kalerkantho


রোগী ও স্বজনের ভিড়ে কাহিল

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রোগী ও স্বজনের ভিড়ে কাহিল

বহির্বিভাগ-অন্তর্বিভাগ যেখানেই যাওয়া যায় সব জায়গাই ভিড়ে ঠাসা। একজন করে রোগীর সঙ্গে কয়েকজন স্বজন ও সহযোগী।

রোগীর সংখ্যাও বেশি। বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছে প্রায় হাজার রোগী। প্রতিদিন ভর্তি থাকছে অন্তত ২৪০ থেকে ২৫০ জন রোগী। ৫০ শয্যার অবকাঠামোর ওপর ১০০ শয্যার হাসপাতাল। বলা হচ্ছে শেরপুর জেলা হাসপাতালের কথা। গতকাল বুধবার সরেজমিনে ঘুরে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রমে নানা সংকট ও অসংগতির সঙ্গে এমন চিত্রও দেখা গেছে। অতিরিক্ত রোগী আর সঙ্গে আসা স্বজনদের চাপে হাসপাতালের কাহিল অবস্থা।

‘হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার লক্ষ্যে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। সেটি চালু না হওয়া পর্যন্ত আমাদের শেরপুরবাসীর কষ্ট দূর হবে না।

’ কথাগুলো বলছিলেন জেলা হাসপাতালের প্রধান সহকারী আহমদুন্নবী সজল।

সকাল ৯টায় শেরপুর জেলা হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারের সামনে নারী-পুরুষের লম্বা সারি। বহির্বিভাগের বিভিন্ন চিকিৎসকের সামনে টিকিট হাতে অপেক্ষমাণ রোগীদের ভিড়।

অন্তর্বিভাগের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, নিচতলার পুরুষ সার্জারি ও মেডিসিন ওয়ার্ড, দোতলার গাইনি ও মহিলা ওয়ার্ড, তিনতলার শিশু ওয়ার্ড সবখানেই রোগী আর রোগীদের সঙ্গে আসা লোকজনের উপচে পড়া ভিড়। ওয়ার্ডগুলোর মেঝে, বারান্দা এবং চলাচলের খোলা স্থানেও রোগী রাখা হয়েছে।

সকাল ১১টা ২০ মিনিট। পুরুষ ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, মেডিসিন ওয়ার্ডে সিনিয়র মেডিসিন কনসালট্যান্ট ডা. আলমগীর মোস্তাক আহম্মদ ও সার্জারি ওয়ার্ডে সার্জারি কনসালট্যান্ট ডা. মুক্তি মাহমুদ রোগী দেখছেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে তাঁরা বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগী দেখেন। তখন ওয়ার্ডের বাইরে অপেক্ষমাণ রোগীর স্বজনদের চাপে সেখানে হাঁটাচালাও দায় হয়ে যাচ্ছিল। কেউ কেউ আবার দরজায় দাঁড়ানো হাসপাতালের কর্মচারীদের ঠেলে ভেতরে ঢুকতে চেষ্টা করছিল। এ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের উচ্চবাচ্যও হচ্ছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন স্টাফ নার্স বলেন, ‘এমনিতেই বেডের অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকছে। তার ওপর প্রত্যেক রোগীর সঙ্গে তিন-চারজন অ্যাটেনডেন্ট। তাদের চলে যেতে বললেও যায় না, আবার ওয়ার্ড থেকে বের করে দিলে নানা কথাবার্তা বলে, ক্ষমতা দেখায়। কখনো কখনো গেটম্যানদের গায়েও হাত তোলে। এতে করে অনেক সময় কাজের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত ঘটে। ’

তবে আব্দুস সামাদ মিয়া (৪২) নামের এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে ভর্তি রোগীদের সব ওষুধপত্র তো আর দেওয়া হয় না। নার্সদেরও অনেকের আচরণ সুবিধার না। তারা অনেক সময় কাজে গাফলতি করে। বাইরে থেকে ওষুধ আনা লাগে, টেস্টফেস্ট করানো লাগে, রোগীরে খাওয়ান লাগে, আবার নার্সকে ওষুধ সেবনের বিষয়টিও মনে করিয়ে দিতে হয়। এতে রোগীর সঙ্গে দু-একজন লোক সব সময় লাগে। ’

