kalerkantho


আম ছালা দুই-ই গেছে বর্ধিত সিটিবাসীর

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



আম ছালা দুই-ই গেছে বর্ধিত সিটিবাসীর

গত বন্যায় রংপুর নগরীর পানবাজার এলাকার সড়ক ও কালভার্ট বিধ্বস্ত হলেও এখন পর্যন্ত সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা মেলেনি, বেড়েছে করের বোঝা। সিটির বাসিন্দা হওয়ার কারণে বন্ধ হয়েছে টিআর, কাবিখাসহ সরকারের নানা ধরনের সহায়তা।

গত পাঁচ বছরে এলাকার কোনো উন্নয়নও হয়নি। আমরা লোক দেখানো সিটিবাসী হতে চাই না, আগের ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় ফিরে যেতে চাই। ’

নবগঠিত রংপুর সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সাবেক পরশুরাম ইউনিয়নের কোবারু এলাকার মনছুর আলী ক্ষোভ মেশানো কণ্ঠে কথাগুলো বলেন। শুধু তিনি নন, সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দারা বলে, ‘আমাদের আম-ছালা দুই-ই গেছে। ইউনিয়নের আওতায় থাকাকালে প্রাপ্ত সুবিধাদি আর পাচ্ছি না। সিটির আওতায় এসেও এলাকার রাস্তা-ঘাটসহ কোনো কিছুরই উন্নয়ন হচ্ছে না। উল্টো কাঁধে চেপেছে বাড়তি করের বোঝা। ’

ভুক্তভোগী এসব এলাকার লোকজন বলে, ‘রংপুর সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা হয়ে নিজেদের অনেক ভাগ্যবান মনে করেছিলাম। আমরা গর্বভরে বলতাম, এখন আর ইউনিয়ন নয়; আমরা সিটির বাসিন্দা।

কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর হতে চলেছে, সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলেও আমাদের এলাকায় দৃশ্যত কোনো উন্নয়ন হয়নি। এখনো রাস্তাঘাট ভাঙা, বিদ্যুৎ নেই। করপোরেশনের বিভিন্ন ট্যাক্স, পানির বিল, রাস্তার লাইটের বিল দিতে হচ্ছে। অথচ সিটি করপোরেশন তেমন কোনো সহায়তা করছে না, চোখে পড়ার মতো কোনো উন্নয়নও নেই। এখন মনে হচ্ছে, ইউনিয়নের সঙ্গে থেকেই আমরা ভালো ছিলাম। ’

সিটি করপোরেশন, ভূমি কার্যালয় ও রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, সাবেক পৌর এলাকার চেয়ে নবগঠিত সিটি করপোরেশনের সীমানা অনেক গুণ বেড়েছে। রংপুর সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের পাশাপাশি কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার একটি করে ইউনিয়ন সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। ১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে ছিল রংপুর পৌরসভা। এখন ২০৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড দাঁড়িয়েছে ৩৩টি। এর মধ্যে নতুন ১৮টি ওয়ার্ডই এখনো গ্রাম। এসব ওয়ার্ডের অধিকাংশই কৃষি জমি। যেখানে ধানসহ অন্যান্য ফসল আবাদ হয়ে থাকে। এ ছাড়া বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পৌরসভার বর্তমান কর প্রয়োগ করা হচ্ছে বর্ধিত এলাকায়।

সূত্র জানায়, আগে ১ শতাংশ জমির ভূমিকর ছিল সাত টাকা। সিটি করপোরেশন হওয়ার পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ টাকা অর্থাৎ প্রায় তিন গুণ। একতলা পাকা ভবনের কর ছিল প্রতি বর্গফুট পাঁচ টাকা। সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হওয়ার পর তা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আধা পাকা বাড়ি থেকে আটতলা পাকা বাড়ির ক্ষেত্রে নতুন এই করারোপ হবে প্রায় দ্বিগুণ। বিভিন্ন ক্যাটাগারিতে ৩৮৬টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রকারভেদে কর রয়েছে সর্বনিম্ন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত। ১২ হাজার টাকার কর গিয়ে দাঁড়াবে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকায়।

বাড়তি হারে করারোপের বিপরীতে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো নিয়ে তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই কর্তৃপক্ষের। নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত না করে কর বাড়ানো নিয়ে রংপুরের মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে জমি বিক্রির ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। এতে বেশি বেকায়দায় পড়েছে সিটি করপোরেশনে নতুন যুক্ত হওয়া ১২ ইউনিয়নের মানুষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, বর্ধিত এলাকার বেশির ভাগ রাস্তাঘাট এখনো কাঁচা। অনেক রাস্তায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু মেরামত হচ্ছে না। সংস্কার ও তদারকির অভাবে ব্রিজ-কালভার্টগুলোর ভগ্নদশা। নেই পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সড়কবাতি নেই। স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা আরো করুণ। সিটির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বুড়িরহাটে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুপানি জমে থাকে। অনেক আবেদন-নিবেদনেও গত পাঁচ বছরে এর উন্নয়ন হয়নি।

