kalerkantho


খেলা

দেশসেরা প্রগতির মেয়েরা

ফখরে আলম, যশোর   

২১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দেশসেরা প্রগতির মেয়েরা

ট্রফি হাতে হ্যান্ডবলে দেশসেরা যশোরের প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়েরা। ছবি : ফিরোজ গাজী

দুধ-ডিম তো দূরের কথা, দুই বেলা পেটভরে ভাতই জোটে না। রিকশাচালক, দিনমজুর, নৈশপ্রহরী বাবার সংসারে ওদের জন্ম, বেড়ে ওঠা।

দারিদ্র্য ওদের নিত্যসঙ্গী। গরিবের ঘরের সেই মেয়েরাই আজ দেশসেরা। জাতীয় পর্যায়ে হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ওরা ১০ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। রানার-আপ হয়েছে ৮ বার। বাস্কেটবলেও রানার-আপ হয়ে এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছে।

যশোরের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের প্রগতি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়েরা ধারাবাহিকভাবে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এমন সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে। এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক খেলোয়াড়রা এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলে মাঠ কাঁপাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, এত অর্জন আর গৌরবের ট্রফি জয়ের পরও স্কুলটিতে হ্যান্ডবল খেলার উপযুক্ত মাঠ নেই। অভাব যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতারও।

যশোর শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের জনপদ বালিয়াডাঙ্গায় এই স্কুলের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। প্রতিষ্ঠানটির বেশির ভাগ শিক্ষার্থী গরিব পরিবার থেকে আসা। স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাধাকান্ত বিশ্বাস বলেন, ‘১৯৮৬ সালে হ্যান্ডবলে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে এই স্কুলের শারীরিক শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মো. হাসানুজ্জামান। তিনিই প্রথম মেয়েদের হ্যান্ডবলের প্রশিক্ষণ দিয়ে আন্ত স্কুল ও মাদরাসা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করান। ১৯৯২ সালে জাতীয় পর্যায়ে হ্যান্ডবলে রানার-আপ হয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনে আমাদের মেয়েরা। শুরু হয় সাফল্যের পথে যাত্রা। এরপর ১৯৯৩, ’৯৬, ’৯৭, ’৯৯, ২০০২, ২০০৪, ২০০৫, ২০০৯, ২০১০ ও ২০১৪ সালে আমাদের স্কুল জাতীয় পর্যায়ে হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতায় ১০ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এ ছাড়া ১৯৯২ সাল থেকে এ পর্যন্ত আটবার রানার-আপ হয়েছে। এবার ২০১৭ সালে বাস্কেটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এই প্রথম আমাদের মেয়েরা জাতীয় পর্যায়ে রানার-আপ হয়েছে। ’

সরেজমিন গত রবিবার স্কুল ঘুরে দেখা গেছে, মেয়েরা অসমতল মাঠে হ্যান্ডবল খেলছে। নড়বড়ে গোলপোস্ট। কাঁচা বাঁশ দিয়ে বানানো হয়েছে বাস্কেট বোর্ড। শরীরচর্চা শিক্ষক হাসানুজ্জামান বলেন, ‘হ্যান্ডবলের জন্য মাঠের প্রয়োজন ৪০ মিটার বাই ২০ মিটার। কিন্তু আমাদের এই মাপের মাঠ নেই। মাঠটি সংস্কার করা প্রয়োজন। আমাদের মেয়েরা উপযুক্ত মাঠ না পেলেও সার্বক্ষণিক নিয়মের মধ্যে থেকে যথাযথ অনুশীলন পেয়ে একের পর এক সাফল্য অর্জন করছে। ’

দশম শ্রেণির ছাত্রী পলি খাতুন। সে জাতীয় পর্যায়ে হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতায় চারবার অংশ নিয়েছে। তার বাবা ইউনুস আলী একজন রিকশাচালক। প্রশ্নের জবাবে পলি বলল, ‘না, খেলার মাঠে প্রচুর শ্রম ক্ষয়ের পরও প্রয়োজনীয় পুষ্টির জন্য ডিম-দুধ খাওয়া হয়ে ওঠে না। এমনকি ঠিকমতো ভাতও জোটে না সব সময়। ’

নবম শ্রেণির ছাত্রী তানজিলার বাবা নেই। মা স্থানীয় একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করেন। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা এই কিশোরী তবু স্বপ্নচারী। তার সেই স্বপ্ন কেবলই বিজয়ের ট্রফি ঘিরে। দশম শ্রেণির ছাত্রী শান্তার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান রংমিস্ত্রির কাজ করেন। গরিবের ঘরের এই অদম্য মেধাবী পাঁচবার জাতীয় পর্যায়ে হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে স্কুলকে জিতিয়ে এনেছে। বাবা মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মেয়েটিকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন রয়েছে। ও যখন জেতে তখন মনে হয় আমাদের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামই জিতেছে। তখন আমার সব অভাব আর কষ্ট দূর হয়ে যায়। ’

নবম শ্রেণির ছাত্রী খাদিজার বাবা দিনমজুর। সংসারের সর্বত্র রাক্ষুসে অভাবের চিত্র। কিন্তু দারিদ্র্যের কাছে মাথানত করতে রাজি নয় এই কিশোরী। খাদিজার হাতে খুব শক্তি। এবার প্রগতি স্কুলের ৩৫ স্কোরের মধ্যে সে একাই ২২ স্কোর করেছে। এই ক্রীড়া নেপুণ্যের সুবাদে সে এখন বাংলাদেশ আনসারের হয়ে জাতীয় দলে খেলছে। খাদিজা বলল, ‘অভাবের সব রূপ দেখেছি। শুধু সাহসের জন্য আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ’

স্কুলের টিম ক্যাপ্টেন তাহমিনা। দুই বছর ধরে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে সে। তাহমিনার বাবা একজন ক্ষুদ্র কৃষক। তাহমিনা বলল, ‘খেলার স্যার, হেড স্যারসহ অন্য শিক্ষকরা আমাদের পাশে থেকে উৎসাহ দিয়েছেন। এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে পুরস্কার পেয়ে আমাদের উৎসাহ বেড়ে গেছে। এখন আমরা বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছি। ’

যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবদুল আলিম বলেন, ‘প্রগতি স্কুলের মেয়েরা হ্যান্ডবলে ১০ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এটি আমাদের জন্য খুবই গৌরবের। আমি নিজে ওই স্কুলে গিয়ে ছাত্রীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছি। ওদের পাশে থাকার কথা দিয়েছি। ’


মন্তব্য