kalerkantho


প্রদর্শনী

রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য ভালোবাসা

নওশাদ জামিল   

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য ভালোবাসা

শিশু অধিকার সপ্তাহ উপলক্ষে গতকাল ঢাকায় শিশু একাডেমিতে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢেউয়ের সঙ্গে সাগরতীরে আছড়ে পড়ছিল রোহিঙ্গা শিশুর লাশ। ভেসে ওঠা দুই শিশুর লাশ মাথায় নিয়ে তীরে ফিরছে দুই ব্যক্তি। সেই ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছাপা হয়েছে। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, সাগরে ডুবে মারা গেছে এক রোহিঙ্গা শিশু। মা বাঁচাতে পারেননি নাড়িছেঁড়া ধনকে। সন্তানের নিথর দেহ জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন মা। মর্মস্পর্শী এসব ছবি দেখে বাকরুদ্ধ সবাই। রোহিঙ্গা শিশুদের কষ্ট ও আর্তনাদের এসব ছবি একযোগে প্রদর্শিত হচ্ছে সারা দেশের শিশু একাডেমিতে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়েছে। এ সময় লাইট ও সাউন্ডের মধ্য দিয়ে শিশুদের জন্য স্থাপনা শিল্পকর্মেরও উদ্বোধন করা হয়েছে।

মিয়ানমারে সেনা সদস্যদের হাতে স্বজন হারিয়েছে কেউ, কেউ হারিয়েছে সম্ভ্রম।

নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি শিশু-কিশোররাও। রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুরা প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে বিপত্সংকুল নদী আর সাগর পাড়ি দিয়ে আসছে বাংলাদেশে। দেশান্তরী হওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে রয়েছে অগণিত শিশু-কিশোর, যাদের অনেকেই হারিয়েছে মা-বাবাকে। রোহিঙ্গা শিশুদের দুঃখ-যন্ত্রণার গল্প উঠে এসেছে প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া বিভিন্ন আলোকচিত্রে।

প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘আমি কাঁদতে চাই না, আমারও দেশ আছে’। গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম এনডিসি, শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান বরেণ্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন ও শিশু একাডেমির পরিচালক বিশিষ্ট ছড়াকার আনজীর লিটন।

আলোকচিত্রে দেখা যায়, বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে ত্রাণের জন্য হাহাকার করছে রোহিঙ্গা শিশু-কিশোররা। সামান্য ত্রাণ পেয়ে তাদের মুখে ফুটে উঠছে স্বর্গীয় হাসি। আলোকচিত্রে উঠে এসেছে নানা নির্মম দৃশ্যকল্পও। রোহিঙ্গা এক বাবার এক হাতে শেষ সম্বলটুকু একটি বস্তায়, আরেক হাতে নিজের ছোট্ট সন্তান। এক শিশুর কাঁধে চড়ে আরেক শিশু কাদামাটির পথ পাড়ি দিয়ে ঢুকছে বাংলাদেশে। আবার বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পথে পানিতে ডুবে মারা গেছে অনেক শিশু-কিশোর। তাদের লাশ ভাসছে নাফ নদে, সাগরসৈকতে। অন্য একটি ছবিতে দেখা যায়, আশ্রয় ক্যাম্পে কিছু রোহিঙ্গা শিশু খেলায় মত্ত।

এ ছাড়া সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পরপরই এক রোহিঙ্গা অন্তঃসত্ত্বা রাস্তার পাশে ঝুপড়ি ঘরে জন্ম দিয়েছেন সন্তান। খোলা আকাশের নিচে তার ছোট্ট শরীরে তখনো জড়ানো হয়নি এক টুকরো কাপড়। হূদয়ভাঙা এ ছবিগুলো উঠে এসেছে প্রদর্শনীতে।

শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে অন্য অনেকের সঙ্গে প্রদর্শনী ঘুরে দেখছিল অসংখ্য শিশু-কিশোর। দেখছিলেন অভিভাবকরাও। তাদেরই সমবয়সী রোহিঙ্গা শিশুদের কষ্ট ও যাতনা দেখে সমব্যথী হয়ে উঠছিল শিশুরা। প্রদর্শনী দেখে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শিশুদের বাঁচানোর দাবিতে, নিজ দেশে ফেরানোর দাবিতে এ দেশের শিশু-কিশোররা স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করছে। সারা দেশেই শিশু-কিশোরদের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরপর সেই স্মারকলিপি পাঠানো হবে জাতিসংঘে। ইউনিসেফসহ শিশুদের অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানেও তা পাঠানো হবে।

প্রাণ বাঁচাতে ছুটে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অন্তত এক হাজার ৩০০ শিশুকে এ পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা মা-বাবা বা কোনো আত্মীয়-স্বজনকে ছাড়াই বাংলাদেশে এসেছে। সেনাদের হাতে মা-বাবা নিহত হয়েছেন, এমন এতিম রোহিঙ্গা শিশু-কিশোরের সংখ্যাও বিশাল। ইউনিসেফের তথ্যানুসারে, শিশুর মা-বাবার দুজনকেই অথবা বাবাকে মিয়ানমারে মেরে ফেলা হয়েছে। চোখের সামনে মা-বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করতে দেখেছে অনেক রোহিঙ্গা শিশু। হতভাগ্য সেই শিশুরা নানা মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত। কক্সবাজারের আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের আনন্দ ও দুঃখগাথা রয়েছে কিছু আলোকচিত্রে।

প্রদর্শনী দেখছিল ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির কিশোরী তাসমিয়া জামান চৌধুরী। রোহিঙ্গা শিশুদের দুঃখ ও দুর্ভোগের ছবি দেখে ছলছল করছিল শিশুটির চোখ।


মন্তব্য