kalerkantho


১,৯২,০০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ভিন্ন সুর চীনের

আরিফুর রহমান   

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



১,৯২,০০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ভিন্ন সুর চীনের

দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে নতুন মাত্রা দিতে গত বছর অক্টোবরে ২২ ঘণ্টার ঝটিকা সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং। চিনপিংয়ের সফরকালে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ২৭টি প্রকল্পে দুই হাজার ৪০০ কোটি ডলার (এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা) ঋণের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে।

প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থ ২০২০ সাল নাগাদ ধাপে ধাপে ছাড় হওয়ার কথা। ওই সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার এক বছর পূর্ণ হতে চললেও প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি সামান্যই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত একটি প্রকল্পের বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সই হয়নি। উল্টো এ সময়ে সুর পাল্টে গেছে চীনের। জুড়ে দেওয়া হয়েছে নতুন শর্ত। চীন এখন বলছে, পুরো টাকা সরকার থেকে দেওয়া হবে না। চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকেও ঋণ নিতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে যে অর্থ খরচ হবে, তার ১৫ শতাংশের জোগান দিতে হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে। চীনের এসব শর্তের বিষয়ে প্রথম দিকে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকলেও অবকাঠামো উন্নয়নের স্বার্থে পরে তা মেনে নিয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এশিয়া শাখার প্রধান জাহিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চীনের রাষ্ট্রপতির ঢাকা সফরের এক বছরে কোনো উন্নতি হয়নি—এটা বলা যাবে না। এসপিএম ও ইনফো সরকার প্রকল্পের অনুমোদন মিলেছে চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে। পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পেরও অনুমোদন এ বছরের মধ্যেই হয়ে যাবে। ’

সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলানগরে অনুষ্ঠিত যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের বৈঠকে চীনা দূতাবাসের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাউন্সিলর লি কুয়ান জুন জানান, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে এত বছর বাংলাদেশকে গভর্নমেন্ট কনসেশনাল লোন (জিসিএল) বা নমনীয় ঋণ দিয়ে আসছে চীন। তবে এখন থেকে নমনীয় ঋণের পাশাপাশি একটা অংশ নিতে হবে বাণিজ্যিকভাবে এক্সিম ব্যাংক থেকে। সেটি কার্যকর হবে চীনা প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরকালে প্রতিশ্রুত ঋণের মধ্য দিয়ে।

নমনীয় ঋণের সুদের হার থাকে আড়াই শতাংশের মধ্যে। আর বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশের ওপরে। এ ছাড়া চীন সরকারের নমনীয় ঋণ একসময় মওকুফ করে দেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু বাণিজ্যিক ঋণ যেহেতু এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া হচ্ছে, তাই মওকুফ করার কোনো সুযোগ নেই। লি কুয়ান জুন জানান, ২৭টি প্রকল্পের প্রতিটি বাস্তবায়নে যে টাকা খরচ হবে, তার ১৫ শতাংশ অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে। এসব শর্ত শিথিল করতে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছিল দুই পক্ষের মধ্যে। কিন্তু শর্ত থেকে এক চুলও নড়েনি চীন। শেষ পর্যন্ত শর্ত মেনেই চীনের ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। শর্তের বিষয়ে জাহিদুল হক বলেন, ‘আগে শুধু নমনীয় ঋণ দিত চীন। তবে নতুন করে দেশটি বলেছে, নমনীয় ঋণের পাশাপাশি পিবিসিও (প্রিফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট) নিতে হবে। ’

ইআরডির তথ্য মতে, ২৭টি প্রকল্পের মধ্যে আটটিকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে চলতি বছরের শুরুতে চীনের এক্সিম ব্যাংকের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। প্রকল্পগুলো হলো পদ্মা রেল সেতু সংযোগ, ঢাকা-সিলেট চার লেন মহাসড়ক, ইনফো সরকার, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণের জন্য পিজিসিবি ও ডিপিডিসির দুই প্রকল্প এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন বা এমওটিএন প্রকল্প।

ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, আটটির মধ্যে এ পর্যন্ত ইনফো সরকার ও সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং—এই দুটি প্রকল্পে অর্থায়নের অনুমোদন দিয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। তবে এখনো দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। বাকি ছয়টি প্রকল্পে এখনো এক্সিম ব্যাংকের অনুমোদনই মেলেনি। তাঁরা আশা করছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ পদ্মা রেল সেতু সংযোগ প্রকল্পের অনুমোদন মিলবে। বাকি প্রকল্পগুলোও অনুমোদনের অপেক্ষায়। অবশ্য প্রতিটি প্রকল্পে মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৫ শতাংশ অর্থ জোগাড় করার শর্ত পূরণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।

চীনের ঋণ কাজে লাগাতে এত দেরি হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুই দেশেই বর্তমানে একটি প্রকল্প প্রণয়ন থেকে শুরু করে অনুমোদন পর্যন্ত যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়, তাতে অনেক সময় লেগে যায়। আছে দেশের অভ্যন্তরে মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও প্রভাবশালীদের আধিপত্যের লড়াই। কার প্রকল্প আগে থাকবে, কার প্রকল্প পরে থাকবে—তা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে প্রকাশ্যে। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বেড়ে গেলে পাশের দেশ ভারতের প্রভাব কমে যেতে পারে। এ নিয়ে এক ধরনের চাপ আছে সরকারের ওপর। এর পাশাপাশি চীনের দেওয়া শর্ত পূরণ এবং মন্ত্রণালয়গুলোর অদক্ষতার জন্যও চীনের বিশাল বিনিয়োগ কাজে লাগতে দেরি হচ্ছে বলে মনে করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাঁরা জানান, দুই দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেও দেরি হচ্ছে।

সরকারের এক নীতিনির্ধারক কালের কণ্ঠকে বলেন, কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর করতে দীর্ঘদিন ধরেই লেগে ছিল চীন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরকালে এ নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয় চীন। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর করতে না পেরে মিয়ানমারের দিকে বিশেষ নজর দেয় চীন। মিয়ানমারে এখন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চল, গ্যাসের পাইপলাইন করছে চীন।

ইআরডি সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পে সরাসরি ঠিকাদার নিয়োগ এবং সীমিত পদ্ধতিতে ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে চীনের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীন যখন ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিত, সঙ্গে ঠিকাদারের নামও বলে দিত। ওই ঠিকাদারকে দিয়েই কাজ করাতে হতো। একে বলা হয় সরাসরি দরপত্র প্রক্রিয়া বা ডিটিএম। সরাসরি ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বরাবরই বিপক্ষে ছিল সরকার। কিন্তু এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্য কোনো দেশ ও সংস্থাকে না পাওয়ায় নিরুপায় হয়ে চীন থেকে ঋণ নিতে হতো সরকারকে। চীনের এমন বাণিজ্যে লাগাম টেনে ধরতে মন্ত্রিসভা ২০১৬ সালে একটি সিদ্ধান্ত নেয়। তা হলো চীনের অর্থায়নে ভবিষ্যতে যত প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে, তার ঠিকাদার নিয়োগ হবে এলটিএম বা সীমিত দরপত্রের মাধ্যমে। অর্থাৎ চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে কয়েকজন ঠিকাদার থেকে একজনকে বাছাই করা হবে। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত চীন বাহ্যিকভাবে মেনে নিলেও ভেতরে ভেতরে মানতে পারেনি। এ কারণে দেশটি বাংলাদেশকে নতুন শর্ত জুড়ে দিয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বছরের পর বছর বলে আসলেও কোনো উন্নতি হয়নি। ’

 


মন্তব্য