kalerkantho


রংপুর সিটি নির্বাচন

নগরজুড়ে ভোটের আমেজ মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



নগরজুড়ে ভোটের আমেজ মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) রোডম্যাপে আগামী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে নগরজুড়ে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে।

দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা। বিভিন্ন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এসে পছন্দের দলীয় নেতাকে প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, কেউ হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে উড়ে এসে সভা-সমাবেশ করছেন। জাতীয় পার্টি (জাপা) ইতিমধ্যে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক নেতা দলীয় মনোনয়ন পেতে মাঠে নেমেছেন, গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। দলীয় মনোনয়ন না পেলেও বা দল নির্বাচনে অংশ না নিলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন বলেও আকার-ইঙ্গিতে জানান দিচ্ছেন কেউ কেউ।

সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগের পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করছেন। আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি তফসিল ঘোষণা করা হবে—এমন খবরে মনোনয়ন নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা বর্তমানে রংপুর ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান করছেন। আর তাঁদের কর্মী-সমর্থকরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় নগরীতে তাঁদের পক্ষে মিছিল করছে। ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাঁটানো ছবিসংবলিত রঙিন পোস্টার, ফেস্টুন-ব্যানারে ছেয়ে গেছে নগর।

সিটি করপোরেশনের দ্বিতীয় এই নির্বাচনকে ঘিরে উৎসবের আমেজ ছড়াচ্ছে রংপুরে।

বর্তমানে রংপুর সিটি করপোরেশনসহ তিনটি পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের সবখানেই আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিরা প্রতিনিধিত্ব করছেন। এবারও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ফল ঘরে তুলতে নৌকা প্রতীক হাতে পেতে নেতাদের মধ্যে দৌড়ঝাঁপ চলছে। কেন্দ্রের নজর কাড়তে গণসংযোগ শুরু করেছেন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের এক ডজনের বেশি নেতা। মনোনয়নের জন্য দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে আছেন তাঁরা।

বিএনপির পক্ষ থেকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে তিনজনের নাম। তাঁরা হলেন মহানগর বিএনপি সভাপতি মোজাফ্ফর হোসেন, সহসভাপতি কাওছার জামান বাবলা এবং মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিজু। গত সিটি নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন কাওছার জামান বাবলা। এবারও অনেক আগে থেকেই গণসংযোগ শুরু করেছেন। নিজেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দাবি করে বাবলা জানান, সুষ্ঠু ভোট হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনিও ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবেন।

তিন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা কে কত ভোট পেতে পারেন তা নিয়েও চলছে হিসাব-নিকাশ। দলীয় ভোট ও ব্যক্তিগত ভোটের হিসাবের সঙ্গে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ও আলোচনায় আসছে। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়াকে। এখন পর্যন্ত জাতীয় পার্টি ছাড়া অন্য কোনো দলের সিটি নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। তবে এইচ এম এরশাদের দল প্রার্থী ঘোষণা দিলেও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত তা ঠিক থাকবে কি না তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।

আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনের এমপি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এইচ এন আশিকুর রহমানের ছেলে রাশেক রহমানও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় সভানেত্রীর সুজ সংকেত পেয়েই তিনি মাঠে নেমেছেন বলে দাবি করেছেন। মাঠে থাকা রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি জানিয়েছেন, তিনি কোনো গ্রিন সিগন্যাল পাননি। তবে সংকেতের অপেক্ষায় না থেকে মাঠ গোছানোকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তিনি। আর বর্তমান মেয়র জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু সমপ্রতি এক সমাবেশে তাঁর দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

