kalerkantho


‘হাইব্রিড’ নেতায় জিম্মি আ. লীগ

হায়দার আলী   

২০ মে, ২০১৭ ০০:০০



‘হাইব্রিড’ নেতায় জিম্মি আ. লীগ

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জনপ্রিয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মরহুম শামসুল ইসলাম। বাবার পথ ধরে শামসুল ইসলামের আট ছেলের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় হামলা-মামলার শিকার হয়েছিল পরিবারটি। সেই ইসলাম চেয়ারম্যানের পরিবারটিই এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে উপেক্ষিত। দলীয় কোনো কর্মসূচিতে তাদের ডাক পড়ে না।

কামরাঙ্গীরচরে কিছু নব্য ‘আওয়ামী লীগারের’ কাছে অপমান-অপদস্ত হয়ে এই পরিবারের মতো অনেক ত্যাগী নেতা দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ রকমই উপেক্ষিত আছেন থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আ র ম আফজাল হোসেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ১৭টি মামলাসহ নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ২০০৯ সালে দল ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস পর থেকে তাঁকে উপেক্ষা করা শুরু হয়। এমনকি সর্বশেষ থানা কমিটির সম্মেলনে তাঁকে দাওয়াতও করা হয়নি। ত্যাগী এই নেতাকে বর্তমান প্রস্তাবিত কমিটির কোনো পদেই রাখা হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, কামরাঙ্গীরচর থানা আওয়ামী লীগ হাইব্রিড নেতাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হোসেন সরকার, সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান মাদবর হলেও পুরো থানা এলাকার দলীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও থানা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন ও তাঁর অনুসারীরা। মোহাম্মদ হোসেনের সঙ্গে আছেন ছাত্রলীগের আহ্বায়ক পারভেজ হোসেন বিপ্লব, থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আলী হোসেন আলীসহ অর্ধশতাধিক হাইব্রিড নেতাকর্মী।

উপেক্ষিত ত্যাগী নেতা আ র ম আফজাল হোসেন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের জন্মটাই হয়েছে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে রাজপথে থেকে কাজ করার জন্য। বিএনপির আমলে মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলাম। কিন্তু দল ক্ষমতায় আসার পর আমরা উপেক্ষিত। ’

তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘শুধু আমিই নই; কামরাঙ্গীরচর থানা আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ ত্যাগী নেতাই এখন কোণঠাসা। দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, অনেকেই দলকে এবং নেত্রীকে ভালোবাসি বলেই নিজে নিজেই কর্মকাণ্ডে অংশ নিই। ’

সরেজমিন এবং কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু আফজাল হোসেন আর মরহুম শামসুল ইসলামের সন্তানরাই নন; কামরাঙ্গীরচর থানা আওয়ামী লীগের অধিকাংশ ত্যাগী নেতাকর্মীই কোণঠাসা হয়ে আছে। বিভিন্ন সময় দলের প্রবীণ নেতাদের লাঞ্ছনা এবং নির্যাতনের শিকারও হতে হয়েছে ‘হাইব্রিডদের’ কাছে। থানা ও ওয়ার্ডের প্রস্তাবিত কমিটিতে সুবিধাবাদীদের নাম থাকলেও ত্যাগী অনেক নেতাকেই রাখা হয়নি।

সরেজমিনে জানা গেছে, থানা মহিলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শেফালী বেগম। দলীয় ছোট-বড় সব কর্মকাণ্ডেই ছিলেন সক্রিয়। তৎকালীন বিএনপি জোট সরকারের সময় তিনি ও তাঁর স্বামী এবং তিন ভাই হামলা-মামলার শিকার হন। মামলা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের চালাতে গিয়ে নিজের ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করে দেন তিনি।

এমন ত্যাগী নেত্রীকে ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে কাউন্সিলর পদে দলীয় মনোনয়ন না দিয়ে দেওয়া হয় থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হোসেন সরকারের স্ত্রী শিউলি হোসেন সরকারকে। অথচ স্বামীর দলীয় পরিচয় ছাড়া শিউলি নিজে কোনো দলীয় কর্মকাণ্ডে ছিলেন না, পদেও নেই। সেই থেকে হতাশ হয়ে পড়েন শেফালী ও দলীয় নেতাকর্মীরা। আর থানা পর্যায়ের নেতারাও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শেফালী বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের এখন খোঁজ নেয় না কেউ, দলের কর্মসূচিতেও ডাকে না। কিন্তু আমাদের নেত্রীর কারণে নীরবে কাজ করে যাব। ’

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সভাপতি মো. ইউনুস, থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী পলাশও কোণঠাসা অবস্থায় দল থেকে দূরে আছেন। এ ছাড়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুল হামিদ, সহসভাপতি হাজি আবদুর রহিম, সাংগঠনিক সম্পাদক নূর মোহাম্মদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মনির হোসেন ওরফে জাপানি মনির, ফেরদৌস মোল্লাসহ অর্ধশতাধিক নেতা কোণঠাসা অবস্থায় আছেন।

কোণঠাসা একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, একজন ছাত্রনেতা থেকে সরাসরি থানা আওয়ামী লীগের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক পদ পেয়ে যান। অথচ যাঁরা ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে দলের রাজনীতি করছেন তাঁরা দলে কোনো পদ পান না। শুধু দলীয় পদের ক্ষেত্রেই নয়, নির্বাচনের সময় মনোনয়নেও এমনটা দেখা যায়।

সম্প্রতি থানার ভেতরেই ছাত্রলীগের আহ্বায়ক পারভেজ হোসেন বিপ্লব ও তাঁর ক্যাডারদের নির্যাতনের শিকার হওয়া আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও প্রবীণ নেতা আনোয়ার হোসেনের কথা উল্লেখ করেন তাঁরা।

থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘৩৫ বছর ধরে রাজনীতি করি, কিন্তু দলের কোনো কাজে এখন ডাকে না। যারা দলের জন্য কোনো সময় ভূমিকা রাখেনি সেই তাদের হাতেই আমাকে লাঞ্ছিত এবং মারধরের শিকার হতে হয়েছে। দলের কর্মসূচিতে মঞ্চজুড়ে থাকে হাইব্রিড নেতারা। ’

আনোয়ার হোসেন জানান, বিরোধী দলে থাকতে থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফেরদৌস মোল্লাকে পিটিয়ে মৃত ভেবে ফেলে যায় বিএনপি ক্যাডাররা। সেই ত্যাগী নেতা ফেরদৌস মোল্লাকে এখন আর দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে দেখা যায় না। কিছুদিন আগে ছাত্রলীগ নেতা পারভেজ হোসেন বিপ্লব ও তাঁর ক্যাডাররা ফেরদৌস মোল্লার বাড়িঘর ও দলীয় ক্লাব ভাঙচুর করে।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও থানা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমরা মাঠে থেকে দলীয় কর্মসূচি পালন করছি। এখন কেউ যদি এসব কর্মসূচিতে না এসে অন্যদের দোষ দেয় তা তো ঠিক না। ’


মন্তব্য