জানা গেছে, অন্তর্বিভাগে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসক দেখানোর কাজটি সকাল সাড়ে ১০টা-১১টার আগে শুরু হয় না। খুব জরুরি না হলে ভর্তি রোগীদের দিন-রাতের মধ্যে একবারের বেশি চিকিৎসক দেখানো সম্ভব হয় না। এমন অভিযোগ চিকিৎসা নিতে আসা রোগী, তাদের স্বজন ও হাসপাতালের অনেক কর্মচারীর।

তবে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. নাহিদ কামাল বলেন, ‘চিকিৎসক সংকট রয়েছে, তার পরও আমরা সাধ্যমতো মানসম্মত সেবা দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখন আগের তুলনায় হাসপাতালের সেবার মান অনেক উন্নত হয়েছে। ’ 

১১টা ২৮ মিনিট। দোতলার অস্ত্রোপচার কক্ষের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ‘ফুটফুটে এক নবজাতক কোলে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে এক তরুণী। তার চোখেমুখে হাসির ঝিলিক। কোলের সেই নবজাতকের ছবি মোবাইল ফোনে তুলেই চলেছেন এক যুবক। কাছেই দাঁড়িয়ে মধ্যবয়সী এক ব্যক্তিও হাসিমুখে নবজাতককে দেখছিলেন। ’

কথা হয় ওই ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি নালিতাবাড়ী উপজেলার গোল্লারপাড় গ্রামের বাসিন্দা। নাম ইসমাইল হোসেন। তিনি জানান, তাঁর ভাগ্নির মেয়ে হয়েছে। আরেক ভাগ্নি তাকে কোলে নিয়ে আছে। হাসপাতালেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আধঘণ্টা আগে শিশুটির জন্ম। তখনো নবজাতকের মাকে অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে আনা হয়নি।

ইসমাইল বলেন, নবজাতকের বাবা ঢাকায় চাকরি করেন। এ জন্য তাঁর ভাগিনা ছবি তুলে শিশুটির বাবার ফেসবুকে পাঠাচ্ছে। হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হওয়ায় তাঁদের অনেক টাকা বেঁচে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন হাসপাতালে অপারেশন হওয়ায় আমগর মতো সাধারণ মানুষের অনেক উপকার হয়েছে। ’

স্টাফ নার্স মো. শাহাদাত হোসাইন জানান, গতকাল জেলা হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মধ্যে চার প্রসূতির সন্তান প্রসব হয়েছে। সাধারণ অস্ত্রোপচারও হয়েছে ১১টি। প্রতি সোম ও বুধবার নিয়মিত এখন অস্ত্রোপচার হচ্ছে।

অস্ত্রোপচার কক্ষের সামনে জাহাঙ্গীর আলম নামের এক যুবককে দেখা যায় মোবাইল ফোন হাতে ইতস্তত ছোটাছুটি করতে। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি একজন রোগীর জন্য রক্তদাতা এনেছেন, যাঁর অস্ত্রোপচার হবে। শেরপুর জেলা রক্তদান সমাজকল্যাণ সংস্থা নামে তাঁদের একটি রক্তদান সংগঠন রয়েছে। তিনি ওই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক।

জাহাঙ্গীর জানান, দুপুর পর্যন্ত তাঁদের ছয়জন রক্তদাতা বিনা মূল্যে ছয় ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন। আরো একজন রক্তদাতা আসবেন এ জন্য তাঁকে ফোন করছিলেন।

