kalerkantho


আগের সেই ভোগান্তি নেই আছে কিছু বিড়ম্বনা

সিলেট অফিস   

২০ মে, ২০১৭ ০০:০০



আগের সেই ভোগান্তি নেই আছে কিছু বিড়ম্বনা

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানির চিরাচরিত দৃশ্য এখন অনেকটাই উধাও। বিদেশ থেকে যারা আসছে তারা অনেকটা ঝামেলা ছাড়াই ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সেরে বেরিয়ে যেতে পারছে। তবে যাওয়ার সময় ব্যাগেজ নিয়ে যাত্রীদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি সিন্ডিকেট নানা অজুহাতে যাত্রীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। অন্যদিকে অর্থের বিনিময়ে বাড়তি ওজনের ব্যাগেজ গ্রহণ করায় সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি বিমান চলাচলও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সরজমিনে ঘুরে এবং যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

লন্ডন থেকে সরাসরি সিলেটে আসা বিমানের বিজি ০০২ ফ্লাইট গতকাল সকাল ৯টা ২০ মিনিটে ওসমানী বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দুই বছর পর দেশে আসা যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মাহবুবুর রহমান মাহবুব বললেন, ‘কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই এবার বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছি। আগে যে রকম পদে পদে বিড়ম্বনা ছিল এখন আর সে রকম নেই। বেরোনোর পথে লাগেজ নিয়েও কেউ টানাটানি করেনি। পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে।

এবার একটা ভালোলাগা কাজ করছে। ’

মাহবুবের কথার মতো একই সুর লন্ডনপ্রবাসী নগরের উপশহরের শাহিন মিয়া ও জাকির হোসেন জোয়ারদারের কথায়ও। একই ফ্লাইটে এসেছেন ওসমানীনগর উপজেলার মহিউদ্দিন আহমদ। যুক্তরাজ্যে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় জড়িত মহিউদ্দিন বললেন, আগের সেই ঝক্কি-ঝামেলা এখন আর নেই। তবে ইমিগ্রেশন-প্রক্রিয়ায় কিছুটা ধীরগতি আছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছর নভেম্বর মাস থেকে সরাসরি ঢাকা থেকে পুলিশের বিশেষ শাখা ওসমানী বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি যাত্রীসেবার লক্ষ্যে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া গত জানুয়ারি মাসে বিমানবন্দরে প্রথমবারের মতো যাত্রীদের জন্য সেবা সার্ভিস উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। স্থানীয় সিপার এয়ার সার্ভিসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘সিপার মিট গ্রিট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট সার্ভিস’ এই সেবা চালু করে। এর পর থেকেই যাত্রীসেবার মান অনেকটা উন্নত হয়েছে। ইমিগ্রেশনে ভোগান্তি, লাগেজ নিয়ে টানাটানি এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের চিরচেনা দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। তবে বিমানবন্দরের বাইরে যাত্রীদের কাছে আনসার সদস্যদের ‘হাত পাতার’ দৃশ্য বিমানবন্দর এলাকায় এখন দৃষ্টিকটু ঠেকে।

গতকাল সকালে বিমান অবতরণের কিছুক্ষণ পর একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে যুক্তরাজ্য থেকে আসা যাত্রীরা। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর দেশে ফিরেছেন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মো. জয়নাল উদ্দিন। তিনি বললেন, ‘দীর্ঘদিন পর আসায় বিমানের পরিবর্তনটা আলাদা করে বলতে পারব না। তবে পত্রিকা ও দেশে ঘুরে যাওয়া পরিচিতদের মুখে দুর্ভোগের যেসব বর্ণনা শুনেছি সে রকম কিছুর মুখোমুখি হতে হয়নি। ’

