kalerkantho


সর্বোচ্চ আদালতে থমকে আছে মামলার বিচার

১৮টি আপিল বিচারাধীন

এম বদি-উজ-জামান   

১৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



সর্বোচ্চ আদালতে থমকে আছে মামলার বিচার

একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে দেওয়া সাজার বিরুদ্ধে করা ১৮টি আপিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন। দীর্ঘদিন ধরে এগুলো শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এ অবস্থায় এসব মামলার বিচার থমকে আছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর নেতা মীর কাশেম আলীর রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর নতুন কোনো আপিল শুনানির জন্য কার্যতালিকাভুক্ত হয়নি। যদিও জামায়াতের আরেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর করা রিভিউ আবেদন গত ১৫ মে খারিজ করেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এরপর গত দুই মাসে আর কোনো মামলা তালিকায় আসেনি।

আপিল বিভাগে বিচারাধীন আপিলের বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। আন্তর্জাতিকভাবেই বিচার হচ্ছে। আমাদের দেশেও বিচার চলছে। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এ পর্যন্ত যতগুলো রায় হয়েছে তার কয়েকটি কার্যকর হয়েছে। আপিল বিভাগে কিছু বিচারাধীন রয়েছে।

’ এসব মামলার বিচার আপিল বিভাগে থমকে রয়েছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগে অপরাপর মামলার বিচার চলছে। তবে যুদ্ধাপরাধের মামলার বিচার থমকে আছে বলতেই পারেন। আশা করি শিগগিরই অন্যান্য আপিলের বিচার শুরু হবে। কারণ আইনেই বলা আছে তাড়াতাড়ি বিচার নিষ্পত্তি করার কথা। ’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে বিচারাধীন আপিলগুলোর মধ্যে রয়েছে—পাবনার মাওলানা আবদুস সুবহান (মৃত্যুদণ্ড), যশোরের সাখাওয়াত হোসেন ও মো. বিল্লাল হোসেন বিশ্বাস (মৃত্যুদণ্ড), হবিগঞ্জের সৈয়দ মো. কায়সার (মৃত্যুদণ্ড) ও মহিবুর রহমান বড় মিয়া (মৃত্যুদণ্ড), রংপুরের এ টি এম আজহারুল ইসলাম (মৃত্যুদণ্ড), পিরোজপুরের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার (আমৃত্যু কারাদণ্ড), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মো. মোবারক হোসেন (মৃত্যুদণ্ড), চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাহিদুর রহমান (আমৃত্যু কারাদণ্ড), পটুয়াখালীর ফোরকান মল্লিক (মৃত্যুদণ্ড), বাগেরহাটের শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার ও খান আকরাম হোসেন (মৃত্যুদণ্ড), নেত্রকোনার আতাউর রহমান ও ওবায়দুল হক তাহের (মৃত্যুদণ্ড), কিশোরগঞ্জের অ্যাডভোকেট সামসুদ্দিন আহম্মেদ ও মোসলেম প্রধান (মৃত্যুদণ্ড), জামালপুরের মো. সামসুল হক ওরফে বদরভাই ও এস এম ইউসুফ আলী (আমৃত্যু কারাদণ্ড)। তাঁদের মধ্যে শুধু ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের সাজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছে। অন্যদের ক্ষেত্রে আসামিরাই আপিল করেছেন। এই সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে একমাত্র ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার পলাতক। অন্যরা কারাগারে।

একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য সরকার ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। এই ট্রাইব্যুনালে সর্বপ্রথম জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার শুরু হয়। এর পর থেকে এ পর্যন্ত ২৮টি মামলায় রায় দেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে সর্বপ্রথম সাঈদীর মামলায় বিচার শুরু হলেও রায় হয়েছে ফরিদপুরের মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। কিন্তু তিনি পলাতক। ফলে তিনি আর আপিল করেননি। এরপর রায় দেওয়া হয় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায়। ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছরের ৩ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষ ও ৪ মার্চ কাদের মোল্লা পৃথক আপিল করেন। এরপর একে একে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল হতে থাকে। সর্বশেষ গত মে মাসে কিশোরগঞ্জের মো. মোসলেম প্রধান আপিল করেন। এর আগ পর্যন্ত মোট ২৭টি মামলায় আপিল হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে সাতটির। দুটি মামলায় আসামির (জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম ও জয়পুরহাটের সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীম) কারাগারে মৃত্যু হওয়ায় তাঁদের আপিলের ওপর আর শুনানি হয়নি। ফলে এখন বিচারাধীন রয়েছে ১৮টি।

যে সাতটি আপিলের নিষ্পত্তি হয়েছে সেগুলো হলো—জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাশেম আলী, দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। তাঁদের মধ্যে সাঈদী ছাড়া অন্যদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর সাঈদীর করা আপিলের ওপর শুনানি শেষে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ তাঁর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। এর বিরুদ্ধে সে সময় সাঈদী ও রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক রিভিউ আবেদন করলেও প্রায় তিন বছর পর গত ১৫ মে রিভিউ আবেদন খারিজ করে রায় দেন আপিল বিভাগ।

এখন যে ১৮টি মামলায় আপিল বিচারাধীন রয়েছে এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোবারক হোসেন আপিল করেন ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। এর পর থেকে করা সব আপিল বিচারাধীন।


মন্তব্য