kalerkantho


৯ মাসে আরো অর্ধশতাধিক জঙ্গির জামিন

আশরাফ-উল-আলম   

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



৯ মাসে আরো অর্ধশতাধিক জঙ্গির জামিন

সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলায় গত ৯ মাসে অর্ধশতাধিক আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছে। গত বছর জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত হিসাব পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, জামিন পাওয়া ওই আসামিরা হয় জঙ্গি তত্পরতায় অর্থ জোগানদাতা, না হয় অস্ত্র সরবরাহকারী; কিংবা সরকার পতনে জঙ্গি তত্পরতায় উৎসাহদাতা বা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্য।

গত বছর ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার আগে সারা দেশে আটক হওয়া প্রায় ৫০০ জঙ্গি জামিনে বেরিয়ে গিয়েছিল বলে ওই সময় কালের কণ্ঠসহ একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর জঙ্গিদের জামিনের হার কিছুটা কমলেও পুরোপুরি থেমে নেই।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ আনিসুর রহমান কালের কণ্ঠের কাছে স্বীকার করেন, সন্ত্রাস দমন আইনে দায়ের করা অনেক মামলায় জঙ্গি তত্পরতায় জড়িত আসামিরও জামিন হচ্ছে। তবে এর সংখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ হিসাব আমাদের কাছে নেই। কারণ চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্তাধীন মামলায় হাইকোর্ট কর্তৃক জামিন দেওয়া আসামিদের জামিননামা দিতে হয়। সেগুলোর খোঁজখবর আমরা রাখি। জজ আদালতের বিচারাধীন আসামিদের জামিননামা দাখিলের তথ্য আমাদের দপ্তরে থাকে না। ’

মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জঙ্গি তত্পরতায় যুক্ত থাকার অভিযোগে সিঙ্গাপুর ফেরত পাঁচ যুবককে গত বছর ২৬ এপ্রিল রাজধানীর রামপুরা থেকে গ্রেপ্তার করেছিলেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সদস্যরা। তারা হলো মো রাহা মিয়া ওরফে পাইলট, মো. মিজানুর রহমান ওরফে গালিব হাসান, আলমগীর হোসেন, তানজিমুল ইসলাম ও মাসুদ রানা ওরফে সরু খান। ওই পাঁচ যুবক দেশে ফিরে জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের নামে সদস্য সংগ্রহ করছিল। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলার তিন আসামি মো. রাহা মিয়া ওরফে পাইলট, তানজিমুল ইসলাম ও মাসুদ রানা ওরফে সেন্টু গত ১৯ মার্চ হাইকোর্ট থেকে জামিন পায়। এর আগে আরেক আসামি শেখ মোহাম্মাদ সেলিমও হাইকোর্ট থেকে জামিন পায় গত ১৬ নভেম্বর। মামলাসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, মামলার আরেক আসামিও জামিনে মুক্তি পেয়েছে। তবে দিনক্ষণ জানাতে পারেনি ওই সূত্র।

এ ছাড়া জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সক্রিয় সদস্য, অর্থদাতা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী মাওলানা মোহাম্মদ নাঈম ওরফে সাইফুল ইসলামকে গত ২৪ জুলাই গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। সন্ত্রাস দমন আইনে বাড্ডা থানায় হওয়া মামলায় এই নাঈম গত ১৫ ডিসেম্বর হাইকোর্ট থেকে জামিন পান। ২১ ডিসেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে জামিননামাও দাখিল করেন তার আইনজীবী।

সন্ত্রাস দমন আইনে তেজগাঁও থানার মামলায় গত আগস্টে গ্রেপ্তার করা হয় আবদুল কাহার মিশকাত, তৌফিকুর রহমান ও মো. আল আমিন নামে তিনজনকে। গত ২৪ ও ৩০ নভেম্বর দুটি আবেদনের ভিত্তিতে এই তিন আসামি জামিন পায় হাইকোর্ট থেকে।

রামপুরা থানায় দায়ের করা সন্ত্রাস দমন আইনের মামলায় গত বছর মে মাসে গ্রেপ্তার হয়েছিল আবুল খায়ের, আনিসুর রহমান ও আতিক হোসেন নামে তিন আসামি। গত ৩০ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে তারা জামিন পায়। একই মামলার আরো দুই আসামি এস এম হাসান মাসুদ ও জিয়াউদ্দিন জামিন পায় গত ১০ নভেম্বর।

উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় গ্রেপ্তার হিযবুত তাহ্রীরের সদস্য মাহমুদ হাসানকেও জামিন দেওয়া হয়েছে গত জানুয়ারিতে। গত বছর ২৮ আগস্ট জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নতুন ধারার সক্রিয় সদস্য ফুয়াদ আল মাহাদীকে মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ১৫ ডিসেম্বর সে জামিন পেয়েছে।

হিযবুত তাহ্রীরের সদস্য আবদুল্লাহ আল মামুন, ইউসুফ নোয়ানী জামিন পায় গত বছর। এ মামলার আরেক আসামি মোস্তাফিজুর রহমান জামিন পায় গত ৪ জানুয়ারি।

ফয়সাল আহমেদ, শেখ সোবহান সাদ ওরফে আবদুল্লাহ ও মিনহাজ আবেদীন নামে তিন জঙ্গিকে রাজধানীর দারুস সালাম এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় গত বছর মার্চে। ফয়সাল গত বছর ২৬ মে জামিন পায়। শেখ সোবহান সাদ জামিন পায় গত ৪ সেপ্টেম্বর। তৃতীয় আসামি মিনহাজ আবেদীন জামিন পায় গত ১০ জানুয়ারি।

জঙ্গি তত্পরতায় যুক্ত থাকার অভিযোগে রাজধানীর শাহ আলী থানা এলাকা থেকে গত ১ জুন গ্রেপ্তার হয় আরিফুল ইসলাম, আবু জাফর ও আবু তালেব। গত আগস্টেই তিন আসামি জামিনে মুক্তি পায়। হিযবুত তাহ্রীরের সক্রিয় সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান মুহিমকে গত ৪ জানুয়ারি, ইউসুফ নুরানীকে গত ১৫ ডিসেম্বর এবং আশফাক হোসেনকে গত ২৭ ডিসেম্বর জামিন দেওয়া হয়েছে।

জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম সমর্থন করে সরকারবিরোধী লিফলেট বিতরণ ও রাখার অপরাধে মো. দেলোয়ার হোসেন ওরফে শ্রাবণ ওরফে রহিমকে গত বছর জুনে রমনা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২৪ অক্টোবর এই আসামি জামিন পায় হাইকোর্ট থেকে। শাহবাগ থানা এলাকায় গ্রেপ্তার জঙ্গি আবুল কায়েসকেও গত ৬ অক্টোবর জামিন দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি হরকাতুল জিহাদের সদস্য আবু উবায়দা হারুন সিলেটের বিশেষ দায়রা জজ আদালতে (জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল) জামিন পায় গত ১১ জানুয়ারি। ২০০১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সিলেটে শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে বোমা পুঁতে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হরকাতুল জিহাদ।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় গ্রেপ্তার ভয়ংকর অপরাধীরা জামিন পেয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মামলার নানা ত্রুটি অন্যতম কারণ বলে মনে করেন আইনজীবীরা। তাঁরা বলছেন, এজাহার, জব্দ তালিকা ও অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) ত্রুটি থাকায় জামিন পেয়ে যায় ওই আসামিরা।

জঙ্গিদের মামলা তদারকি বা তাদের জামিন ঠেকাতে একটি সমন্বয় সেল গঠনে মত দিয়েছিলেন দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে ধরনের কোনো সেল গঠিত হয়নি।

জঙ্গিদের জামিন পেয়ে যাওয়ার ঘটনায় হতাশ হয়ে পুলিশের একজন ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করেন। যাচাই-বাছাই করেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু তারা জামিন পেয়ে আবার একই কাজ করে। জঙ্গি দমনে পুরো সফলতা আসেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার মামলার বিচার, জঙ্গিদের জামিন এসব মনিটর না করলে জঙ্গি নিয়ে ভবিষ্যতে আরো সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

প্রসঙ্গত, প্রতিবেশী দেশ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট গত ফেব্রুয়ারিতে এক রায় দিয়ে বলেছেন, যারা নিরীহ মানুষ খুন করে সেসব জঙ্গির জামিন বা প্যারলে মুক্তি কোনোটিই দেওয়া যাবে না।


মন্তব্য