kalerkantho


বন্যায় উত্তরে কিছুটা উন্নতি মধ্যাঞ্চলে অপরিবর্তিত

বাড়ছে রোগব্যাধি মেডিক্যাল টিমের নামে প্রতারণা!

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



বাড়ছে রোগব্যাধি মেডিক্যাল টিমের নামে প্রতারণা!

উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে বাড়ছে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। তবে বন্যার শুরুতে ডজন ডজন মেডিক্যাল টিম গঠন করে দুর্গত মানুষকে সেবা দেওয়ার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তা কাগজে-কলমেই থেকে গেছে। এ নিয়ে গতকাল রবিবার গাইবান্ধায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বিশেষ সভায় খোদ ত্রাণমন্ত্রীর সামনেই অভিযোগ তুলেছেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া এমপিসহ অনেকে। তাঁরা বলেছেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। আর সিভিল সার্জন মেডিক্যাল টিম গঠনের ঘোষণা দিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়ও। জেলা ও উপজেলা সদরের আশপাশে সামান্য দেখা গেলেও আর কোথাও মেডিক্যাল টিমের নাগাল পায়নি মানুষ। অন্যদিকে দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। ফরিদপুর ও রাজবাড়ীতে নদীভাঙন তীব্র হয়েছে। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

ফরিদপুর : ফরিদপুরে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল ১২ ঘণ্টায় গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি বাড়েনি। ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম জানান, গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে গতকাল রবিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত পদ্মা নদীর পানি বাড়েনি। তবে গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি বিপত্সীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল, যা শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে একই মাত্রায় আছে।

এদিকে ফরিদপুর সদরের নর্থ চ্যানেল ও  ডিক্রিরচর  ইউনিয়ন দুটির পদ্মা নদীসংলগ্ন  চরাঞ্চলে বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমিতে পানি ঢুকেছে। ওই সব এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। জেলার সদরপুর উপজেলার চরনাসিরপুর ইউনিয়নে আড়িয়াল খাঁ নদে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইউনিয়নের ছোটকোলপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিনশেড ভবনটি ভাঙনের মুখে পড়ায় সেটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম : জেলার নদ-নদীর পানি কমা অব্যাহত থাকায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে ব্রহ্মপুত্রের পানি এখনো বিপত্সীমার ছয় সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধরলা ও তিস্তা অববাহিকার অনেক মানুষ ঘরবাড়িতে ফিরতে শুরু করলেও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এখনো পানিবন্দি। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। গত দুই দিনে রাজীবপুরের কোদালকাটি, রাজারহাটের বিদ্যানন্দ, চিলমারীর নয়ারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় আরো দুই শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে। বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্যের সংকটের পাশাপাশি পশুখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হলেও দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে মেডিক্যাল টিমের তত্পরতা দেখা যায়নি। মেডিক্যাল টিমের কর্মীরা দাবি করেছেন, তাঁদের যাতায়াতের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

গাইবান্ধা : জেলায় বন্যার পানি দ্রুত কমতে শুরু করেছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি হ্রাস পেয়ে তিস্তা মুখঘাট পয়েন্টে ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা শহর পয়েন্টে বিপত্সীমার ৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বন্যার কারণে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় গ্রহণকারী মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করলেও লণ্ডভণ্ড পথঘাট ও কাদা স্তূপের কারণে চরম বিপাকে পড়েছে। বিশেষ করে বেশির ভাগ কাঁচা ঘর ধসে পড়েছে। গবাদি পশুর খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।   ডুবে থাকা নলকূপের কারণে পানীয় জলের তীব্র সংকট চলছে। চর্মরোগসহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। মাঠপর্যায়ে মেডিক্যাল টিমের তত্পরতা নেই।

ত্রাণমন্ত্রীর দুর্গত এলাকা পরিদর্শন : ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া (বীরবিক্রম) গতকাল ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। সফরের শুরুতে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বিশেষ সভায় বক্তব্য দেন।

ত্রাণমন্ত্রী বলেন, বন্যার্তদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুদ রয়েছে। সুতরাং ত্রাণ বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, ‘গাইবান্ধা জেলার চারটি উপজেলায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি। বন্যার পাশাপাশি নদীভাঙন তাদের সর্বনাশ করে। তাদের জন্য স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৭টি জেলায় দুর্যোগকালীন সময়ে স্থায়ী আবাসনব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। সেখানে আশ্রয় গ্রহণকারীদের থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি ২০০ আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছে। গাইবান্ধাতেও সেই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। ’

সভায় অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল আলম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। অন্যদিকে সিভিল সার্জন ডা. মো. আমির আলী চিকিত্সকদের বাদ দিয়েই ৮৫টি মেডিক্যাল টিম গঠন করে তার প্রচারণা চালিয়ে একধরনের প্রতারণা করেছেন। ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি ও সচিব শাহ কামাল তাঁদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

সভা শেষে মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি উড়িয়া ইউনিয়নের কাবিলপুরে ত্রাণ বিতরণপূর্ব এক সমাবেশে বলেন, বন্যাকবলিত একজন মানুষও না খেয়ে থাকবে না। মন্ত্রী আরো বলেন, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।

রাজবাড়ী : গতকাল দুপুরে রাজবাড়ীর অফিসার্স ক্লাব মিলনায়তনে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. শওকত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবু তালেব। সভায় জানানো হয়েছে, জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ও সেনগ্রাম এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের কারণে হাবাসপুর চররামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি ভবনই ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম ইতিমধ্যেই তলিয়ে গেছে।

জামালপুর : জেলার মেলান্দহে গতকাল দুপুরে বন্যার পানিতে ডুবে গোলাম মোস্তফা (১৩) নামের এক কিশোর নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার গেছে। তার স্বজনরা জানায়, দেওলাবাড়ী গ্রামের শাহজাহানের ছেলে গোলাম মোস্তফা বাড়ির পাশে নইলে ঘাটে বন্যার পানিতে নামলে স্রোতের টানে ভেসে যায়। খুঁজেও না পেয়ে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দলকে খবর দেওয়া হয়। বিকেল পর্যন্ত তাকে উদ্ধার করা যায়নি। মেলান্দহের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জন কেনেডি জাম্বেল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে জামালপুরে বন্যার পানি কিছুটা হ্রাস পেলেও গতকাল পর্যন্ত জেলার ৪৮টি ইউনিয়নের দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। এসব পানিবন্দি মানুষ খাদ্য সংকটসহ নানা দুর্ভোগে পড়েছে। ইসলামপুর উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের সব সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া বন্যার কারণে এখনো জেলার ২৮৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধ রয়েছে।


মন্তব্য