kalerkantho


ঈদ বাজার

অটুট বেনারসির কদর

নওশাদ জামিল   

২০ জুন, ২০১৭ ০০:০০



অটুট বেনারসির কদর

মিরপুর বেনারসিপল্লীতে পছন্দের কাপড় দেখছে ক্রেতারা। ছবি : শুভ্র কান্তি দাস

রাজধানীর অন্যতম যানজটপ্রবণ এলাকা মিরপুর। রাস্তার খোঁড়াখুঁড়িতে তা যেন এবার নতুন মাত্রা পেয়েছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বর্ষার তুমুল ধারাপাত। সব মিলে গোটা এলাকায় মানুষের সীমাহীন ভোগান্তি আর বিড়ম্বনা। দীর্ঘ যানজট পেরিয়ে, বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের কাছাকাছি আসতেই শোনা গেল হাঁকডাক—‘এই বেনারসিপল্লী, এই বেনারসিপল্লী। ’ রিকশাওয়ালার এই হাঁকডাকই বলে দিচ্ছে, কাছেপিঠেই রয়েছে বেনারসিপল্লী। হাঁটা দূরত্বের পথ হলেও কেউ রিকশায় চেপে, আবার কেউ নামিদামি গাড়ি হাঁকিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছে বেনারসিপল্লীর দিকে। উদ্দেশ্য একটাই, ঈদ উপলক্ষে বাছাই করে মনের মতো শাড়ি কেনা।

যানজটের ধকল সামলে দুপুরের দিকে বেনারসিপল্লীতে পৌঁছতেই দেখা গেল অন্য রকম দৃশ্য। গোটা বেনারসিপল্লী ঝলমল করছে। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে সারি সারি দোকান।

প্রতিটি দোকানেই জমকালো সাজসজ্জা। ঈদ সামনে রেখে পবিত্র রমজানের শুরু থেকেই বাহারি সাজে সেজে ক্রেতার অপেক্ষায় গোটা বেনারসিপল্লী। মিরপুরের বিশাল এলাকাজুড়ে এমন নজরকাড়া দৃশ্য।

জানা যায়, বেনারসি নামটি বিদেশি। তবে সময় পরিক্রমায় তা পরিণত হয়েছে দেশজ ঐতিহ্যে। অসাধারণ নিখুঁত বুনন, সুতা ও কারুকাজের অনন্যতায় বরাবরই নারীদের পছন্দের শীর্ষে বেনারসি শাড়ি। বাঙালি নারীর ঈদের কেনাকাটার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গও এটি।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অনেক দোকানে প্রদর্শন করা হচ্ছে নতুন নতুন ডিজাইনের বাহারি শাড়ি। দোকানে দোকানে তরুণী-রমণীরা শাড়ি দেখছেন, দরদাম করছেন। শাহিনা ফ্যাশনের ম্যানেজার মোসলেম হোসেন বলেন, ‘মিরপুরে যানজটের ধকল সামলে অনেকেই আসতে চান না বেনারসি শাড়ি কিনতে। ফলে এবার ক্রেতা তুলনামূলক কম। তবে আশা করছি বিক্রি বাড়বে। ’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেনারসিপল্লীর বিভিন্ন দোকানে ভারতীয় শাড়ি থাকলেও বেনারসি শাড়ির চাহিদাই বেশি। একাধিক দোকানি জানালেন, নানা রঙের বেনারসি হয়। তবে লালই মুখ্য। এর বাইরে মেরুন, গাঢ় নীল, সাদা, সবুজ অন্যতম। নকশায়, জরিতে, পুঁতিতে বাহার আছে বেনারসির। সুতা ও সিল্কের তারতম্য আছে প্রতিটি শাড়িতে।

