kalerkantho


মায়ের কান্না দেখা হয় না সিদ্দিকের, নিজেও কাঁদেন নীরবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



মায়ের কান্না দেখা হয় না সিদ্দিকের, নিজেও কাঁদেন নীরবে

ফাইল ছবি

ময়মনসিংহের ঢাকেরকান্দা গ্রামের ছোলেমা খাতুন ছেলেকে ফিরে পেয়েছেন ঠিকই, মা-ছেলের দৃষ্টিবিনিময় আর হয়নি। মা অশ্রুভাসা চোখে সন্তানকে যখন দেখেন, ছেলে সিদ্দিকুরের সামনে কেবলই খেলা করে অন্ধকার।

মায়ের দিকে চেয়ে থাকেন সিদ্দিকুর আর নীরবে চোখের পানি ফেলেন। মাকে আর তাঁর দেখা হয় না।

শুক্রবার ভারত থেকে সিদ্দিকুর ফেরার পর ঢাকায় হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে আছেন মা ছোলেমা খাতুন। ‘আমার ছেলের চোখ আর ভালো হবে কি না, আমি জানি না। তবে ওর চোখে শুধু পানি দেখি। আমার মনে হয়, ওই চোখে কিছু নাই। ’ ছোলেমা খাতুন গতকাল শনিবার এভাবেই কালের কণ্ঠ’র কাছে নিজের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘কোনো মা কি সন্তানের এই হাল দেখতে পারে! কিন্তু আমার তো দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই। ’

দেশে ফেরার পর সরকারি ব্যবস্থাপনায়ই সিদ্দিকুরকে আবারও ভর্তি করা হয়েছে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে।

হাসপাতালের ষষ্ঠ তলায় ৩ নম্বর ভিআইপি কেবিনে আছেন সিদ্দিক। গতকাল সকালে ওই হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি বড় টিম তাঁর সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। সিদ্দিককে সঙ্গে করে ভারত নিয়ে যাওয়া ও নিয়ে আসা চিকিৎসক এবং ওই প্রতিষ্ঠানের সহযোগী অধ্যাপক জাহিদুল হক মেনন সবাইকে ভারতের চিকিৎসার বিষয়ে ব্রিফ করেন।

জানতে চাইলে ডা. মেনন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে সিদ্দিকের চোখের নতুন কোনো চিকিৎসা আছে বলে মনে হয় না। বরং এখন কেবল ফলোআপ করা, ঠিকমতো ওষুধ ব্যবহার করা, নতুন কোনো উপসর্গ হয় কি না সেগুলো পর্যবেক্ষণ করাই মূল কাজ। সাধারণত এগুলো বাড়িতে বসেই করা সম্ভব। তবে সিদ্দিক যেহেতু আলাদা একটি প্রেক্ষাপটের রোগী তাই তার বিষয়ে আমাদের আলাদা সুবিধা দিয়ে হাসপাতালে রাখছি। সিদ্দিকের নিজের ইচ্ছাতেই আমরা আরো কিছুদিন তাকে এই হাসপাতালে রাখব। ’

ডা. মেনন গত কয়েক দিন ভারতে সিদ্দিকের সঙ্গে থাকার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘সিদ্দিকের অসহায়ত্ব দেখে একজন ডাক্তার হওয়ার পরও খুব অসহায় লেগেছে। যেই ছেলেটি তারুণ্যের টানে মিছিলে গিয়েছিল, সে কি না অন্যের হাত ধরে, সিঁড়ির খুঁটি ধরে পা ঠেলে ঠেলে অন্ধকার চোখে পথ চলছে, চোখের আলো ফেরার আশায় এখনো ডাক্তারদের দিকে তাকিয়ে আছে। ’

গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদক যখন সিদ্দিকুরের খোঁজ নিতে যান, তখন তিনি ঘুমে।

গত ২০ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা চেয়ে শাহবাগে বিক্ষোভ করছিল শিক্ষার্থীরা। এ সময় পুলিশের ছোড়া টিয়ার গ্যাসের শেলের আঘাতে সিদ্দিকুরের দুই চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার দিনই তাঁকে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঢাকায় অস্ত্রোপচারের পর সিদ্দিকুর রহমানের ডান চোখে দৃষ্টি ফেরার সম্ভাবনা নেই বলে জানান চিকিৎসকরা। তাঁরা বলেন, বাঁ চোখে আলো ফেরার সম্ভাবনা আছে। আর এ জন্যই সিদ্দিকুরকে চেন্নাইয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠায় সরকার। তবে চেন্নাইয়ের শঙ্কর নেত্রালয়ের চিকিৎসক লিঙ্গম গোপাল গত ৩১ জুলাই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বাঁ চোখেও আলো ফেরার সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ রয়েছে বলে জানিয়ে দেন। এর পরও সিদ্দিকুর চোখ অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন। গত ৪ আগস্ট সেই অস্ত্রোপচার হয়। কিন্তু ভারতে ১১ দিনের এই চিকিৎসা সিদ্দিকুরের চোখের আলো ফেরাতে পারেনি। অবশেষে চোখে অন্ধকার নিয়েই শুক্রবার দেশে ফেরেন রাজধানীর তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী অতিদরিদ্র পরিবারের সন্তান সিদ্দিকুর রহমান। বিমানবন্দরে পা দিয়েও সিদ্দিকুর সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁর চোখ তো গিয়েছেই, বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যেন পূরণ হয়।


মন্তব্য