kalerkantho


চিকিৎসাধীন ছাত্রীর মৃত্যু হাসপাতাল ভাঙচুর

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



চিকিৎসাধীন ছাত্রীর মৃত্যু হাসপাতাল ভাঙচুর

ভুল চিকিৎসার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে ওই ছাত্রীর মৃত্যু হয়।

মৃত আফিয়া আক্তার প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। এ খবরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে ভাঙচুর চালায়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ডেঙ্গু জ্বর হলেও ভুলে ক্যান্সারের চিকিৎসা দেওয়ার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের ধানমণ্ডি জোনের সহকারী কমিশনার আব্দুল্লাহেল কাফী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, দুপুরের দিকে ওই ছাত্রী চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় মারা যান বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এরপর বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হাসপাতালে ঢুকে ভাঙচুর করে। তবে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ঘটনার পর হাসপাতালে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।   কাফী বলেন, ‘কেউ যদি অভিযোগ এনে মামলা করতে চান, আমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। বর্তমানে হাসপাতাল এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

আফিয়া আক্তার রাজধানীর আজিমপুরে থাকতেন বলে জানিয়েছেন তাঁর বন্ধু মনির। তাঁর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। ঘটনার খবর পেয়ে তাঁর পরিবারের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। তারা এ ভুল চিকিৎসার বিচার চায়।

মনির বলেন, আফিয়াকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করায় ডাক্তাররা বলেছিলেন আফিয়ার লিউকেমিয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ীই তাঁকে চিকিৎসা করা হয়েছে। এরপর চিকিৎসকরা তাঁর ক্যান্সার ও ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেন। আর এই ভুল চিকিৎসার কারণেই আফিয়ার মৃত্যু হয়।

আফিয়া আক্তারের বন্ধু জিহাদ কালের কণ্ঠকে জানান, আফিয়ার জ্বর হয়েছিল। তাঁকে গত বুধবার সকালে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে হাসপাতাল থেকে তাঁকে জানানো হয়, আফিয়ার ব্লাড ক্যান্সারের লাস্ট স্টেপ চলছে। তাঁর রক্তের প্রয়োজন। আফিয়াকে তখন আইসিইউতে নিয়ে যায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর কিছুক্ষণ পর তাঁরা জানান, আফিয়ার  ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। তারপর আফিয়ার মৃত্যু হয়।

আফিয়ার বান্ধবী আয়েশা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভুল চিকিৎসার কারণেই আফিয়ার মৃত্যু হয়েছে। প্রথমে তারা আফিয়ার ব্লাড ক্যান্সারের চিকিৎসা করিয়েছে। তারপর তারা বলে আফিয়ার ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই। ’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সেন্ট্রাল হাসপাতালের পরিচালক আবুল কাশেমের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে ওই হাসপাতালের এক পিএবিএক্স অপারেটর নিজের নাম জানাতে রাজি না হয়ে বলেন, ‘কাশেম স্যারকে পুলিশ থানায় নিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত তিনি ফিরে আসেননি। আমরাও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। এ ছাড়া হাসপাতালে এখন কথা বলার মতো অন্য কোনো কর্মকর্তা উপস্থিত নেই। পুরো হাসপাতাল এলোমেলো অবস্থায় আছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় আছি। ’

ঘটনার পর সেন্ট্রাল হাসপাতালে ফোন করলে টেলিফোন অপারেটর ফাহিম হাসান কালের কণ্ঠকে জানান, এ মুহূর্তে কর্তৃপক্ষের সবাই এ ঘটনা নিয়েই ব্যস্ত আছেন। ব্যস্ত থাকার কারণে এ মুহূর্তে কাউকেই লাইন দেওয়া সম্ভব নয়।

ঘটনার বিষয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে জানান, খুব খারাপ অবস্থা নিয়ে রোগী আগের দিন সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি হয়। রাতে রক্ত পরীক্ষা করলে তাতে ব্লাড ক্যান্সার শনাক্ত হয়। কিন্তু রোগীর চিকিৎসা শুরুর আগেই আইসিইউতে নেওয়ার পর সে মারা যায়। সম্ভবত তার ইন্টারনাল ব্লিডিংও ছিল। তার ডেঙ্গু হয়েছিল কি না—এ প্রশ্ন করা হলে অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা ক্যান্সারের এ রকম অনেক রোগী পাই যাদের প্লাটিলেট খুব কম থাকে। ক্যান্সার হলেও প্লাটিলেট কমে যায়। তাই প্লাটিলেট কম বলে তার ডেঙ্গুই হয়েছে, এটা বলা কঠিন। ’

এ বিষয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে জানান, খুব খারাপ অবস্থা নিয়ে রোগী আগের দিন সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি হন। রাতে রক্ত পরীক্ষা করলে ব্লাড ক্যান্সার শনাক্ত হয়। কিন্তু রোগীর চিকিৎসা শুরুর আগেই আইসিইউতে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। সম্ভবত তাঁর ইন্টারনাল ব্লিডিংও ছিল।

কিন্তু রোগীর ডেঙ্গু হয়েছিল কি না—এ প্রশ্ন করা হলে অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা ক্যান্সারের এ রকম অনেক রোগী পাই যাদের রক্তের প্লাটিলেট খুব কম থাকে। ক্যান্সার হলেও প্লাটিলেট কমে যায়। তাই প্লাটিলেট কম বলে তার ডেঙ্গুই হয়েছে—এটা বলা কঠিন। ’

সেন্ট্রাল হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মতিওর রহমান বলেন, ‘আমাদের ল্যাবে যে রিপোর্ট পাওয়া গেছে তাতে দেখা গেছে, রোগীর অ্যাকুইট মাইলয়েড লিউকেমিয়া (এএমএল) হয়েছে। তার হোয়াইট ব্লাড সেলের (ডাব্লিউবিসি) সংখ্যা ছিল এক লাখ ৩৭ হাজার, যা অনেক বেশি। আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি আমাদের ল্যাবের রিপোর্ট সঠিক। কিন্তু অ্যাকুইট হওয়ায় রোগীর মাল্টি অর্গান ফেল হয়ে তাত্ক্ষণিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে এবং আইসিইউতে নিয়ে অনেক চেষ্টা করেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। সুতরাং ভুল চিকিৎসা হয়েছে—এটা বলা যাবে না। ’

মামলা : ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে হাসপাতালটির ৯ জনকে আসামি করে অভিযোগ দায়ের করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ঢাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আমজাদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সন্ধ্যায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ৯ জন আসামির মধ্যে চিকিৎসক, সেবিকা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রয়েছে। আসামিরা হলেন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ, কাশেম ইউসুফ, ডা. মর্তুজা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ এস এম মাতলুবুর রহমান, ডা. মাসুমা পারভীন, ডা. জাহানারা বেগম মোনা, ডা. মাকসুদ পারভীন ও ডা. তপন কুমার বৈরাগী এবং হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ কাশেম।

মামলার আসামি হাসপাতালের পরিচালক এম এ কাশেম মামলা দায়েরের সময় থানায় উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে আটক দেখানো হবে বলে জানিয়েছেন ধানমণ্ডি থানার ওসি।


মন্তব্য