kalerkantho


মনোনয়ন আলোচনায় ‘স্থানীয়-বহিরাগত’

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মনোনয়ন আলোচনায় ‘স্থানীয়-বহিরাগত’

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ইতিমধ্যে মাঠে নেমেছেন। নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের তুলে ধরছেন।

দলীয় প্রধানের ছবিসহ ডিজিটাল বিলবোর্ড ও রঙিন শুভেচ্ছা পোস্টার লাগিয়েছেন কেউ কেউ।

জাতীয় সংসদের ১৯ নম্বর নির্বাচনী এলাকাটি বর্তমানে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির দখলে। আর দলটির প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ। কোনো ধরনের সমঝোতার ক্ষেত্রে এবার দলটি আর জাতীয় পার্টিকে আসনটি ছেড়ে দিতে চায় না। অবশ্য মনোনয়ন আলোচনায় উঠে আসছে স্থানীয় ও বহিরাগত প্রার্থীর বিষয়টিও, যা ভোটের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আগামী নির্বাচনে জয়লাভ এবং দলীয় ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার লক্ষ্যেই নতুন করে দল গোছানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টিও বসে নেই। দলটি নির্বাচনী এলাকায় এর সংগঠন গোছানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। বিশেষ করে এ আসনের সংসদ সদস্য যেহেতু স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা, তাই জাতীয় পার্টিতে চাঙ্গাভাব রয়েছে।

এর বিপরীতে মামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্ক এবং কর্মসূচিতে পুলিশের বাধার কারণে প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে বিএনপি ও তাদের মিত্র জামায়াত। যদিও আগামী সংসদ নির্বাচন ঘিরে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি।

উল্লেখ্য, রংপুর-১ আসনে ষষ্ঠ থেকে দশম—এই পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির স্থানীয় কোনো নেতা প্রার্থী হতে পারেননি। রংপুর-৩ ও রংপুর-৪ আসনের নেতারা প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন তিনজন। তাঁরা হলেন গঙ্গাচড়া উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বাবলু, উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রুহুল আমীন, কৃষক লীগের রংপুর জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি শ ম আমজাদ হোসেন সরকার।

অন্যদিকে জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গা ছাড়াও আলোচনায় আছেন সাবেক সংসদ সদস্য রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক আহ্বায়ক হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ। অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়ন আলোচনায় আছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান মাবু ও যুগ্ম সম্পাদক মোকাররম হোসেন সুজন।

স্থানীয় প্রার্থীকে নির্বাচিত করার আহ্বান জানিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চান শিল্পপতি সি এম সাদিক।

গত সংসদ নির্বাচনে রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির মসিউর রহমান রাঙ্গা। কিন্তু আসছে নির্বাচনে এবার গঙ্গাচড়া আসনটি নিয়ে বেশ ঝুঁকিতেই রয়েছেন এরশাদের ভাগ্নেখ্যাত প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গা। এখানে জাতীয় পার্টির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি লড়তে চায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। এতে স্পষ্ট হচ্ছে জাতীয় পার্টিকে এবার ছাড় দিতে নারাজ স্থানীয় আওয়ামী লীগ।

স্থানীয় লোকজনের কেউ কেউ বলছেন, বহিরাগত কাউকে আর সংসদ সদস্য বানাতে চান না তাঁরা। আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রার্থীদের কাউকে মনোনয়ন দিলে তাঁরা তাঁর সঙ্গে থাকবেন। সে ক্ষেত্রে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যন আসাদুজ্জামান বাবলুই তাঁদের পছন্দ। কারণ বাবলু অনেক আগে থেকেই দলমত-নির্বিশেষে এলাকার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন।

জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান বাবলু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। আসন্ন সংসদ নির্বাচন ঘিরে অনেক আগে থেকেই কাজ করছি। জনমত আমার পক্ষে আছে। এখন দল মনোনয়ন দিলেই হয়। ’ দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

