kalerkantho


প্রদর্শনী

হাজার বছরের প্রত্ননিদর্শন

নওশাদ জামিল   

২০ মে, ২০১৭ ০০:০০



হাজার বছরের প্রত্ননিদর্শন

পুরাকীর্তি নিয়ে জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সুবিশাল মিলনায়তনে ঢুকতেই হাতের বাম পাশে দেখা গেল ‘গজলক্ষ্মী’ নামের একটি প্রাচীন মূর্তি।   আনুমানিক দশম শতাব্দীতে এটি নির্মিত। বেলেপাথরের মূর্তিটি অত্যন্ত কারুকার্যময় এবং অনন্য তার নান্দনিক সৌন্দর্যে। বগুড়ার মথুরা থেকে এটি সংগ্রহ করা হয়। শুধু গজলক্ষ্মী নয়, প্রাচীন মহাস্থানগড় ও বগুড়ার আশপাশ থেকে সংগ্রহ করা হয় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু করে পঞ্চদশ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নানা প্রত্মসামগ্রী। মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা খননের ফলে নানা মূল্যবান নিদর্শন উদ্ধার হয়, সেসব সংরক্ষণ করা হচ্ছে জাতীয় জাদুঘরসহ দেশের কয়েকটি জাদুঘরে। জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত মহাস্থানগড়ের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো নিয়ে নলিনীকান্ত ভট্টশালী মিলনায়তনে শুরু হয়েছে বিশেষ প্রদর্শনী।

গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি শিল্পী হাশেম খান, জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী প্রমুখ।

আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে এ প্রদর্শনীর। তাতে রয়েছে মহাস্থানগড়ের হাজার বছর আগের ১৭০টি পুরাকীর্তি। মহাস্থানের বাসুবিহার ও ময়নামতির আনন্দবিহার এবং ভবদেববিহারের পোড়ামাটির ফলকে দৈনন্দিন জীবন, মানুষ, প্রকৃতি, জীবজন্তু, পদ্মফুল, মুক্তামালা মুখে রাজহংস, প্রাচীন মূর্তিসহ নানা নিদর্শন রাখা হয়েছে এ প্রদর্শনীতে।

জানা যায়, প্রাচীনকালে মহাস্থানগড় ছিল সুরক্ষিত দুর্গনগরী। নগরীর পূর্ব ও উত্তর পাশে করতোয়া নদী, পশ্চিমে কালীদহ সাগরখ্যাত জলাশয় আর পশ্চিম-দক্ষিণে বারনসি খাল ছিল। পুন্ড্রনগর নামে অভিহিত সেই জনপদটি তৃতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে মৌর্য, সুঙ্গ, গুপ্ত, পাল, সেন প্রভৃতি বৌদ্ধ ও হিন্দু রাজবংশের রাজত্বের রাজধানী ও শাসনকেন্দ্র ছিল। খননের মাধ্যমে এ এলাকায় পাওয়া যায় নানা প্রত্নসামগ্রী। তার বহু নিদর্শন রয়েছে জাদুঘরে। সেখান থেকে নির্বাচিত ১৭০টি নিদর্শন নিয়ে এ প্রদর্শনী। এ ছাড়া বগুড়া এলাকা থেকে প্রাপ্ত মুঘল ও সুলতানি শাসনামলের নানা নিদর্শনও রয়েছে।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখা যায়, থরে থরে সাজানো কালো চকচকে মৃত্পাত্রের টুকরো, পোড়ামাটির কারুকার্যখচিত ফলক, প্রাচীন স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, গুপ্ত আমলের পোড়ামাটির ফলক, বাসুবিহার থেকে প্রাপ্ত পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শতকের পোড়ামাটির ফলক, অষ্টম ও নবম খ্রিস্টাব্দের মূল্যবান পাথরের বটিকা, বেলেপাথরের বুদ্ধমূর্তি, বেলেপাথরের নকশাকৃত পিলার, পোড়ামাটির পাত্র, নবম ও দশম খ্রিস্টাব্দের বিষ্ণুমূর্তি, অবলিকেতেশ্বর মূর্তি, দত্তাত্রেয় মূর্তি, দশম ও একাদশ খ্রিস্টাব্দের বিষ্ণুমূর্তি, সূর্যমূর্তি, লক্ষ্মী-কার্তিকসহ বিভিন্ন মূর্তি, দ্বাদশ থেকে ত্রয়োদশ খ্রিস্টাব্দের সংস্কৃত ভাষার শিলালিপি, অলংকৃত ইটসহ নানা প্রত্ননিদর্শন।

প্রদর্শনীর কিউরেটর ড. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘মহাস্থানগড়ে পালযুগের বিহার ও মন্দিরের ধ্বংসাবশেষে বহু প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে। সেখানে বৌদ্ধ সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল বলে ধারণা করা হয়। মুসলিম শাসনামলেও মহাস্থানের গুরুত্ব হারায়নি। মহাস্থান মাজার ও মুঘল যুগে মসজিদ নির্মাণ থেকে ওই স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। এই প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ক্ষেত্রে দুর্গনগরীর ধ্বংসাবশেষ এখনো দেশ-বিদেশের পর্যটকদের মধ্যে বিস্ময় সৃষ্টি করে। ’

জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী জানান, মহাস্থানগড় এলাকায় প্রথম খননকাজ পরিচালিত হয় ১৯২৮-২৯ সালে তৎকালীন ভারতের জরিপ বিভাগের আওতায়। প্রথম পর্যায়ে বৈরাগীর ভিটা, গোবিন্দ ভিটা ও মুনির ঘোন নামে তিনটি ঢিবি এবং পূর্ব প্রাচীরের কিছু অংশে খনন করা হয়। এরপর ষাটের দশকে কিছু অংশ এবং ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে খননকাজ চলে। পরে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ-ফ্রান্স সরকারের যৌথ চুক্তির আওতায় প্রতিবছরই মহাস্থান ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পরিচালনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রাচীন এ প্রত্নস্থল থেকে সংগৃহীত এবং জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন ধরনের পোড়ামাটির ফলক, ভাস্কর্য, পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত কালোপাথর ও ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য, প্রাচীন মুদ্রা নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে এ প্রদর্শনী।


মন্তব্য