kalerkantho


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ সম্মেলন

সীতাকুণ্ডে ৯ শিশুর মৃত্যু হামে আক্রান্ত হয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



সীতাকুণ্ডে ৯ শিশুর মৃত্যু হামে আক্রান্ত হয়ে

প্রথমে অজানা রোগে মৃত্যুর কথা বলা হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়েছে হামের সংক্রমণে সীতাকুণ্ডের ৯ শিশুর মৃত্যু ও ৯০ জন আক্রান্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুষ্টিহীনতা ওই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে। পাশাপাশি কুসংস্কারের কারণে সময়মতো আধুনিক চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে হামে আক্রান্ত এলাকার ৮৫টি পরিবারের মোট ৩৮৮ জন মানুষ। গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।

এ সময় ডা. আবুল কালাম আজাদ ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের গবেষকদলের পর্যবেক্ষণ ও আক্রান্তদের রক্ত ও গলার নিঃসরণ নমুনা ঢাকায় ল্যাবে নিয়ে এসে পরীক্ষার মাধ্যমে হামের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এ সময় জানানো হয়, ঘটনাস্থল ত্রিপুরাপাড়ার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিশেষ কুসংস্কারে বিশ্বাস করে। ফলে একাধিক শিশুর মৃত্যুর পরও তারা আধুনিক কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে না গিয়ে বা খবর না দিয়ে নিজেরাই কুসংস্কারের ভিত্তিতে মশাল জ্বালিয়ে বিশেষ প্রার্থনা করে। এর পরও একের পর এক শিশু মারা গেলে প্রতিবেশী এলাকার বাঙালিদের কাছ থেকে খবর পেয়ে সীতাকুণ্ডের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে আক্রান্তদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। এর পরই ঘটনাটি জানাজানি হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, একটি এলাকায় হামের এমন ঘটনা ঘটলেও দেশে এখন হামের কোনো প্রাদুর্ভাব নেই। সেই সঙ্গে হামের টিকার কার্যক্রমও সঠিকভাবেই চলছে। সীতাকুণ্ডের ওই ৮৫টি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে টিকা পৌঁছাতে না পারার জন্য মহাপরিচালক দুঃখ প্রকাশ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা, আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

চিকুনগুনিয়া : এদিকে আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে গত ৯ এপ্রিল থেকে ১৬ জুলাই বিকেল ৫টা পর্যন্ত আইইডিসিআর ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া চিকুনগুনিয়া রোগীর সংখ্যা ৭০৬ জন। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে বগুড়ায় আট, চট্টগ্রামে এক, দিনাজপুরে এক, গোপালগঞ্জে ৯, হবিগঞ্জে তিন, জয়পুরহাটে এক, লক্ষ্মীপুরে তিন, নরসিংদীতে ১৪ জন সম্ভাব্য রোগীর রিপোর্ট সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাওয়া গেছে। এদের সবাই ঢাকা থেকে যাওয়া ও বেশির ভাগ পুরনো রোগী।

মশার ব্যাপারে সতর্কতা : এদিকে আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে মানুষকে মশার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য এক বার্তায় জানানো হয়েছে, চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের বাহক এডিস মশা পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলেই দেখা যায়। এডিস মশা লোকবসতির আশপাশেই বসবাস করে এবং লোক চলাচলের সঙ্গেই এরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বিস্তৃতি লাভ করে।

এডিস ইজিপ্টি : এ মশাকে শহর অঞ্চলে দেখা যায় বলে একে শহরের মশা বলা হয়। এরা প্লাস্টিকের বা কাচের পাত্র, সিমেন্টের চৌবাচ্চা, টায়ার ইত্যাদি যেকোনো ধরনের পাত্রের জমা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। এ মশা শুধু মানুষের রক্ত পান করে। এদের ঘরের ভেতরে অন্ধকার জায়গায় বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। এরা জন্ম বা উত্পত্তিস্থল থেকে ১০০-৩০০ মিটার দূর পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে।

এডিস এলবোপিক্টাস : এ প্রজাতির মশা সাধারণত গ্রামাঞ্চল, বিশেষ করে যেখানে খোলা জায়গা ও প্রচুর গাছপালা রয়েছে তেমন জায়গায় বেশি দেখা যায়। এ মশা আর্দ্রতা পছন্দ করে। এরা সাধারণত প্রাকৃতিক পাত্র—যেমন গাছের ফোকর, পাতার ভাঁজ, কাটা বাঁশের খোলা অংশ, মাটির পাত্র ইত্যাদিতে জমে থাকা অল্প পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। এ মশা মানুষসহ পাখি, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর রক্ত পান করে। এরা উত্পত্তিস্থল থেকে ৫০০ মিটার দূর পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে। এ মশাকে ঘরের ভেতরে ও বাইরে অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। এ দুই প্রজাতির মশারই জীবনচক্রে চারটি ধাপ রয়েছে। এগুলো হলো—ডিম, লার্ভা, পিউপা ও পূর্ণ বয়স্ক মশা। ডিম থেকে পূর্ণ বয়স্ক মশা হতে ৬-৮ দিন সময় লাগে। পূর্ণ বয়স্ক মশা সাধারণত ৭-১০ দিন বেঁচে থাকে। তবে বর্ষাকালে অনুকূল পরিবেশে এরা সর্বোচ্চ ২১ দিন বেঁচে থাকতে পারে। ভ্রূণ হওয়ার পর এ মশার ডিম অনেক দিন (১-১.৫ বছর) পর্যন্ত শুকনো পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে। পানি পেলে অনুকূল পরিবেশে ডিম ফুটে লার্ভা বের হয় ও জীবনচক্র পার করে।

বিএমএর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান : এডিস মশার বংশ বিস্তারের কারণে নগরীতে এডিস মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া রোগের প্রকোপের কারণে চিকুনগুনিয়া জ্বর নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের লক্ষ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন গতকাল সোমবার ঢাকার লালবাগে জনসচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করে। সকাল ১১টায় লালবাগ কেল্লা মেইন গেট থেকে জনসচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। এ সময় বিএমএ মহাসচিব ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী, সহসভাপতি ডা. মো. জামাল উদ্দিন খলিফা ও ডা. মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী, সাবেক মহাসচিব ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিধন ও চিকুনগুনিয়া রোগ সম্পর্কিত তথ্যবহুল লিফলেট বিতরণ করা হয়।

বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন জনসচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান উদ্বোধনকালে বলেন, ‘বর্ষাকালে নগরীতে যত্রতত্র ফেলে রাখা ডাবের খোসা, গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার, বাসা-বাড়িতে ফুল ও গাছের টব, এসি, ফ্রিজে পানি জমে এডিশ মশার বিস্তার লাভ করায় চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তবে এসব রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কেবল জনসাধারণ সচেতন হলেই আমরা এ ধরনের রোগ প্রতিরোধ করতে পারি। ’


মন্তব্য