kalerkantho


মা-ছোট ভাইয়ের সামনে বাসে পিষ্ট তিশা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মা-ছোট ভাইয়ের সামনে বাসে পিষ্ট তিশা

মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত তিশার স্বজনদের আহাজারি। ইনসেটে তিশা। ছবি : কালের কণ্ঠ

অিন্য দিনগুলোর মতো গতকাল সকালে মায়ের সঙ্গে স্কুলে গিয়েছিল তাসনিম আলম তিশা (১১)। ছুটির পর মায়ের সঙ্গেই বাসায় ফিরছিল সে।

সঙ্গে ছিল তার ছোট ভাইও। ফেরার পথে ভীষণ ক্ষুধা পাওয়ার কথা জানিয়ে খেতে চেয়েছিল তিশা। মা বাসায় রান্না করে রেখে আসা খাবার খাওয়ানোর কথা জানিয়েছিলেন তাকে।

তবে ক্ষুধার্ত মেয়ের মুখে আর খাবার তুলে দিতে পারেননি মা রিমা আক্তার। তাঁর চোখের সামনেই বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিভে গেছে ছোট্ট তিশার জীবনপ্রদীপ।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুরের রোকেয়া সরণির লাইফ এইড হাসপাতালের সামনে ঘটে এ দুর্ঘটনা। তিশা ছিল মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, রিকশায় করে বাসার কাছে পৌঁছার পর মা রিমা আক্তার ও ছোট ভাই তাহমিদ আলমের (৫) সঙ্গে হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছিল তিশা। ওই সময় তেঁতুলিয়া পরিবহনের বেপরোয়া গতির একটি বাস তিশাকে চাপা দেয়।

ঘটনাস্থলেই মারা যায় সে। চোখের সামনে মেয়েকে এভাবে হারানোয় আহাজারি করতে থাকেন রিমা আক্তার। পাশেই পড়ে ছিল তিশার থেঁতলে যাওয়া রক্তাক্ত মরদেহ।

এই করুণ দৃশ্য দেখে আবেগ ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে আশপাশের মানুষ। উত্তেজিত জনতা সড়ক অবরোধ করে তেঁতুলিয়া পরিবহনের কয়েকটি বাস ভাঙচুর করে। স্থানীয়দের সঙ্গে জড়ো হয় স্কুলের শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তারা তিশাকে চাপা দেওয়া বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এদিকে অবরোধের কারণে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয় রাস্তায়। তখন স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়াধাওয়ির ঘটনাও ঘটে। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলাকাবাসীকে আশ্বস্ত করে পরিস্থিতি শান্ত করেন। এর আগে রোকেয়া সরণির মিরপুর-১০ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত সড়কে প্রায় দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আহমেদ বলেন, দুপুর ১টার দিকে আব্দুল্লাহপুর থেকে মোহাম্মদপুরগামী তেঁতুলিয়া পরিবহনের বাসটির (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৭৩৭০) চাপায় তিশা নামের শিশুটি ঘটনাস্থলেই মারা যায়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করেছে।

এ ঘটনায় বাসটিসহ অভিযুক্ত চালক আব্দুর রহিম ওরফে বাবুকে আটক করা হয়েছে। মামলা প্রক্রিয়াধীন।

ডিএমপির ট্রাফিক পশ্চিম বিভাগের পল্লবী জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) সাইকা পাশা জানান, বাসটি মিরপুর ১০ থেকে আগারগাঁও যাচ্ছিল। দুর্ঘটনার পর বাসটিতে আগুন দেয় উত্তেজিত জনতা। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করে। এরপর রাস্তা থেকে বাসটি সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।

তিশার স্বজনরা জানায়, মিরপুরের পূর্ব কাজীপাড়ার আল হেলাল হাসপাতালের কাছেই তিশাদের বাসা। তার বাবা খোরশেদ আলম মিরপুর এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। খোরশেদ ও রিমা দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে তিশা ছিল বড়।

গতকাল দুপুরে রাস্তা থেকে লাশ উদ্ধার করার পর পুলিশ ভ্যানের কাছে গিয়ে মেয়ের জন্য আহাজারি করছিলেন মা রিমা আক্তার—‘ওর তো দুপুরে ভাত খাওয়ার কথা ছিল। খিদা লাগছে। বাসায় নিয়া ভাত দিব বলছিলাম। আমার মেয়েরে ফিরিয়ে দেন। ও আল্লাহ...। ’ রিমার এমন বিলাপে স্বজনরাও কান্নায় ভেঙে পড়ে। চোখ ভিজে ওঠে উপস্থিত অপরিচিত অনেকের।

তিশার বাবা খোরশেদ আলমের সহকর্মী মোহন সরকার বলেন, দুপুর ১টার দিকে স্কুল ছুটির পর তিশা ও তাহমিদকে নিয়ে একটি রিকশায় করে পূর্ব কাজীপাড়ার বাসায় ফিরছিলেন তাদের মা। রিকশাটি লাইফ এইড হাসপাতালের সামনে থামে। সেখান থেকে সড়কদ্বীপ পার হতে যায় তিনজন। মা রিমা ছেলে তাহমিদের হাত ধরে ছিলেন। তিশা পাশেই ছিল। মা ছেলেকে নিয়ে সড়কদ্বীপে উঠলেও তিশা উঠতে গিয়ে পড়ে যায়। ওই মুহূর্তে দ্রুতগতির বাসটি তাকে চাপা দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে চায়ের দোকানি সোহরাব হোসেন বলেন, ঘটনার পর মা পেছনে ফিরে তিশার থেঁতলে যাওয়া মৃতদেহ দেখে বিলাপ শুরু করেন। তখন ছোট ভাইটা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। লোকজন এই দৃশ্য দেখে দৌড়ে গিয়ে বাসটি আটকে ফেলে। চালককে ধরে পিটুনিও দেওয়া হয়। পরে পুলিশ তাকে নিয়ে যায়।

আরো কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, পুলিশ প্রথমে লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চাইলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। পরে পুলিশ পিছু হটে বিক্ষোভকারীদের বুঝিয়ে শান্ত করে। পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযুক্ত চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। বিকেল ৩টা থেকে রোকেয়া সরণির যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

তিশার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক ওসমান গণি বলেন, ‘তিশা খুব মেধাবী ছাত্রী ছিল। তার এই অকালমৃত্যু কোনোভাবে মেনে নিতে পারছি না। এই রুটে বাসগুলো খুব বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ’ দোষী চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি। এ ঘটনার প্রতিবাদে স্কুলের পক্ষ থেকে কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও জানান প্রধান শিক্ষক।


মন্তব্য