kalerkantho


গার্ড ও ঝাড়ুদার দিয়ে চলছে সার্জারির কাজ

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



গার্ড ও ঝাড়ুদার দিয়ে চলছে সার্জারির কাজ

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল। হবিগঞ্জ আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগীদের প্রচণ্ড ভিড়।

ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, এক রোগীর ক্ষতস্থানে সেলাই করছেন হাসপাতালে ট্রলিবাহক মুকিত মিয়া। ভুক্তভোগী রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, শুধু মুকিত নন, ট্রলিবাহক ফারুক, নিরাপত্তা প্রহরী স্বদেশ ও শাহজাহান, এমএলএসএস মহিবুর সবাই সেলাই ও ব্যান্ডেজ করার কাজ করেন। এভাবেই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চলছে গার্ড ও ঝাড়ুদার দিয়ে রোগীর সার্জারির কাজ।

জানতে চাইলে নিরাপত্তা প্রহরী শাহজাহান বলেন, জরুরি বিভাগে বিশেষ প্রয়োজনে তাঁরা সেলাই ও ব্যান্ডেজের কাজ করেন। সার্জারির এই কাজগুলো চিকিৎসকদের করার কথা থাকলেও তাঁরা করেন না।

আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. বজলুর রহমান বলেন, ‘লোকবল সংকট রয়েছে। চিকিৎসক বা ব্রাদারদের এই কাজ করার কথা থাকলেও তাঁরা ব্যস্ত থাকেন চিকিৎসা নিয়ে। ’ প্রশ্ন উঠেছে, চিকিৎসক ও ব্রাদাররা কী ধরনের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন? আর কেনই বা বিপজ্জনকভাবে গার্ড ও ঝাড়ুদার দিয়ে এসব করানো হয়? যদিও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব প্রশ্নের সদুত্তর মেলেনি।

জরুরি বিভাগে কেউ মারা গেলে লাশ রাখা হয় প্রবেশপথে।

সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মোশাররফ হোসেন বলছেন, ‘পুলিশ যতক্ষণ লাশের সুরতহাল রিপোর্ট না করছে ততক্ষণ পর্যন্ত এখান থেকে লাশ সরানো সম্ভব নয়। আর কোথাও লাশ রাখার জায়গাও নেই হাসপাতালে। ’

সংকট শুধু জরুরি বিভাগে নয়, হাসপাতালের সর্বত্রই। সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক নেই তিন মাস। আর দুই মাস ধরে নেই অ্যানেসথেটিস্ট। ফলে বাধ্য হয়েই হবিগঞ্জের রোগীদের দৌড়াতে হচ্ছে সিলেট কিংবা ঢাকায়। ঝুঁকি নিয়ে মাতৃত্বজনিত অপারেশন করছেন সিনিয়র কনসালট্যান্ট। তিনটি অপারেশন থিয়েটার কার্যত অচল হয়ে আছে।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রথীন্দ্র চন্দ্র দেব জানান, চিকিৎসক না থাকায় সার্জারি বিভাগের রোগীদের অন্যত্র পাঠাতে বাধ্য হতে হয়। তবে নিজ দায়িত্বে প্রসূতি মায়েদের অপারেশন করছেন গাইনি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট।

তিনি আরো জানান, বছরে বহির্বিভাগে দেড় লাখ এবং জরুরি বিভাগে ৫০ হাজার রোগীর চিকিৎসা হয় এই হাসপাতালে। অথচ সেখানে নেই সার্জারি ও অ্যানেসথেসিয়ার চিকিৎসক। গাইনি চিকিৎসক থাকলেও অ্যানেসথেসিয়ার সমস্যার জন্য তাঁরা ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না। হাসপাতালের অনুমোদিত পদ ১৮২টি। আর শূন্য পদ ৫৮টি। বিশেষ করে টেকনিক্যাল লোক কম থাকায় যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া কষ্টকর। হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়কসহ ৪০ জন চিকিৎসকের বিপরীতে রয়েছেন ২৪ জন। তার মধ্যে তিনজন প্রেষণে কাজ করছেন অন্যত্র।

হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি) ডা. সমর ঘোষ বলেন, ‘গত ২ মাসে মাতৃত্বজনিত অপারেশন হয়েছে ১০৮টি। ঝুঁকি আছে জেনেও মানবিক বিবেচনায় নিজ দায়িত্বে রোগীদের অপারেশন করছি। ’

গতকাল সকাল ১০টা। হাসপাতালের সমাজসেবা কার্যালয়ে কথা হয় অফিস সহকারী হুমায়ুন কবির লস্করের সঙ্গে। তিনি জানান, হাসপাতাল রোগী কল্যাণ সমিতির ১৫ লাখ টাকার তহবিল আছে। এর মাধ্যমে হাসপাতালে ভর্তি দরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু এই মাসে গত বুধবার পর্যন্ত এক রোগীকে এক হাজার ১০০ টাকার ওষুধ দিতে পেরেছেন। চিকিৎসকরা যদি রোগী রেফার্ড না করেন তাহলে তাঁরা কোনো সহায়তা দিতে পারবেন না। অথচ হাসপাতালে আসা রোগীদের বেশির ভাগই গরিব। সমাজসেবা কার্যালয় সেপ্টেম্বর মাসে ১০ জন, আগস্ট মাসে ১৭ জন এবং জুলাই মাসে ২৫ জন রোগীকে সহায়তা করেছে।

সকাল ১১টায় হাসপাতালের সামনে দেখা হয় মর্গে দায়িত্ব পালনকারী ডোম ছাবু মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, প্রায় ২৭ বছর যাবৎ তিনি এই কাজ করছেন। তাঁর অভিযোগ লাশ কাটার ব্যবহূত যন্ত্র তাঁর নিজের তৈরি করা। হাসপাতাল থেকে কোনো যন্ত্রপাতি দেওয়া হয় না। তবে এ ব্যাপারে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. বজলুর রহমান বলছেন, মর্গে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি রয়েছে। মর্গের আধুনিকায়ন প্রয়োজন।

সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন রায়হানা বেগম। বুধবার তাঁর প্রথম পুত্রসন্তানের জন্ম হয় হাসপাতালে। কিন্তু এখন পর্যন্ত নবজাতক মায়ের দুধ খেতে পারেনি। বিষয়টি জানালে চিকিৎসক তাঁকে সিলেটে রেফার্ড করেন। একই উপজেলার রায়পুর গ্রামের কৃষক সইদুল ইসলামের পুত্রসন্তানের জন্ম হয় গতকাল সকালে। তাকেও সিলেটে রেফার্ড করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, শিশু ওয়ার্ডে স্থান সংকুলানে নেই। হাসপাতালটি যেখানে ১০০ বেডের, সেখানে শিশু রোগীই আছে প্রায় দ্বিগুণ। তাই তাঁরা বাধ্য হয়ে সিলেটে রেফার্ড করেন রোগীদের।

আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. বজলুর রহমান জানান, হাসপাতালে রোগীদের চাপ, খারাপ আচরণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো কষ্ট কর। পাশাপাশি কাজের চাপও বেশি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রথীন্দ্র চন্দ্র দেব বলেন, হবিগঞ্জ কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ভাটি এলাকার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ এই হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে থাকে। ১০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী ভর্তি হয় এখানে। জরুরি বিভাগ চালাতে হিমশিম খেতে হয়। এ ছাড়া চিকিৎসক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। হবিগঞ্জ আধুনিক জেলা সদর হাসপাতাল থেকে বছরে সরকার প্রায় ৪০ লাখ টাকা রাজস্ব পায়। এই টাকা স্থানীয়ভাবে ব্যয়ের সুযোগ থাকলে অনেক কাজ করা যেত।

 


মন্তব্য