kalerkantho


‘ধুঁকে ধুঁকে মরা ছাড়া উপায় কী’

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২০ জুন, ২০১৭ ০০:০০



‘ধুঁকে ধুঁকে মরা ছাড়া উপায় কী’

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ। গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় নিচতলায় হাজারো মানুষের ভিড়।

হাতে টিকিট নিয়ে রোগ অনুযায়ী তারা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ বারান্দার এক কোণে চোখ পড়তেই দেখা গেল গ্রিল ধরে ছলছল চোখে বাইরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন গাইবান্ধা থেকে আসা ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী মমিনুল ইসলাম। ততক্ষণে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বেরিয়েছেন। কাছে গিয়ে সমস্যা জানতে চাইলে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘সব কিছুই ঠিক আছে। তয় হাসপাতালে থেরাপি দেওয়ার মেশিন বোলে (নাকি) নষ্ট। উনি (চিকিৎসক) কইচে বাইরোত থেরাপি দেওয়া নাগবে। ’

মমিনুলের আক্ষেপ, ‘এত্ত বড় হাসপাতাল। তয় হামার গরিব মাইনসের চিকিৎসা এ্যাটে নাই। সামত্ত (সামর্থ্য) নাই যে বেসরকারি ক্লিনিকোত থেরাপি দেমো। ধুঁকে ধুঁকে মরা ছাড়া উপায় কী!’

শুধু মমিনুলই নন, এমন অনেক গরিব রোগী দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের থেরাপি দেওয়ার মেশিনটি বিকল হয়ে পড়ে থাকায় ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে পারছে না। এ ছাড়া হাসপাতালে চারটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এক হাজার শয্যার রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন দুই হাজার রোগী অবস্থান করে। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসে প্রতিদিন এক হাজারেরও বেশি রোগী। কিন্তু হাসপাতালের ক্যান্সার রোগীদের থেরাপি দেওয়ার একমাত্র মেশিনটি প্রায় দুই বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এ ছাড়া হাসপাতালের পাঁচটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে চারটিই বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে একটি মাত্র মেশিন দিয়ে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হচ্ছে। এটিও দুই যুগের বেশি সময়ের পুরনো হওয়ায় রোগ নির্ণয়ে ভালো ফলাফল পাওয়া যায় না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বহুবার অবগত করা হয়েছে। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের থেরাপি দেওয়ার একমাত্র মেশিন হচ্ছে কোবাল্ট-৬৬ (টেলিথেরাপি)। যা দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট অবস্থায় পড়ে থাকলেও মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই কর্তৃপক্ষের। এতে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের রেডিওথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। উপরন্তু বেসরকারি পর্যায়ে বিভাগীয় এই নগরের কোথাও ব্যয়বহুল রেডিওথেরাপি চিকিৎসা নেই।

হাসপাতালে নতুন টেলিথেরাপি মেশিন স্থাপনের কথা থাকলেও কবে নাগাদ তা স্থাপন করা হবে সে বিষয়ে নিশ্চিত করে জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

সূত্র আরো জানায়, হাসপতালের কোবাল্ট-৬৬ মেশিনটি ২০১৫ সালের মার্চ মাসে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মাত্র দুজন ক্যান্সার চিকিৎসকনির্ভর ১৬ শয্যাবিশিষ্ট অনকোলজি বিভাগ চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ক্যান্সার রোগীদের থেরাপি দেওয়ার একমাত্র মেশিনটি নষ্ট হওয়ায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে।

জানা যায়, সরকারিভাবে দেশের ৯টি হাসপাতালে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এগুলো হলো সিলেট, ঢাকা, রংপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও মহাখালী ক্যান্সার ইনস্টিটিউট। পাশাপাশি বেসরকারিভাবে ছয়টি হাসপাতালে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

হাসপাতালের অনকোলোজি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে রংপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঁচটি কোবাল্ট-৬৬ মেশিন স্থাপন করা হয়। তিন বছর পর ২০০০ সালের ২৩ জুলাই দেশের আনবিক কমিশন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের থেরাপি মেশিনটি রোগীদের চিকিৎসাসেবায় ব্যবহারের অনুমতি দেয়। চীনের তৈরি এই মেশিনগুলো সরবরাহ ও রক্ষাণাবেক্ষণ করার জন্য ঢাকার ‘মার্ডেল এজেন্সি’ সরকারের কাছে অনুমতি পায়। এই কোবাল্ট মেশিন চীন থেকে আনা হলেও ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য যে ‘সোর্স’ (যা উৎস থেকে তেজস্ক্রিয় রশ্মির বিকিরণ ঘটে) তা আমদানি করা হয় রাশিয়া থেকে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর এই সোর্স পরিবর্তন করার নিয়ম রয়েছে। কারণ এর কার্যকারিতা পাঁচ বছর পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। এরপর তা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