ওসমানী বিমানবন্দর ঘুরে দেখা গেছে, যাত্রীরা ট্রলিতে করে নিজেদের মালপত্র বহন করে নির্বিঘ্নে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারছে। বিমানবন্দর ভবন থেকে গাড়ি পার্কিং পর্যন্ত তাদের সঙ্গে থাকেন আনসার বাহিনীর সদস্যরা। তাঁরা যাত্রীদের ট্রলিতে টানাটানি না করলেও গাড়িতে মালপত্র তোলার সময় সহযোগিতা করার চেষ্টায় থাকেন। মালপত্র তোলা শেষ হলে তাঁরা যাত্রীদের কাছে বকশিশের জন্য হাত পাতেন। কোনো কোনো যাত্রী বকশিশ দিলেও সবাই দেয় না। দুই-তিনবার চাওয়ার পর ব্যর্থ হলে তাঁরা তখন আবার ছোটেন মূল গেট দিয়ে বেরিয়ে আসা অন্য যাত্রী লক্ষ্য করে। এই কাজে তেমন একটা রাখঢাকের বালাই নেই তাঁদের।

তবে এ বিষয়ে মুখ খুলতে চায়নি কেউই। যাত্রীদের অনেকেই এ বিষয়ে অভিযোগ করলেও তারা নাম প্রকাশ করতে চায়নি। একজন যাত্রী বলেন, ‘বিষয়টি বিব্রতকর। একজন ভিক্ষুক হাত পাতলে আপনি দশ-বিশ টাকা দিয়ে দিতে পারেন অথবা চাইলে আরেকটু বেশি। কিন্তু সরকারি একটি বাহিনীর সদস্য এভাবে বকশিশ চাইলে বিষয়টি আমাদের কাছে অস্বস্তিকর লাগে। ’

বিমানবন্দর ভবনের কাছেই গাড়ি পার্কিং। সেখানে এক মাইক্রোবাসের চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, ‘আগে দালালদের দৌরাত্ম্য ছিল, এখন তাদের জায়গা নিয়েছে আনসাররা। তারা লাগেজ ধরে টানাটানি না করলেও যাত্রীদের কাছে বকশিশ চেয়ে হাত পাতে। আবার কোনো যাত্রীর ভাড়া গাড়ি লাগলে সেখানেও তারা কমিশন খেয়ে গাড়ি ঠিক করে দেয়। জোরাজুরি না করায় বিষয়টি আলাদা করে চোখে পড়ে না, তবে কিছুক্ষণ খেয়াল করলে যে কেউ বিষয়টি দেখতে পারবে। ’

বিকেল সাড়ে ৩টায় জেদ্দা থেকে সরাসরি সিলেট আসে বিমানের একটি ফ্লাইট। এই ফ্লাইটের যাত্রীদেরও কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হতে দেখা যায়নি। ইমিগ্রেশন পার হয়ে নিচতলায় নিজেদের লাগেজের সন্ধানে যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। নিজের লাগেজ পেয়ে গ্রিন চ্যানেল দিয়ে বের হন বালাগঞ্জের বাসিন্দা রহমত আলী। অবশ্য বের হওয়ার আগে স্ক্যানিং মেশিনে তাঁর ল্যাগেজ দিতে হয়। ভেতরে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না জানতে চাইলে কোনো ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়নি বলে তিনি জানান।

বিমানবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার সাজ্জাদ হোসেন বলেন, স্ক্যানিং ছাড়া কোনো লাগেজই ভেতরে বা বাইরে নিয়ে যেতে দেওয়া হয় না।

বিদেশফেরত যাত্রীদের ভোগান্তির মধ্যে পড়তে না হলেও যাওয়ার সময় ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। বিশেষ করে যারা যুক্তরাজ্যে যায় তাদের এ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। যুক্তরাজ্যপ্রবাসীরা যাওয়ার সময় আত্মীয়স্বজনের জন্য অনেক কিছু নিয়ে যায়। একজন যাত্রী ৪০ কেজি ওজনের লাগেজ এবং হাতে করে সাত কেজি ওজনের ব্যাগ নিতে পারে। কিন্তু অনেকেরই লাগেজে অতিরিক্ত সামগ্রী থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিমানের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী উেকাচ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত ওজনের জন্য কেজিপ্রতি আলাদা মাসুল দিতে হয়। কিন্তু এই সিন্ডিকেট দালালদের মাধ্যমে নির্ধারিত মাসুলের অর্ধেক আদায় করে সরকারি কোষাগারে নামমাত্র মাসুল জমা দিয়ে সব কিছু পার করে দিচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজন না হলেও বাড়তি সামগ্রী থাকার দাবি করে যাত্রীদের কাছ থেকে উেকাচ আদায় করা হচ্ছে।