মিরপুরের বেনারসিপল্লীতে মিলবে নানা ধরনের শাড়ি। কাটতি জুট নেট, জুট সিল্ক, জুট কাতান, মসলিন, টিস্যু শাড়ি, কসমস সিল্ক, কাতান, জর্জেট, কাতান সিল্ক, বটি কাতান, লেহেঙ্গা, বিয়ের শাড়ি ইত্যাদি। এগুলো বেনারসি কাতান নামেও পরিচিত। অবশ্য সবই সিল্কে তৈরি। পল্লীতে যত শাড়ি তত নাম। একেকটি নাম মানে আলাদা নকশা আর কাজে সুতার মুনশিয়ানা। ফুলকলি কাতান, দুলহান কাতান, মিরপুরি রেশমি কাতান, মিলেনিয়াম কাতান, বেনারসি কসমস, রিমঝিম কাতান, প্রিন্স কাতান, টিস্যু কাতান, মিরপুরি গিনি গোল্ড কাতান, জর্জেট গিনি গোল্ড কাতান, চুনরি কাতান, অপেরা, ফিগা, ধুপিয়ান বেনারসি, জুট কাতান, খাদি ও মসলিন বেনারসি, মিরপুর জামদানি, নেট কাতান, নেট কোটা, চুন্দরি কাতান, দুলহান, আলপি কাতান, মসলিন কাতান, ধারকন, লগন, কুমকুম, কাঞ্জিভরম—কত শত বাহারি নাম।

বেনারসিপল্লীর ঐতিহ্যবাহী শোরুমগুলোর মধ্যে রয়েছে মনেরেখ, শাহিনা ফ্যাশন, তানহা, আলহামদ, লীলাবালি, সিল্ক সম্ভার, মিরপুর বেনারসি কুটির, বেনারসি মিউজিয়াম, বিয়েরবাজার, পাবনা এম্পোরিয়াম, ব্রাইডাল, মাহমুদা শাড়ি, টপটেন, গোল্ডেন বেনারসি ইত্যাদি।

পুরান ঢাকার চকবাজার থেকে আসা আরিফা খাতুন বললেন, ‘ঈদের দুদিন পরই আমার ছোট বোনের বিয়ে। বিয়ে-শাদির শাড়ি কেনার জন্যই এখানে এসেছি। পাশাপাশি ঈদের জন্যও শাড়ি কিনব এখান থেকে। কারণ এখানে অরিজিনাল শাড়ি পাওয়া যায়। ’

বেনারসিপল্লীতে মানভেদে শাড়ির দামে রয়েছে ভিন্নতা। তবে দরদাম ও যাচাই-বাছাই করে কেনাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। মিরপুর কাতান শাড়ি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০০ থেকে ১১ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়া জামদানি শাড়ি দুই হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার, বেনারসি শাড়ি দুই হাজার থেকে ৩৫ হাজার, হাজি সিল্ক এক হাজার থেকে তিন হাজার, মসলিন শাড়ি তিন হাজার থেকে সাত হাজার, জুট কাতান তিন হাজার থেকে সাত হাজার এবং মাল্টি জুট পাঁচ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

সাভার থেকে শাড়ি কিনতে এসেছিলেন গৃহিণী আনজুম সুলতানা। বললেন, ‘শাড়ি কেনার জন্য আদর্শ মার্কেট এটি। ছেলের নতুন বউয়ের জন্য শাড়ি কিনেছি। নিজের জন্যও কিনেছি। বাহারি কারুকাজের শাড়ির জন্যই মূলত বেনারসিপল্লীতে ঈদের শপিং করতে আসি। ’

তানহা বেনারসির প্রপ্রাইটর জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, ‘আমাদের মূল ব্যবসাটাই হলো ঈদের কেনাকাটা। এবার বিক্রি খুব ভালো নয়। রাস্তার অবস্থা ভালো নয়। ফলে ক্রেতার আগাগোনা কম। তবে আশা করছি, এখন থেকে চাঁদরাত পর্যন্ত বিক্রি বাড়বে। ’

 


মন্তব্য