সূত্রটি আরো জানায়, কোবাল্ট মেশিনটিতে সর্বশেষ সোর্স স্থাপন করা হয় ২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু পাঁচ বছর পর ২০০৯ সালে নতুন করে সোর্স স্থাপনের কথা থাকলেও তা আর করা হয়নি। তবু ক্যান্সার রোগীদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ‘কোবাল্ট-৬৬’ মেশিনটি দিয়ে চিকিৎসকরা ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা বা রেডিওথেরাপি দিয়ে আসছিলেন।

রংপুরের তারাগঞ্জ থেকে আসা আবু সালেহ মিয়ার সঙ্গে কথা হয় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অনকোলোজি বিভাগের সামনে। তিনি জানান, ২৫ থেকে ৩০টি থেরাপি দিতে হবে বলে চিকিৎসকরা তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের চিকিত্সিক জাহান আফরোজ লাকী জানান, সরকারি হাসপাতালে একজন রোগীর রেডিওথেরাপি নিতে প্রতি ধাপে খরচ হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা। সেখানে বেসরকারি হাসপাতালে খরচ হয় দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীকে রোগের ধরন অনুযায়ী ২৫ থেকে ৩০ দিন রেডিওথেরাপি নিতে হয় বলেও জানান তিনি।

অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. স্বপন কুমার নাথ জানান, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কোবাল্ট মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট রয়েছে। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে ক্যান্সার রোগীদের। তিনি বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন এবং পুরনো মিলে ৭০ থেকে ৮০ জন ক্যান্সার রোগীকে রেডিওথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো। একজন রোগীর রেডিওথেরাপির কোর্স শেষ করতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেখানে খরচ পড়ে সাড়ে চার হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা, সেখানে বেসরকারি হাসপাতালে খরচ পড়ে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।

অন্যদিকে হাসপাতালের পাঁচটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে চারটিই বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে।

রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালটি এক হাজার শয্যার হলেও প্রতিদিন রোগী থাকছে দেড় থেকে দুই হাজার। প্রতিদিন এত রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। শুধু আলট্রাসনোগ্রাম করাতে আসে দৈনিক গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন। কিন্তু ২৬ বছর আগের পুরনো একটিমাত্র আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন দিয়ে ২০ জনের বেশি রোগীর পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। একজন রোগীকে কমপক্ষে তিন দিন ঘুরে তারপর সিরিয়াল পেতে হচ্ছে।

রোগীরা জানায়, হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাম করানোর জন্য প্রকারভেদে ১১০ টাকা থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া হয়। এই একই পরীক্ষা হাসপাতালের বাইরে বিভিন্ন ক্লিনিক ও বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে সাড়ে ৬০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। টাকার অভাবে তাদের পক্ষে বাইরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই দুর্ভোগ হলেও অপেক্ষা করে এই হাসপাতালেই আলট্রাসনোগ্রাম করাচ্ছে তারা।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের প্রধান ডা. নাজমুন নাহার বলেন, বর্তমানে একটিমাত্র যে পুরনো আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন চালু রয়েছে, রোগীর পরীক্ষায় এর ইমেজ বা ফলাফল ভালো আসে না। ফলে অনেক সময় রোগ নির্ণয়ে ব্যাঘাত ঘটছে। বিষয়টি হাসপাতালের পরিচালককে জানানো হয়েছে।

জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ডা. মউদুদ হোসেন বলেন, ‘ক্যান্সার রোগীদের থেরাপি দেওয়ার একমাত্র কোবাল্ট-৬৬ মেশিনটি দীর্ঘদিন অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। আমি নতুন এসেছি। মেশিনটি মেরামতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বেশ কয়েকবার চিঠিও দেওয়া হয়েছে বলে জেনেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। ’ কবে নাগাদ মেশিনটি ঠিক হবে তাও জানাতে পারেননি তিনি।

পরিচালক আরো বলেন, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনগুলো মেরামতের জন্য ঢাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে কয়েকবার। তিনি আশা করছেন, খুব দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।

 


মন্তব্য