kalerkantho


স্বাস্থ্য পরীক্ষার স্লিপ ঢাকায় গামকায় ভোগান্তি, ঘুষে স্বস্তি

হায়দার আলী   

১৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



স্বাস্থ্য পরীক্ষার স্লিপ ঢাকায় গামকায় ভোগান্তি, ঘুষে স্বস্তি

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে যেতে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কোনাবাড়ী থেকে মঙ্গলবার ঢাকায় আসেন মিজানুর রহমান। স্বাস্থ্য পরীক্ষার স্লিপের জন্য পরদিন বুধবার সকাল ৬টায় ভাটারার মাদানী এভিনিউয়ে মেডিক্যাল সেন্টারস অ্যাসোসিয়েশন (গামকা) অফিসের সামনে লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু কাতার তো দূরের কথা, স্বাস্থ্য পরীক্ষার স্লিপই তাঁর কাছে সোনার হরিণ মনে হচ্ছে। কেননা লাইনে তাঁর আগেই বহু মানুষ। পরেও কয়েক শ।

বুধবার ওই অফিসে সরেজমিনে গেলে মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে লাইন ধরার জন্য সকালে এসে দেখি আমার আগেও শতাধিক মানুষ লাইনে আছে। এখান থেকে স্লিপ না পেলে মেডিক্যাল চেকআপ করাতে পারব না। কষ্ট হলেও এখন স্লিপের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ’

কেবল মিজান নয়, ওই লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে স্লিপ নিতে হচ্ছে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক নারীকর্মীদেরও। কেননা ঢাকার বাইরে দুই বড় শহরে অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টার থাকলেও স্লিপ নিতে হচ্ছে ঢাকায় গামকা অফিস থেকেই। তবে ওই অফিসের কর্মীদের বাড়তি টাকা দিলে স্লিপ মেলে দ্রুত।

   

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মোর্চা গালফ কো-অপারেটিভ কাউন্সিল (জিসিসি) অনুমোদিত এই গামকা অফিসের সামনে এমন ভোগান্তির চিত্র প্রতিদিনের। আগে গুলশান-২ নম্বরে ছিল গামকা অফিস। শত শত মানুষের উপস্থিতি আর নানা সমস্যার কারণে সেটি স্থানান্তর করা হয় ভাটারার মাদানী এভিনিউ এলাকায়। এখানেও দিনভর ভোগান্তির শিকার হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য গমনেচ্ছু কর্মীরা।

জানা গেছে, গামকার নির্ধারিত মেডিক্যাল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর আগে মধ্যপ্রাচ্য যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের পাসপোর্ট ও ভিসার তথ্য প্রতিষ্ঠানটির সার্ভারে লিপিবদ্ধ করার পাশাপাশি কর্মীর ছবি তুলে রাখা হয়। নিবন্ধনের পর একটি স্লিপ নিয়ে গামকার সদস্যভুক্ত রাজধানীর ২৬টি মেডিক্যাল সেন্টারের যেকোনো একটিতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হয়।

গামকা অফিসের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকেই অভিযোগ করেন, সকাল থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেকেই লাইন ছাড়াই স্লিপ সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছে। গামকার ভেতরেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে আঁতাত আছে কিছু এজেন্সির লোকজনের। তারা ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা বাড়তি নিয়ে আগেই স্লিপ জোগাড় করে দিচ্ছে।

চার ঘণ্টার বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা থেকে আসা আবুল হোসেন। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। কিন্তু অনেকেই দালালদের মাধ্যমে টাকা দিয়ে আগেই স্লিপ নিয়ে যাচ্ছে। ’

একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে নরসিংদীর রায়পুরার আদিয়াবাদ ইউনিয়ন থেকে আসা জহুরুল মণ্ডল বলেন, ‘সেই সকাল ৭টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। দুপুর পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু স্লিপ কখন পাব জানি না। এখানের নিবন্ধন না হলে বিদেশ যাওয়া যাবে না। ’

ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর স্লিপ পেয়ে মাদারীপুর শিবচর থেকে আসা মো. আলম মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টির মধ্যেও লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে স্লিপ নিয়েছি। গামকার নির্ধারিত বনানীর একটি মেডিক্যাল সেন্টার থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জিসিসির সদস্য রাষ্ট্র সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এসব দেশে গমনেচ্ছুদের গামকা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হয়। গামকায় এন্ট্রি স্লিপের জন্য জনপ্রতি ৩০০ টাকা দিতে হয়। এই টাকা জমা নেওয়ার কোনো সরকারি নির্দেশনা না থাকলেও তারা নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এইচআইভি, মূত্র পরীক্ষাসহ রক্তের কয়েকটি পরীক্ষা এবং বুকের একটি এক্সরের জন্য জমা দিতে হয় পাঁচ হাজার টাকা।

বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের অভিযোগ, যেসব স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য গামকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে সেগুলো দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় অন্য যেকোনো ভালো মানের হাসপাতালে করা সম্ভব। স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে প্রতিদিনই হাজার হাজার কর্মীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে গামকার মহাব্যবস্থাপক লাহুয়ার রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন ভোগান্তি আগের চেয়ে কমেছে। এর চেয়ে বেশি কিছু আমরা করতে পারব না। ’ ঘুষ নিয়ে স্লিপ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বেশি টাকা নেওয়া প্রসঙ্গে গামকার মহাব্যবস্থাপক বলেন, ‘আমরা তো পাঁচ হাজার টাকা নিই। কুয়েতসহ অন্য দেশগুলোতে যারা মেডিক্যাল করছে তারা এখন ১০ হাজার টাকার বেশি নিচ্ছে। ’

গামকা অফিসে হয়রানির প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গামকায় হয়রানির জন্য কিছু সিন্ডিকেট দায়ী। হয়রানি বন্ধ করতে গামকার উচিত আরো কয়েকটি সাব-সেন্টার করা এবং সেবা দেওয়ার জন্য লোকবল বৃদ্ধি করা। ’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকায় গামকা নির্ধারিত ২৬টি মেডিক্যাল সেন্টার রয়েছে। এ ছাড়া সিলেটে রয়েছে চারটি এবং চট্টগ্রামে তিনটি। সিলেট ও চট্টগ্রামের লোকজনকেও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকায় এসে গামকা থেকে স্লিপ সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

ঢাকায় গামকা মনোনীত ২৬টি মেডিক্যাল সেন্টার হলো আল ফালাহ মেডিকম ক্লিনিক প্রাইভেট লিমিটেড, আল গাফিলি মেডিক্যাল সেন্টার লিমিটেড, আল হুমায়রা হেলথ সেন্টার লিমিটেড, আল মদিনা মেডিক্যাল সার্ভিসেস, আল রিয়াদ মেডিক্যাল চেকআপ, অ্যারাবিয়ান মেডিক্যাল সেন্টার, চাঁদসি মেডিক্যাল সেন্টার, ফেয়ারওয়ে মেডিক্যাল সেন্টার লিমিটেড, গ্রিন ক্রিসেন্ট হেলথ সার্ভিসেস, গালফ মেডিক্যাল সেন্টার, গুলশান মেডিকেয়ার, হেলথ কেয়ার সেন্টার, ইবনে সিনা মেডিক্যাল চেকআপ ইউনিট। আইআইআরও মেডিক্যাল সেন্টার, ইন্টারন্যাশনাল হেলথ সেন্টার লিমিটেড, লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, মক্কা মেডিক্যাল সেন্টার, মেডিনোভা মেডিক্যাল সার্ভিসেস সেন্টার লিমিটেড, মাস্কাট মেডিক্যাল সেন্টার, নাফা মেডিক্যাল সেন্টার, ন্যাশনাল মেডিক্যাল সেন্টার লিমিটেড, নোভা মেডিক্যাল সেন্টার লিমিটেড, পালস্ মেডিক্যাল সেন্টার লিমিটেড, পুষ্প ক্লিনিক, সায়মন মেডিক্যাল সেন্টার লিমিটেড ও সৌদি বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড।


মন্তব্য