kalerkantho


এবিটির ছায়াতলে হুজি!

এস এম আজাদ   

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



এবিটির ছায়াতলে হুজি!

নেতৃত্ব সংকটে কোণঠাসা হয়ে পড়া দুটি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন একযোগে কাজ করতে চাইছে। সংগঠন দুটি হলো হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজিবি) ও আনসার আল ইসলাম বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, হুজিবির শীর্ষ নেতা সদ্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মুফতি হান্নান এবং প্রথম সারির নেতারা কারাবন্দি হওয়ার পর পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়ে সংগঠনটি। একইভাবে শীর্ষ নেতা জসিমউদ্দিন রাহমানীসহ বেশ কয়েকজন নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুর্বল হয়ে পড়ে এবিটিও। এবিটি আনসার আল ইসলামে রূপান্তরের পর সংগঠনের অপেক্ষকৃত সক্রিয় জঙ্গিরা হুজিবিকেও নতুন করে সক্রিয় করতে উদ্যোগ নেয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত দুটি সংগঠনের মতাদর্শ একই রকম। বাংলাদেশে হুজিবিকে হুজি নামেই ডাকা হয়।

পুলিশ ও গোয়েন্দাদের দাবি, কারাবন্দি নেতারা একযোগে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন—এমন বার্তা প্রচার করে এক হওয়ার চেষ্টা করে হুজি এবং আনসার আল ইসলামের জঙ্গিরা। একের পর এক ব্লগার-লেখক হত্যার ঘটনায় এবিটি জঙ্গিদের সহায়তা করে হুজি জঙ্গিরা। গত ৬ মার্চ টঙ্গীতে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে হুজি নেতা মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল আনসার আল ইসলামের সদস্যরা। এ ছাড়া ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুসহ কয়েকটি হত্যায় আনসার আল ইসলামের জঙ্গিদের সহায়তা করে হুজির জঙ্গিরা।

দুই সংগঠনের জঙ্গিদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্কও আছে। সূত্র মতে, মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা তিনজনের মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে নিজেদের আনসার আল ইসলামের সদস্য বলে দাবি করে। ‘আমাদের এক নেতাকে ছাড়িয়ে আনতে হবে’—এমন এক নির্দেশনা পেয়ে বোমা নিয়ে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালায় ছদ্মনামের সাতজন। ওই দলের প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন সোহাগ নামের একজন। তিনি নরসিংদীর একটি মাদরাসার শিক্ষক ফোরকান ওরফে ওবায়দুর বলে ধারণা পুলিশের। ওই মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়ে আনসার আল ইসলামে যোগ দেওয়ার তথ্য মিলেছে। তাদের মধ্যে মাহফুজ অন্যতম।

জানা যায়, আনসার আল ইসলামের সঙ্গে মিলে হুজির ফের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা সম্পর্কে তথ্য পেয়ে পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দারা নজরদারি শুরু করেন। সম্প্রতি রাজধানীতে তিন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। গত ৮ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন তাজুল ইসলাম মাহমুদ নামে হুজির এক নেতা।

সিটিটিসি ইউনিটের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হুজি-এবিটি এক হয়ে কাজ করতে চাইছে। কারাগারে জসিমউদ্দিন রাহমানী ও মুফতি হান্নানের দেখা হয়। এরপর কর্মীদের একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আগে তেমন সক্রিয়তা দেখা যায়নি। সম্প্রতি হান্নানকে ছিনতাইচেষ্টাসহ কিছু ঘটনায় বর্তমান এবিটি বা আনসার আল ইসলামের সঙ্গে হুজির যোগ পাওয়া যাচ্ছে। ’ ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘দুটি সংগঠনই আল-কায়েদার মতাদর্শী। হুজি একেবারেই কোণঠাসা। আনসার আল ইসলামও নেতৃত্ব সংকটে। তাদের কর্মকাণ্ড শুধু ব্লগার-লেখক হত্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে তারা বড় কিছু করতে পারবে না। ’

গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শেখ রাসেল কালের কণ্ঠকে বলেন, “মুফতি হান্নানকে ছিনতাইচেষ্টার ঘটনায় তাত্ক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা মোস্তফা কামাল এবং পরে গ্রেপ্তার করা মিনহাজুল ইসলাম সবুজ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তারা নিজেদের আনসার আল ইসলামের সদস্য বলে দাবি করে। ‘আমাদের এক নেতাকে ছাড়িয়ে আনতে হবে’—এমন নির্দেশনা পেয়ে তারা প্রিজন ভ্যানে হামলা চালাতে চায়। দুই মাস আগে হামলার ছক কষে জঙ্গিরা। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা কাকে ছাড়াতে হামলা চালাচ্ছে তা জানত না বলে দাবি জবানবন্দি দেওয়া দুই জঙ্গির। ”

ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘আজিজুল হক নামে গ্রেপ্তারকৃত আরেক জঙ্গির কম্পিউটার জব্দ করা হয়েছে। তাতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি হামলা নিয়ে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। নরসিংদীর একটি মাদরাসাকেন্দ্রিক জঙ্গিরা টঙ্গীর ঘটনায় জড়িত। সেই মাদরাসার শিক্ষক ফোরকান এর সংগঠক বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানকার আরেক শিক্ষক মাহফুজও জঙ্গি দলে আছে বলে ধারণা। ’

সিটিটিসি ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, ২০০০ সালে গোপালগঞ্জে বোমা পুঁতে রাখা, ২০০১ সালে রমনা বটমূলে বোমা হামলা, ২০০৪ সালে সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর বোমা হামলা এবং ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলার পর আর বড় ধরনের নাশকতা চালাতে পারেনি হুজি। শীর্ষনেতা হান্নানসহ তিন জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আরো অনেকে কারাবন্দি। ২০১৩ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যার মাধ্যমে এবিটি তত্পরতা শুরু করে। তারা এখন আনসার আল ইসলাম নামে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। ২০১৪ সাল থেকে হুজির মতাদর্শের কিছু জঙ্গি ব্লগার হত্যাকারী দলটিকে সমর্থন জানিয়ে আসছে। কিছু যোগাযোগ পাওয়া গেছে। তবে হুজির সদস্যসংখ্যা কমে যাওয়ায় তারা তেমনভাবে সক্রিয় হতে পারেনি।

গত ৫ মার্চ আনসার আল ইসলামকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০১৫ সালের ২৫ মে একই রকম প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এবিটি নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। এর আগে ২০০৫ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল হুজিবিকে।


মন্তব্য