নবগঠিত রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থী থাকলেও ছিল না দলীয় প্রতীক। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাকে মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। কিন্তু অন্য দুই মনোনয়ন প্রত্যাশী রংপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ও সাবেক পৌর মেয়র এ কে এম আব্দুর রউফ মানিকের আন্দোলনের মুখে তিনি রাঙ্গাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে নেন। নির্বাচনে সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু মোটরসাইকেল প্রতীক নিয়ে লাখের ওপর ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। সে সময় জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কৃত মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ৭০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। তিনিই ছিলেন ঝন্টুর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জাতীয় পার্টির দুর্গে গুরুত্বপূর্ণ এই মেয়র পদটি পেতে মরিয়া এরশাদ। তিনি মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাকে প্রার্থী করেছেন। তাঁকে জিতিয়ে আনতে সবাই দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ বলে ঘোষণা করেছেন এরশাদ। কিন্তু বেঁকে বসেছেন এরশাদের ভাইয়ের ছেলে সাবেক এমপি হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ। তিনি নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে নেমে পড়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে দল থেকে তাঁকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। দলের আরেক নেতা সাবেক পৌর মেয়র এ কে এম আব্দুর রউফ মানিকও নাগরিক কমিটির ব্যানারে পেশাভিত্তিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করছেন। চেষ্টা করছেন লাঙল কাঁধে নিতে না পারলে ভিড়বেন নৌকার ছায়াতলে। তাই সখ্য গড়ছেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে।

মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ‘বিগত নির্বাচনে দলের একাধিক প্রার্থী থাকার পরও ৭০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলাম। জনমত আমার পক্ষে আছে। অনেক আগে দলের চেয়ারম্যান আমাকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়ায় মাঠে কাজ করে যাচ্ছি। এবারে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। ’

মনোনয়ন দৌড়ে নেতার সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রার্থী নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগে। কেন্দ্রের নজর কাড়তে অনেকেই তোড়জোড় শুরু করেছেন। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. জয়নুল আবেদীনও প্রার্থী হওয়ার কথা বলছেন। এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক ছাত্রনেতা মোতাহার হোসেন মণ্ডল মওলা, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম, রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবুল কাশেম, রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক রেজাউল ইসলাম মিলন, মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি সাফিউর রহমান সফি, সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল, আওয়ামী লীগ নেতা স্পেশাল জজ আদালতের পিপি রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ রংপুর জেলা ইউনিট কমান্ডার মোছাদ্দেক হোসেন বাবলু, মহানগর স্বেচ্ছসেবক লীগের সভাপতি আতাউর জামান বাবু রয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায়।

বর্তমান মেয়র সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু বলেন, বিগত পাঁচ বছরে নবগঠিত এই সিটি করপোরেশন এলাকার যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে। আর একবার নির্বাচিত হয়ে অসমাপ্ত কাজ করে যেতে চাই। জনমত আমার সঙ্গে আছে। আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি সিটি নির্বাচনে নিজেকে দলের যোগ্য প্রার্থী দাবি করে বলেন, ‘নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করলে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কেন্দ্রীয় নেতারা দলের বাইরে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেবেন তা আমি বিশ্বাস করি না। ’ আওয়ামী লীগ সেই দল নয় যে, দল না করেই যে কেউ মনোনয়ন পেয়ে যাবেন। এটা যদি হয় তাহলে মাঠের কর্মীরা রাজনীতিতে নিরুৎসাহী হবে। ’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘সিটি করপোরেশন এলাকার আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য এলাকার একজন সৎ এবং দক্ষ নেতা অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের পরামর্শে এলাকার উন্নয়নে মেয়র পদে নির্বাচন করতে চাই। হয়তো অনেকে আমাকে ভালো করে চেনেন না। তবে চাকরিকালীন শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এলাকার লোকজনের সাধ্যমতো উন্নয়নের চেষ্টা করেছি। এখন সীমাবদ্ধতা নেই। তাই সাধারণ মানুষের আরো কাছে থাকতে চাই। ’

জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবুল কাশেম বলেন, ‘কয়েক মাস আগে থেকেই অনেকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হতে প্রচারণায় নেমেছেন। আমিই একমাত্র প্রার্থী সবার শেষে প্রচারণায় নেমেছি। ’ তাঁর প্রতি দলের গ্রিন সিগন্যাল আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মনোনয়ন পেলে আমার বিজয় নিশ্চিত। ’

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল বলেন, সবাই মনোনয়ন আশা করছি ঠিকই, তবে কেন্দ্রীয়ভাবে সবার কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কুল রক্ষা হবে—এমন প্রার্থীই খুঁজছেন তাঁরা। মনোনয়ন পেলে তিনি উঠে আসতে পারবেন বলে আশাবাদী।  

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর নবগঠিত রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আগামী নির্বাচন হচ্ছে চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসেই। ৩৩টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রংপুর সিটির জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। আর ভোটার রয়েছেন প্রায় চার লাখ।


মন্তব্য