাম জানা যায়নি। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের মধ্যে রাকিব টিনুর অনুসারী।

সংঘর্ষের জন্য এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দায়ী করেছে। তা ছাড়া সংঘর্ষের পর থেকে দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সিলেটের সংঘর্ষ : প্রত্যক্ষদর্শী ও ছাত্রলীগকর্মীরা জানায়, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে টিলাগড় এলাকার মসজিদ-সংলগ্ন সড়কে প্রতিপক্ষ গ্রুপের লোকজন মিয়াদ, নাজমুল ও নাসিরকে ছুরিকাঘাত করে। তাঁদের উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মিয়াদকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত মিয়াদের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায়। তাঁর বাবার নাম আবুল মিয়া। তাঁরা নগরের বালুচর এলাকায় বসবাস করেন।

মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. জেদান আল মুসা জানান, ছাত্রলীগের টিলাগড়কেন্দ্রিক দুই পক্ষের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে মিয়াদ খুন হয়েছেন। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

চট্টগ্রামের সংঘর্ষ : প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১০টার দিকে সুভাষ মল্লিকের অনুসারীদের একজন কলেজের মূল ফটকসংলগ্ন ব্যাংকের কাছে এলে তাকে অন্য পক্ষের ছেলেরা মারধর করে। এর পর থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষের মধ্যে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুই পক্ষই মুখোমুখি হয়ে পড়লে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে মাহমুদুল করিমের অনুসারীদের গণি বেকারির দিকে এবং সুভাষ মল্লিকের অনুসারীদের চকবাজারের দিকে সরিয়ে দেয়। এর পর বেলা পৌনে ১২টার দিকে সুভাষ মল্লিকের নেতৃত্বে তাঁর অনুসারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে কলেজ রোডে কয়েক দফা মিছিল করে। পুলিশ তাদের কাছ থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে সরিয়ে দেয়।

পরে সুভাষের অনুসারীরা আবার কলেজের পশ্চিম গেটের কাছে জড়ো হয়। তখন পুলিশ ধাওয়া দিয়ে তাদের চকবাজারের দিকে সরিয়ে দেয়। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মাহমুদুল করিমের অনুসারীরা মিছিল নিয়ে একই এলাকায় আসতে চাইলে পুলিশ লাঠিপেটা করে।

সকাল ১০টা থেকে দু্পুর একটা পর্যন্ত তিন ঘণ্টাব্যাপী এসব ঘটনা চলাকালে চট্টগ্রাম কলেজ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ক্যাম্পাসে থাকা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কক্ষে ঢুকে পড়ে।

নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি) জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কলেজে রবিবার থেকে উত্তেজনা ছিল। গতকাল দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে।

এদিকে সংঘর্ষের জন্য টিনু ও তাঁর অনুসারীদের দায়ী করে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগ নেতা মাহমুদুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কলেজে ছিলাম। হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগে তাদের ছেলেরা আমাদের ওপর দা-কিরিচসহ বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। তখন পুলিশ এসে আমাদের ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে দিলেও টিনুর অনুসারীরা মিছিল করেছে। পরে তারা আবার ক্যাম্পাসের বাইরে এসে আমাদের ওপর হামলা চালাতে চাইলে আমরা আত্মরক্ষার্থে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করি। ’

তাদের ২২ জন কর্মী আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে মাহমুদুল করিম বলেন, ‘এতে বুঝতে পারেন তারাই (টিনুর পক্ষ) আমাদের ওপর পরিকল্পিত হামলা করেছে। ’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে যুবলীগ নেতা নুর মোস্তফা টিনু বলেন, ‘সকালে চট্টগ্রাম কলেজে ক্লাস শেষে আমাদের কর্মী এবং কলেজছাত্র রাহুল শীল ও গিয়াসকে মাহমুদুল করিমের গ্রুপ মারধর করে। এরপর তাদের (আহত ওই দুই ছাত্র) উদ্ধার করতে আমাদের ছেলেরা গেলে তারা আবার হামলা করেছে। এ ঘটনার জন্য ওরা দায়ী। আমরা না। ’

সংঘর্ষের বিষয়ে সুভাষ মল্লিক সবুজ বলেন, ‘মাহমুদুল করিমের ছেলেরা গতকাল (গত পরশু) আমাদের ব্যানার ছিঁড়ে দেয়। এ নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়। আগেও আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। আজ (গতকাল) সকালে তারা ক্যাম্পাসে এসে আমাদের পক্ষের ছয়জনকে মারধর করে। ’

তবে মাহমুদুল করিম বলেন, ‘বহিরাগতদের ইন্ধনদাতা টিনুর অনুসারীরা ক্যাম্পাসে অস্থিতিশলীতা সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের ওপর হামলা করেছে। ’

 


মন্তব্য