অন্যদিকে জাপার কর্মী-সমর্থকরা মনে করছে, এবার যদি আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির জোট না হয় এবং তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান বাবলু দলীয় মনোনয়ন পান তাহলে রাঙ্গার পক্ষে জয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। পাল্টে যেতে পারে ভোটের হিসাব-নিকাশ। কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, গঙ্গাচড়ার মানুষ চায় নিজ এলাকা থেকেই সংসদে কেউ তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করুক, যা বিগত সময়ে হয়নি। তা ছাড়া বাবলু নেতা হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় পার্টির এক কর্মী আক্ষেপ করে বলেন, ‘দল থাকি বিনা ভোটোত জিতি এ্যালা মন্ত্রী সাইব দলোকে চেনে না। ভাব-সাব দেকি মনে হয় রাঙ্গা সাইব আওয়ামী লীগের লোক। মিটিং, মিছিল আর সভাত এরশাদের কথা না কয়া খালি শেখ হাসিনার কথায় কয়। ’

স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক বলেন, ‘দলের (জাতীয় পার্টি) জন্য প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গার কোনো ভালোবাসা নেই। তাঁর মুখে সব সময় আওয়ামী লীগেরই প্রশংসা। এখানে দলের অবস্থা এখন করুণ। জাতীয় পার্টির প্রতিমন্ত্রী থাকার পরও সরকারি দল আওয়ামী লীগের কথায় চলেন দলটির স্থানীয় নেতারা। ’

ওই শিক্ষক বলেন, এখানে সাংগঠনিকভাবে জাতীয় পার্টির অবস্থা দুর্বল হলেও জনপ্রিয়তা রয়েছে দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের। তাই রাঙ্গার জয় নিশ্চিত করতে এরশাদের ভূমিকাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকেই।

কারো কারো মতে, গঙ্গাচড়ার মানুষ এখনো এরশাদ-পাগল। তারা লাঙল ছাড়া কিছুই বোঝে না। যেহেতু এখানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর অস্তিত্ব এখন সংকটে, তাই রাঙ্গার পাশে এরশাদ থাকলে হয়তো বিশাল চ্যালেঞ্জ উতরে যেতে পারবেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা। আর যদি আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি জোট করে তবে তো জাতীয় পার্টিরই লাভ।

এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গা রংপুর-৩ (সদর) আসনের বাসিন্দা। তাঁর বাড়ি রংপুর নগরে।

মসিউর রহমান রাঙ্গা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসনটি জাতীয় পার্টির দুর্গ বলে পরিচিত। যে অবস্থান এখনো বিদ্যমান। এর আগেও আমি এই আসনের এমপি ছিলাম। তখনো এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছি। আর এখন একসময়ের নদীভাঙনকবলিত গঙ্গাচড়াকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মডেল উপজেলা বানাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছি। যে যাই বলুক, আসন্ন নির্বাচনেও এই আসনে জাতীয় পার্টির কোনো বিকল্প নেই। ’

সম্ভাব্য প্রার্থী সি এম সাদিক সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রতিদিনই তিনি বন্যাকবলিত কোনো না কোনো এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছেন। ভোটারদের কাছে টানতে স্বজন (স্বশাসনের জন্য নাগরিক) নামের একটি সংগঠন করে তিনি এলাকায় কাজ করছেন।

সাদিক বলেন, ‘দলীয় প্রতীক থাকলেই যে জয়ী হওয়া যায় তা নয়। দরকার জনপ্রিয়তার। ’

দুর্গতদের ত্রাণ দিতে গিয়েও ক্ষমতালোভীদের লোকজনের হামলার শিকার ও বাধার মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ করেন সি এম সাদিক। তিনি বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কিংবা জাতীয় পাটি থেকে যদি বহিরাগত বাদ দিয়ে স্থানীয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাহলে কোনো কথা নেই। আর যদি তা না হয় তাহলে নির্বাচন করব। এত দিনে ভোটাররা যদি বুঝতে পারেন যে এলাকার উন্নয়নে স্থানীয় প্রার্থীর বিকল্প নেই, তাহলে আমার জয় নিশ্চিত। ’

দলের মনোনয়ন বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মনোনয়নের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দল থেকে অনেকেই মনোনয়ন চান। ’


মন্তব্য