kalerkantho


চিকুনগুনিয়া

‘দিনেও মশারি টানান ডাক্তাররা মাঠে নামুন’

তৌফিক মারুফ   

১৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



‘দিনেও মশারি টানান ডাক্তাররা মাঠে নামুন’

চিকুনগুনিয়াসহ মৌসুমি রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শনিবার বিএনপির পক্ষ থেকে মানববন্ধন করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

চিকুনগুনিয়াসহ নানা মৌসুমি রোগে কাবু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লাখো মানুষ। দেরিতে হলেও সরকারের দিক থেকে চলছে নানা কার্যক্রম। রোগ প্রতিরোধে চলছে জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা ও কর্মসূচি। গতকাল কালের কণ্ঠে ১০ মৌসুমি রোগ নিয়ে চার পৃষ্ঠার নানামুখী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়। মানুষ পথে-ঘাটে ভিড় করে পড়েন কালের কণ্ঠ। কোথাও কোথাও কপি না পেয়ে ফটোকপি নিতেও দেখা যায়। সেই সঙ্গে অনলাইনেও গতকাল ওই নিউজের বিপুল সাড়া পড়ে পাঠকদের মধ্যে। বিশেষ করে চার বর্ণের সচিত্র দিকনির্দেশনা অনেকের মনোযোগ কাড়ে।

এদিকে দিনে ঘুমালেও মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। নড়েচড়ে বসেছে চিকিৎসকদের সংগঠনগুলোও। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) আজ ঢাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাবে।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) প্রস্তুতি নিচ্ছে চিকিৎসক দল নামানোর।

দিনেও মশারি টানান : চিকুনগুনিয়া থেকে রক্ষায় এবার দিনের বেলায়ও ঘুমের সময় সবাইকে মশারি টানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত গতকাল রবিবার তাদের সর্বশেষ বুলেটিনে পরামর্শ দিয়ে বলেছে—ঘরের বারান্দা, আঙিনা বা ছাদ পরিষ্কার রাখতে হবে, যেন পানি তিন দিনের বেশি জমে না থাকে। এসি

বা ফ্রিজের নিচেও যেন পানি না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া এই মশা দিনের বেলায়ও কামড়ায়, তাই দিনের বেলায় কেউ ঘুমালে অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। মশা মারার জন্য স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে যেন মশা ডিম পাড়ার সুযোগ না পায়।

বুলেটিনে আরো বলা হয়, চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা। এডিস মশা নিধন না করলে চিকুনগুনিয়া এবং ডেঙ্গু থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আর এ মশা নিধনে ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কারণ এ মশা ঘরেই জন্মায়। মশার মাধ্যমেই রোগটি ছড়িয়ে থাকে। তাই মূল সতর্কতা হিসেবে মশার কামড় থেকে বাঁচার  ব্যবস্থা করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়, তাদের এক জরিপে ঢাকার সব এলাকায়ই চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের ৪৪টি এলাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়।  

‘চিকিৎসকরা মাঠে নামুন’ : প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসকদের অবশ্যই মাঠে নেমে মানুষের মধ্যে চিকুনগুনিয়া চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো উচিত। এই রোগ যে বিপজ্জনক কোনো রোগ নয়, সেটা অন্যরা বললে যতটা গ্রহণযোগ্যতা পায় চিকিৎসকরা বললে তার চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে। বিএমএসহ চিকিৎসকদের অন্য সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে মিডিয়াকে সঙ্গে নিয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিস্থিতি অনেকটাই আমাদের জন্য একটু দুর্যোগের মতো। এ সময় স্বাস্থ্য বিভাগ বা সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এ জন্য অন্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের চিকিৎসকদের সংগঠনগুলোরও আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। তারা যদি চিকিৎসকদের মাধ্যমে মেডিক্যাল টিম মাঠে নামাতে পারে তাহলে কাজ আরো সহজ হয়। ’

চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি নিয়ে তিন মাস ধরে মানুষ অস্থির থাকলেও এ পর্যায়ে এসে টনক নড়েছে দেশের চিকিৎসকদের সর্বজনীন সংগঠন বিএমএর। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওই সংগঠনের নেতাদের অনুরোধ জানানোর এক সপ্তাহ পর গতকাল রবিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে তাদের কিছু কর্মসূচির কথা। অবশ্য তাতে মেডিক্যাল টিম বা চিকিৎসা সম্পর্কে পরামর্শের তেমন কোনো উদ্যোগের তথ্য নেই। বিএমএ বলেছে, আজ সোমবার সকাল ১১টায় রাজধানীর লালবাগ কেল্লার মোড়ে তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাবে। বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও বিএমএ কেন্দ্রীয় নেতারা এতে অংশ নেবেন। এ ছাড়া আগামীকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় বিএমএ ভবনের শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে সায়েন্টিফিক সেমিনার হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এত দিন বিএমএর পক্ষ থেকে আর কোথাও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, এমনকি মেডিক্যাল টিমের ব্যাপারেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংগঠনটি।

সরকার সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাচিপও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের বিনা মূল্যে পরামর্শ দেওয়া এবং সচেতনতার জন্য এলাকায় এলাকায় মেডিক্যাল টিম নামানোর উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাচিপের কেন্দ্রীয় মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মেডিক্যাল টিম নামিয়ে মানুষকে চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি বিনা মূল্যে চিকিৎসা পরামর্শও দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি। এতে মানুষ অনেক বেশি আশ্বস্ত ও উপকৃত হবে বলে আমরা মনে করছি। ’

‘রোগীর তথ্য জানান’ : আইইডিসিআর আরেক বার্তায় বলেছে, বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা করছে বলে দাবি করা হচ্ছে বিভিন্ন পর্যায় থেকে। এসব পরীক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত  করতে হবে এবং চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে রোগীর তথ্য নিবন্ধনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে যা বলা হয়েছে তা অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে পজিটিভ হয়েছে এমন রক্তের নমুনা এবং রোগীর নাম, বয়স, লিঙ্গ, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর পরীক্ষার রিপোর্টের অনুলিপি জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে বলা হয়েছে। আইইডিসিআর সূত্র জানায়,  চিকুনগুনিয়া নিয়ে তারা আগামী ১৯ জুলাই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ২০ জুলাই গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য পৃথক কর্মশালার আয়োজন করেছে।

এদিকে গত শনিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এক সন্বনয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে সভায় চিকুনগুনিয়া পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সদস্য কলামিস্ট  সৈয়দ  আবুল  মকসুদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা, আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা, এমআইএসের  পরিচালক ডা. আশীষ কুমার সাহাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত হয়।


মন্তব্য