kalerkantho


শোকগাথা

তিশার জন্য কান্না

এস এম আজাদ   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



তিশার জন্য কান্না

এই স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল তিশা। তার মর্মান্তিক মৃত্যুতে স্কুলজুড়ে শোক আর কান্না। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের ছাত্রী তাসনিম আলম তিশা, শ্রেণি-পঞ্চম, শাখা-পারুল, রোল-২১ এর অকালমৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। —মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট-এর পরিবারবর্গ।

কালো রঙের ব্যানারে সাদা হরফে বড় করে লেখা এই শোকবার্তা। ঝুলছে তিশার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই মূল ফটকে। ব্যানারটির দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়ালেন এক নারী, ‘আহারে বাচ্চাটা। মা ক্যামনে সহ্য করল? আহারে...। ’ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি। মাসুমা খাতুন নামের ওই নারী কালের কণ্ঠকে জানান, মিরপুরে বেনারসিপল্লী এলাকায় তাঁর বাসা। মেয়ে তানিয়া এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাতী শাখায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। সকালে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে এসে নোটিশ দেখেছেন, তিশার শোকে আজ স্কুল বন্ধ। ‘ফিরে গিয়েছিলাম।

এর পরও মনটা কেমন যেন করছিল। তাই আবারও আসলাম। শুনেছি, বাচ্চাটার লাশ নিয়ে ফ্যামিলিটা গ্রামের বাড়ি গেছে। না হলে ওই বাসায়ও যেতাম। ’—ছলছল চোখে বললেন অভিভাবক মাসুমা।

গতকাল বুধবার সকালে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটে গিয়ে গৃহবধূ মাসুমার মতোই অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীকে তিশার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখা গেছে। ফটকেই সাঁটানো স্কুল বন্ধের ‘বিশেষ বিজ্ঞপ্তি’ দেখে ফিরে গেছে তারা। সবার মুখেই ছিল শিশু তিশার জন্য শোকের ছায়া। এই প্রতিষ্ঠানেরই ছাত্রী তিশা গত মঙ্গলবার মিরপুরের রোকেয়া সরণিতে কাজীপাড়া লাইফ এইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের সামনে তেঁতুলিয়া পরিবহনের বাসের চাপায় প্রাণ হারায়। স্কুল ছুটির পর মা রিমা আক্তার ও ছোট ভাই তাহমিদ আলমের (৫) সঙ্গে বাসায় ফিরছিল সে। মা-ভাইয়ের সামনে শিশুটির এই করুণ মৃত্যু সবার মনকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

মিরপুর ১০ নম্বর থেকে ১৪ নম্বরের দিকে যাওয়ার রাস্তায় বাঁ পাশেই মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট। এখানে স্কুলের সঙ্গে আছে কলেজ শাখাও। গতকাল সকালে শোকের ব্যানারের পাশে একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি সেঁটে দেওয়া হয়। তাতে লেখা, ‘অত্র প্রতিষ্ঠানের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী তাসনিম আলম-এর আকালমৃত্যুতে আমরা শোকাহত। স্কুল শাখার (বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন) বুধবারের সকল ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হলো। ’

ফটকে ভিড় করে কয়েকজন শিক্ষার্থী পরস্পর কথা বলছিল। আলোচনার বিষয় তিশার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা। ‘এই বাসচালকের কঠিন বিচার হওয়া দরকার। তা না হলে ওরা বেপরোয়া চালাবেই। ’—বলছিল একজন। ওই তরুণীরা জানায়, তারা কলেজ শাখায় পড়ছে। স্কুল শাখা বন্ধ থাকলেও কলেজ খোলা। তবে তিশার মর্মান্তিক মৃত্যুর শোক ছুঁয়ে গেছে ওদের সবাইকে। শোকের আবহ পুরো প্রতিষ্ঠানেই।