এ ধরনের ঘটনা প্রায় প্রতিদিন ঘটছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে লন্ডনগামী ফ্লাইট ভোরে হওয়ায় অনেকটা নিভৃতেই চলছে এই উেকাচ বাণিজ্য। অবশ্য সম্প্রতি একজন যাত্রী এ ধরনের ঘটনায় বিমানের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। গত ১৯ জানুয়ারি ওসমানী বিমানবন্দরে এ ধরনের হয়রানির শিকার হন নগরের চৌকিদেখী ২০৩/৬ ইসলাম মঞ্জিলের বাসিন্দা লন্ডনপ্রবাসী আফিকুল ইসলাম, শফিক মিয়া ও তাঁর স্ত্রী আছিয়া খাতুন। তাঁদের তিনটি লাগেজে অতিরিক্ত ওজন এবং অবৈধ মালপত্র থাকার ভয় দেখিয়ে বিমানের লাগেজ সুপারভাইজার আব্দুল আজিজ ৭২ হাজার ৬০০ টাকা হাতিয়ে নেন। অথচ তাঁদের দুই হাজার ৪০০ টাকা আদায়ের রসিদ দেওয়া হয়। যাত্রীদের আত্মীয় এবং সিলেট ল কলেজের অধ্যক্ষ অ্যাডভোকেট সৈয়দ মহসিন আহমদ এ ঘটনায় সিলেট মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি মামলা করেছেন।

তবে লাগেজ নিয়ে যাত্রী হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করেন বিমানের স্টেশন ম্যানেজার মোল্লা জিল্লুুর রহমান। তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তাঁদের কাছে নেই। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ওসমানী বিমানবন্দরের কনকোর্স হলে এখন যাত্রীদের আত্মীয়স্বজনকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। একসময় টিকিট করে কনকোর্স হলে ঢোকা গেলেও এখন তা সম্পূর্ণ বন্ধ। বিদেশগামী যাত্রীদের বিমানবন্দরের বাইরেই বিদায় বা অভ্যর্থনা জানাতে হয় স্বজনদের। এতে করে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রীদের সঙ্গে আসা লোকজনকে।

ওসমানী বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক মো. মশিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা ছাড়া বিমানবন্দরে তেমন সমস্যা নেই। বিমানবন্দরে আগে যাত্রী হয়রানির যে অভিযোগ পাওয়া যেত এখন নেই। সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থাও এখন অনেক উন্নত। বাইরে আনসার সদস্যদের বকশিশ আদায়ের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ আমরাও মাঝেমধ্যে পেয়ে থাকি এবং তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিই। ’ বিষয়টি তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বলেও জানান।  

ওসমানী বিমানবন্দর নামে আন্তর্জাতিক হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে এটি গড়ে ওঠেনি। লন্ডন থেকে প্রতি সপ্তাহে চারটি ফ্লাইট সরাসরি সিলেট এলেও সিলেট থেকে কোনো ফ্লাইট সরাসরি লন্ডন যায় না। এ ছাড়া প্রতি সপ্তাহে জেদ্দা থেকে দুটি ফ্লাইট, আবুধাবি থেকে দুটি, দুবাই থেকে কখনো দুটি আবার কখনো একটি এবং দোহা থেকে একটি ফ্লাইট সরাসরি সিলেট আসে। তবে এখান থেকে সরাসরি এসব গন্তব্যে বিমানের কোনো ফ্লাইট যায় না। শুধু গত মাসে চালু হওয়া ফ্লাই দুবাইয়ের প্রতিদিন একটি করে সপ্তাহে ছয়টি ফ্লাইট সরাসরি সিলেট আসে এবং সিলেট থেকে দুবাই যায়।

বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে সম্প্রতি একনেকে ৪৫২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে জানিয়ে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ওসমানী বিমানবন্দর সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত হবে। তখন এখান থেকে সরাসরি বিভিন্ন গন্তব্যে বিমান পরিচালনা সম্ভব হবে।


মন্তব্য