kalerkantho


তিন পক্ষের ৫২ দালালের কাছে রোগীরা জিম্মি

ফখরে আলম, যশোর   

১৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



তিন পক্ষের ৫২ দালালের কাছে রোগীরা জিম্মি

জরুরি বিভাগের সামনে কয়েকজন পুলিশ সদস্য বসে গল্প করছেন। বিভাগের ভেতরে ঢুকে দেখা গেল দুই তরুণ স্ট্রেচারের ওপর বসে মোবাইল ফোন হাতে রোগীদের গতিবিধি লক্ষ করছে। একজনের নাম মাসুম, আরেকজন বিপ্লব; দুজনই দালাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাসুম এক রোগীকে নিয়ে চলে গেল। হুইলচেয়ারে বসা এক রোগীকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার সময় সাংবাদিকের উপস্থিতির কথা জেনে হুইলচেয়ার ছেড়ে দিল বিপ্লব। গতকাল রবিবার সকালে যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দালালদের এমন তত্পরতা চোখে পড়ল।

জরুরি বিভাগ থেকে বাইরে এসে বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানোর  একটু পরই দেখা গেল হাতকাটা এক যুবক একজন রোগীর হাত ধরে টানাটানি করছে। কারণ জিজ্ঞেস করায় নিজের নাম অনু জানিয়ে সে বলল, ‘আমি ওই লোককে (রোগী) ডাক্তারের রুম চিনিয়ে দিচ্ছিলাম। এতে দোষের কী?’ পরে জানা গেল যুবকটির প্রকৃত নাম আসাদ, সে হাসপাতালের একজন নামকরা দালাল।

সকাল ১০টার দিকে হাসপাতালের গেটের পাশে নলকূপ থেকে পানীয় জল নেওয়ার সময় কথা হয় বিলকিস খাতুনের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি যশোর সদর উপজেলার গোপালপুর গেট এলাকায়। কোলের শিশুটিকে দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘ওর নাম তামিম, বয়স দুই বছর। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। সকালেই হাসপাতালে ভর্তি করেছি। ডাক্তার

মাহফুজুর রহমান বলেছেন, তাঁর ও তাঁর স্বামীর রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। ডাক্তার দুটি প্যাথলজি সেন্টারের নামও বলে দিয়েছেন। কুইন্স কিংবা ল্যাবস্ক্যানে রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন। স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছি। আসলে পরীক্ষার জন্য যাব। ’

১২টার দিকে দেখা যায় বহির্বিভাগের সামনে রুবেল নামের এক দালাল এক দম্পতি আর তাদের ছোট শিশুকে নিয়ে হাসপাতালের কাগজ হাতে হন করে ছুটছে। রুবেল বলল, ‘এরা আমার আত্মীয়। শিশুটির প্রসাবের সমস্যা, পরীক্ষার জন্য সামনের ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছি। হাসপাতালের ডাক্তার হোসনে আরা বাইরের ক্লিনিক থেকে এই পরীক্ষা করতে বলেছে। ’ শিশুটির বাবা হীরা জানালেন, তাদের বাড়ি ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে। রুবেল আত্মীয় পরিচয় দিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছে।

পরে ডাক্তার হোসনে আরার সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, ‘আমি এমন কথা বলেছি কি না মনে নেই। প্রসাব এই হাসপাতালেও পরীক্ষা করাতে পারে। ’

সজীব নামের আরেক দালাল এক রোগীর হাত ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় কথা হয় তার সঙ্গে। সজীব বলল, ‘এ আমার ভাই হয়। ’ একটু পরেই দেখা গেল বহির্বিভাগের সামনে থেকে আরেকজন রোগীর হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে মনি নামের এক দালাল। গেটের কাছে আরো দুজন দালাল দাঁড়িয়ে ছিল। একজন লিটন, আরেকজন রাসেল। তবে লিটন বলল, ‘আমি দালালি করি না, হারাম খাই না। ’ রাসেল বলল, ‘আমার বাবা মানুষের সেবা করেছে। আমিও সেবা করে বেড়াই। ’

অনুসন্ধানে জানা যায়, তিন ধরনের ৫২ জন দালাল এ হাসপাতালের রোগীদের জিম্মি করে রেখেছে। তাদের মধ্যে রুবেল, মনি, হাসু, মুন্না, সলেমান, মারুফ, লুঙ্গি সিরাজ, হাসান, সেলিম ও জুয়েল অন্যতম। ফার্মেসির দালাল, ক্লিনিকের দালাল ও ডাক্তারদের দালাল—এই তিন চক্র অভিনব সব কৌশলে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফার্মেসির দালালরা জরুরি বিভাগের সামনে অবস্থান করে। হাসপাতালে রোগী এলেই তাদের তত্পরতা বেড়ে যায়। রোগীর বিছানাপত্র নিয়ে ওয়ার্ডে যায়। এরপর সেবিকারা ওষুধের নাম লিখে দিলে নিজেরা স্লিপ নিয়ে ওষুধ নিয়ে আসে। ওষুধের কোনো দাম চায় না। পরে রোগী ছাড়পত্র নিয়ে হাসপাতাল থেকে পা বাড়ালেই এই দালালরা ওষুধের চারগুণ বেশি দাম আদায় করে। হাসপাতালের সামনে ও আশপাশে ১৫০টি ওষুধের দোকান রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি বাদে সব দোকানেই বেতনভুক্ত তিন-চারজন করে দালাল রয়েছে। এই দালালরা বেতনের পাশাপাশি ১০ শতাংশ কমিশন পায়।

ক্লিনিকের দালালরা সার্জারি বিভাগ, মেডিসিন বিভাগ ও বহির্বিভাগের সামনে ঘোরাফেরা করে। তারা ফুসলিয়ে রোগীদের বিভিন্ন ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা  করে। তাদের সঙ্গে হাসপাতালের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও কর্মচারীর সুসম্পর্ক রয়েছে। তারা ক্লিনিক মালিকদের কাছ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন পায়। হাসপাতালের আশপাশের ২৬টি ক্লিনিকের মধ্যে বেশির ভাগ ক্লিনিকেরই দালাল রয়েছে।

হাসপাতালের সর্বত্র ডাক্তারদের দালালদের পদচারণে রয়েছে। কয়েকজন ডাক্তারের ড্রাইভার, আয়া, ওয়ার্ডবয়, সুইপার ডাক্তারদের পক্ষে নানা গুণগান করে রোগীদের হাসপাতাল থেকে ভাগিয়ে নিয়ে যায়। জানা যায়, হাসপাতালে কর্মরত বেশির ভাগ চিকিৎসকের ক্লিনিক রয়েছে। এই চিকিৎসকরা ক্লিনিকের স্বার্থেই দালাল পুষছে বলে অনেকেই অভিযোগ করেছে।    

হাসপাতালে সার্বক্ষণিক পাঁচজন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। গতকাল দুপুরে কথা হয় নায়েক রাশেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা মাঝেমধ্যে দালালদের ধাওয়া দিই। ডাক্তার সাহেবরা বললে আটক করি। ’

যোগাযোগ করা হলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এ কে এম কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দালালের তত্পরতা আগের চেয়ে কমেছে। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। আমরা দালাল উৎখাতের জন্য পুলিশের কাছে দালালদের তালিকা দিয়েছি। প্রাইভেট নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের চেষ্টা করছি। টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটি আমাদের ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিতে চেয়েছে। এই স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করলে দালালের দৌরাত্ম্য কমবে। ’


মন্তব্য