ফটক পেরিয়ে কমপ্লেক্সের ভেতরে ঢুকেও দেখা গেল একই চিত্র। স্কুল ভবনটির নিচে নিরাপত্তাকর্মীরা দায়িত্বে থাকলেও ভেতরে ফাঁকা। কলেজ ভবনের সামনে কয়েকজন জড়ো হয়ে কথা বলছিলেন। পরিচয় জানাতেই লাবণী নামের এক শিক্ষার্থী বলে, ‘আপনারা রাস্তার গাড়িগুলো নিয়ে লেখেন। আমাদের এই প্রতিষ্ঠানের সামনেও বেপরোয়া গাড়ি চলে। এখানে শিক্ষার্থীরা রাস্তা পার হবেই। কোনো সতর্কতা আছে? ১০ নম্বর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত কতগুলো ক্রসিং? সেখানে সব সময় মানুষ রাস্তা পার হয়। ওই রাস্তায় গাড়ি কি জোরে চালানো যায়?’ একইভাবে প্রশ্ন তোলে অন্য শিক্ষার্থীরাও। তারা বলে, ‘আমাদের মাঝ থেকে তিশাকে কেড়ে নিয়েছে ঘাতক বাস। আমরা চাই এমন মর্মান্তিক ঘটনা আর না ঘটুক। অবসান হোক এমন বর্বরতার। ’

প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ওসমান গণি বলেন, ‘এমন অকালমৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না। আমরা সবাই শোকাহত। ঘটনার জন্য দায়ী সেই বাসচালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি আমরা। আসামি ধরা পড়ায় আমরা অন্য কোনো কর্মসূচি দিইনি। তিশার প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আমরা আজ (গতকাল) স্কুলে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখেছি। ’

অধ্যক্ষ আরো বলেন, ‘তিশার রুহের মাগফিরাত কামনায় আজ (গতকাল) আমরা দোয়ার আয়োজন করেছি। আগামীকাল (আজ) দুপুর ১২টায় মর্নিং শিফটের পরীক্ষা শেষে ওর রুহের মাগফিরাত চেয়ে দোয়া ও মিলাদ অনুষ্ঠিত হবে। তিশার স্মরণে এক মিনিট নীরবতাও পালন করা হবে। একইভাবে বিকেল ৫টায় ডে শিফটের পরীক্ষা শেষে নীরবতা পালন ও দোয়া-মিলাদ হবে। ’

প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখার শিক্ষক মোবারক হোসেন বলেন, ‘তাসনিম আলম ওরফে তিশা আমাদের প্রভাতী শাখার বাংলা ভার্সনের ছাত্রী ছিল। সে লেখাপড়ায় মনোযোগী এবং নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল। ক্লাশ শেষে শিক্ষার্থীরা নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাবে, আবার ক্লাসে আসবে—আমরা এটাই প্রত্যাশা করি। আমাদের ক্লাস থেকে বেরিয়ে একটি শিশু লাশ হয়ে বাড়ি ফিরবে এটা শিক্ষক হিসেবে আমাদের জন্য ভীষণ কষ্টের। ’

মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটে তিশার এক সহপাঠী শান্তা। স্কুল বন্ধের নোটিশ দেখে সকালে বাবার সঙ্গে বিরস মুখে বাসায় ফিরে যাচ্ছিল। পথে জানতে চাইলে সে বলে, ‘ওকে আমরা সবাই ভালোবাসি। সে সবার সঙ্গে মিশত। ওকে আমরা আর দেখব না! মন খারাপ লাগছে। ’

অধ্যক্ষ ওসমান গণির মেয়ে মুনও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। জানতে চাইলে সে বলে, ‘আমি ইংলিশ ভার্সনে পড়ি। তাই ওকে চিনি না। তবে ঘটনা শুনে আমার খুব খারাপ লাগছে। ’

তিশাদের বাসা কাজীপাড়ায় ৬৪৪/৭ নম্বর ভবনে। শিশুটির মরদেহ দাফনের জন্য গ্রামের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জে নিয়ে গেছে স্বজনরা। গতকাল ওই বাড়িতে গেলে প্রতিবেশী মো. রাশেদ বলেন, ‘তিশা মেয়েটি লক্ষী ও শান্ত ছিল। প্রতিদিন ওকে মায়ের সঙ্গে স্কুলে যেতে ও আসতে দেখতাম। আর মেয়েটাকে দেখব না, এটা ভাবতেই কেমন যেন লাগছে। ’


মন্তব্য