জেলা হাসপাতালের মেডিক্যাল অ্যাসিসট্যান্ট (ল্যাব) মো. আব্দুল মোতালেব ও প্রধান সহকারী আহমদুন্নী সজল বলেন, স্বেচ্ছাসেবী ওই রক্তদান সংস্থার সদস্যরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে খুব সহায়তা করে থাকে। চাইলেই সংগঠনটি রক্তের জোগান দিয়ে থাকে। তাঁরা বলেন, ওই রক্তদান সংস্থার সহায়তায় শেরপুর সরকারি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, ডা. সেকান্দর আলী কলেজ ও মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন আহম্মদ কলেজের এক হাজার ছাত্র-ছাত্রীর রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে মোবাইল ফোন নম্বরসহ স্বেচ্ছায় রক্তদাতার একটি তালিকা হাসপাতালে সংরক্ষণ করা আছে। যখন প্রয়োজন হচ্ছে তখন তাঁদের ডাকা হচ্ছে। তাঁরাও সাড়া দিচ্ছেন। এতে জটিল রোগীদের সেবা দেওয়া সহজ হচ্ছে।

এর আগে সকাল ৯টা ৩৮ মিনিটে বহির্বিভাগের ৩, ৪, ৫, ৭ ও ১০ নম্বর কক্ষ এবং জরুরি বিভাগের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তবে এসব সারির আগে কক্ষগুলোর দরজার পাশে ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিদের ব্যাগ-আর ব্রিফকেসের সারি দেখা যায়। সাড়ে ৯টার দিকে বহির্বিভাগের প্রায় সব কক্ষের চিকিৎসকরা চলে আসেন। তবে তাঁরা রোগীর পরিবর্তে প্রথমেই ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ শেষ করার তোড়জোড় দেখান। প্রায় ২০-২৫ মিনিট ধরে চলে এ সাক্ষাৎ-পর্ব। এরপর টিকিট কাটা রোগীদের দেখা শুরু করেন চিকিৎসকরা।

শ্রীবরদী উপজেলার ঝগড়ার চর গ্রাম থেকে স্ত্রীকে চিকিৎসক দেখাতে আসা হাবিবুর রহমান (৩৬) বলেন, ‘ওষুধ কম্পানির লোকদের নাইগ্গা এইন পারাই দিওয়ুন যায় না। ওগরে সিরিয়ালই আগে। ’

চর্মরোগের সমস্যা নিয়ে আসা ৪ নম্বর কক্ষের সামনে সারিতে দাঁড়ানো তাতালপুর গ্রামের সুমন মিয়া (৪২) বলেন, ‘এক ঘণ্টা ধইরা খারাই আছি। কিন্তু ডাক্তর যাও আইল, হুরমুরাইয়া ওষুধ কম্পানির লোহেরা ঢুইক্কা পড়ল। ডাক্তরেরা কম্পানি নিয়াই বাঁচে না, পাবলিক দেকপো কহন। ’ তবে সকাল ১০টার পরে ওষুধ কম্পানির কোনো প্রতিনিধিকে বহির্বিভাগে আর দেখা যায়নি।

হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে কথা হয় শেরপুর জেলা ফার্মাসিউটিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ অ্যাসোসিয়েশন (ফারিয়া) সাধারণ সম্পাদক মো. সারোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সপ্তাহের তিন দিন শনি, সোম ও বুধবার জেলা হাসপাতালের ডাক্তারদের সঙ্গে ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিদের সাক্ষাতের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই তিন দিন সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত এই সাক্ষাতের সময়। এরপর আমরা আর হাসপাতালে ডাক্তার ভিজিট (সাক্ষাৎ) করি না। তবে মাঝেমধ্যে আউটডোরে (বহির্বিভাগে) ডাক্তার বসতে দেরি হলে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে আমরা কাজ শেষ করি, যাতে রোগীদের কষ্ট না হয়। ’

এ বিষয়ে আরএমও ডা. নাহিদ কামাল বলেন, হাসপাতালে ওষুধ কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। যাতে রোগীদের সঠিক সেবা নিশ্চিত করা যায়। এ জন্য দেয়ালে দেয়ালে নোটিশও টানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

 


মন্তব্য