kalerkantho


সংক্রামক ব্যাধি বিভাগ নিজেই সংক্রমিত

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৯ জুন, ২০১৭ ০০:০০



সংক্রামক ব্যাধি বিভাগ নিজেই সংক্রমিত

ছবি: কালের কণ্ঠ

গতকাল রবিবার দুপুর ১২টা। কাদা পানি মাড়িয়ে অনেক কষ্টে ঢুকতে হলো সংক্রামক ব্যাধি ইউনিটে। আর একটু ভেতরে এগোতেই চোখে পড়ল দরজা-জানালা ভাঙা, পরিত্যক্ত ভবনে চিকিৎসা নিচ্ছে সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীরা। একটি মাত্র কক্ষে অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন সাতটি শয্যার মধ্যে চারটিতে আছে নারী-পুরুষ মিলে চার রোগী। প্রায় অন্ধকার ঘর। কক্ষটিতে কোনো সিলিং ফ্যান নেই। চারদিকে ঘুরে দেখা যায়, ইউনিটটিতে রোগীদের ব্যবহারের জন্য দুটি টয়লেট থাকলেও একটিরও দরজা নেই। পানিরও ব্যবস্থা নেই ঠিকমতো। মাছি উড়ছে ভনভন করে।

এ চিত্র রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক ব্যাধি বিভাগের, যা মূল হাসপাতাল থেকে চার কিলোমিটার দূরে নগরের সিটি বাজার এলাকায় অবস্থিত। পুরাতন রংপুর সদর হাসপাতালের জরাজীর্ণ ভবনে এমন দুর্গন্ধময় পরিবেশে কলেরা, ডায়রিয়াসহ সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা নিতে হয়।

অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের একটি ইউনিট হলেও কর্তৃপক্ষ সংক্রামক ব্যাধি বিভাগের তেমন খোঁজখবর রাখে না। শুধু শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের প্রতিদিন দায়িত্ব বণ্টন করে দিয়ে দায় সারেন তাঁরা। তদারকি না থাকায় দায়িত্বপ্রাপ্তরাও ঠিকমতো তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন না। পরিণতিতে এখানে ভর্তি হলেও রোগীরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরাতন রংপুর সদর হাসপাতাল ভবনে সংক্রামক ব্যাধি বিভাগে মানুষ থাকার কোনো পরিবেশ নেই। গতকাল দুপুরে কাদা পানি মাড়িয়ে হাসপাতাল ভবনে

ঢুকতে হাতের বাঁ দিকে পাওয়া গেল দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের কক্ষ, যা ছিল তালাবদ্ধ। ডানদিকে সেবিকাদের কক্ষে বসা ছিলেন সেবিকা নার্গিস বেগম ও একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। সেবিকা বললেন, ‘স্যার আজ আসেননি। ’

চিকিৎসকদের দায়িত্ব বণ্টন সূচি অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার কথা রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ডা. ফয়সাল আরেফিনের। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি গিয়েছিলাম। তবে ওই সময় (দুপুর ১২টা) হয়তো বাইরে কোথাও ছিলাম। ’

ভেতরে এগিয়ে রোগীদের কক্ষ পাওয়া গেল, যেখানে চারজন রোগী চিকিৎসাধীন। তাঁদের স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। তবে চিকিৎসকের কোনো ব্যবস্থাপত্র বা ওষুধ দেখা গেল না।

রোগীরা অভিযোগ করে, ঘর থেকে বেরিয়ে টয়লেটে যেতে হয়। টয়লেটগুলোও ব্যবহারের অনুপযোগী।

গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা এলাকার আনিছার রহমান গতকালই ভর্তি হন সংক্রামক ব্যাধি বিভাগে। সারা দিনে কোনো চিকিৎসক আসেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। আনিছার বলেন, ‘সমানে মোর হাগা (পায়খানা) আর বমি হওচে। ভাঙা পায়খানাত (টয়লেট) যাইতে যাইতে কয়দফা কাপড়চোপড় নষ্ট হইল বাহে। খালি স্যালাইন দেওচে। দুপুর পর্যন্ত কোনো ডাক্তারের দেখা পাইনো না। ’

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার শিবু এলাকার আকবর আলী (৪৫) জানান, সকাল ৯টার দিকে অটোরিকশায় এসে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে তাঁকে সিটি বাজার এলাকার এ সংক্রামক ব্যাধি বিভাগে পাঠানো হয়। বিকেল ৩টা পর্যন্ত কোনো চিকিৎসক তাঁকে দেখেননি।

কর্মচারীরা তাঁর হাতে স্যালাইন পুশ করেছে উল্লেখ করে আকবর আলী বলেন, ‘আগে জানলে এখানে আসতাম না। ’

তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী এলাকার কাজলী বেগম (৬৫) আক্ষেপ করে জানান, গুরুতর অসুস্থ হলেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা না দিয়ে তাঁকে যেতে বলা হয় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁকে এ সংক্রামক ব্যাধি বিভাগে আসতে হয়। সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত আট কিলোমিটার পথ আসা-যাওয়ায় তিনি কাহিল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু তখনো স্যালাইন ছাড়া ওষুধ কিংবা চিকিৎসকের দেখা পাননি তিনি।

কর্মরত সেবিকা নার্গিস বেগম জানান, গতকাল দুপুর ২টা থেকে দায়িত্বে থাকার কথা ছিল আইএমও (গাইনি) ডা. শামীমা আক্তার শিমুর। কিন্তু তিনি আসেননি। এ ব্যাপারে জানতে মোবাইল ফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি ওটিতে (অপারেশন থিয়েটার) আছি, পরে কথা বলেন। ’

সংক্রামক ব্যাধি ইউনিটটির এ দুরবস্থার বিষয়ে কথা হয় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মউদুদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি সেখানে রোগীদের দুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করেন।

ডা. মউদুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুইপার কলোনি ঘেরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি বিভাগ। দূর থেকে গিয়ে ওই বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন। আর যাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয় এ সুযোগটিই তাঁরা গ্রহণ করেন। বিভাগটি মূল হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত হলে সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সহজ হতো। ’

হাসপাতালের পরিচালক আরো বলেন, এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া পুরাতন সদর হাসপাতালের জায়গায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল করার সুপারিশ করা হয়েছে।

 


মন্তব্য