সাবেক পরশুরাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের মানুষ হিসেবে কর তো দিতেই হবে। তবে সুযোগ-সুবিধাও বাড়াতে হবে। নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে বিশেষ করে বর্ধিত এলাকার লোকজন বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। ’

২৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাওয়াইকাট্টারি গ্রামের রোস্তম মিয়া ও মাহবুব আলম বলেন, ‘আগে আমরা ছিলাম পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের আওতায়। ওই সময় এলাকায় টিআর, কাবিখাসহ সরকারি নানা প্রকল্প সহায়তা পেতাম। সিটি করপোরেশনভুক্ত হওয়ার পর ওই সব সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। ’ তবে ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোক্তার হোসেন দাবি করে বলেন, ‘এলাকায় রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে অনেক কাজ হয়েছে। বাকিগুলোর কাজ চলছে। কিছুদিনের মধ্যেই সিটি করপোরেশনের সব সুযোগ-সুবিধা পাবে এই ওয়ার্ডের মানুষ। ’

তামপাট ইউনিয়ন থেকে রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত হওয়া কাইদাহারা এলাকার লোকমান মিয়া বলেন, ‘আমাদের রাস্তাঘাট এখনো কাঁচা, বর্ষায় হাঁটা যায় না। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়েছে। ’ জোরইন্দ্রা এলাকার আলী মিয়া বলেন, ‘এখনো ইউনিয়নের মতোই রয়ে গেছে এলাকা। আমরা দ্রুত এলাকার উন্নয়ন চাই। ’ তবে কাউন্সিলর সুলতান আহমেদের দাবি, রাস্তাঘাট উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব এলাকায় উন্নয়ন হবে।

বালাপাড়া এলাকার ছালামত উল্লাহ ও মর্জিনা বেগম বলেন, ‘আগত কয় মাস পর পর মেম্বর-চেয়ারম্যানরা হামাক গম ও চাল দিয়্যা জীবন বাঁচে রাকচিল। কিন্তু অ্যালা কেনবা না খ্যায়া থাকলেও কায়ও কিচ্ছু দেয় না বাবা। সিটিত থাকি হামার লাভ কী হইল!’

১২ হাজার ১৪ জন জনসংখ্যা অধ্যুষিত ১২ নম্বর ওয়ার্ডের অবহেলিত এলাকা হচ্ছে ভবানীপুর আবাসন প্রকল্প। আজও সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি সেখানে। রাজেন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আবদুল হালিম জানান, কাঁচা সড়কের ব্রিজ-কালভার্টগুলোর অবস্থা নাজুক হওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। এখানে রবি মৌসুমে আলুর ব্যাপক চাষ হলেও কাঁচা রাস্তার কারণে ট্রাক আসতে পারে না। ফলে কৃষকরা ন্যায্য দাম পায় না।

আবাসন প্রকল্পের সভাপতি আব্দুর রশিদ জানান, এই আবাসনে প্রায় এক শ পরিবারের বাস। এখানে স্যানিটেশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। নেই নলকূপ ও ড্রেনেজ সুবিধা। সরকারিভাবে ২০১৩ সালে ভূমিহীনদের বসবাসের জন্য এই আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হয়। এখানে চলাচলের একমাত্র রাস্তাটিও বন্যায় বিলীন হয়ে গেছে। সংরক্ষিত ১০, ১১ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা কাউন্সিলর শামীমা আক্তার সুমি বলেন, ‘এলাকার উন্নয়নের জন্য বারবার মেয়রের কাছে গিয়েছি। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। ’

১১ নম্বর ওয়ার্ডের কামদেবপুর এলাকার ধান ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের বর্ধিত এই ওয়ার্ডে সংস্কারের অভাবে রাস্তাগুলোতে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তায় কাদাপানি জমে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সুবিধা ভোগ করার আগেই সিটি করপোরেশন থেকে প্রতিটি বাড়িতে কর প্রদানের রসিদ দেওয়া হয়েছে। আমার ওপর পানি, কনজারভেন্সি, সড়কবাতিসহ মোট চার বছরের ১০ হাজার টাকার কর নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত অধিকাংশ এলাকায় পানির লাইন স্থাপন ও সড়কবাতি দেওয়া হয়নি। নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে করারোপের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা করা হয় না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর ঠিকই বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর লক্ষণ নেই। ’

দক্ষিণ বিন্যাটারী এলাকার শিক্ষানুরাগী আবু আলম বলেন, ‘বর্ধিত ১১ নম্বর ওয়ার্ডে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি। সংস্কার ও তদারকির অভাবে এলাকার ব্রিজ-কালভার্টগুলোরও বেহাল দশা। ’

সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আকতার হোসেন আজাদ বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৯১ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৯১ কোটি টাকার কাজ অপেক্ষাধীন। এই কাজ হলে নগর জীবনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ’

এ ব্যাপারে রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু বলেন, ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় চলমান কাজগুলো শেষ হলে সিটির চেহারা পাল্টে যাবে। এসব কাজে সিটির সঙ্গে বর্ধিত এলাকাগুলোর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও রয়েছে। এ ছাড়া আরো অনেক কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন।


মন্তব্য