kalerkantho


জব্দ করা ডায়েরি ও জেরার তথ্য

এখন জঙ্গিদের টার্গেট ‘জুনুদ’ ও ‘ভাইরাস’

সরোয়ার আলম   

২১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



এখন জঙ্গিদের টার্গেট ‘জুনুদ’ ও ‘ভাইরাস’

সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও কুমিল্লায় আটক জঙ্গিদের কাছ থেকে দুটি ডায়েরি উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলোতে সাংকেতিক পরিভাষা রয়েছে।

প্রতিশোধ নিতে তারা বেপরোয়া তৎপরতা চালাবে বলে তথ্য রয়েছে ডায়েরিতে।

ডায়েরিতে জঙ্গিরা উল্লেখ করেছে, তাদের পরবর্তী টার্গেট জুনুদ। সাংকেতিক এ শব্দের অর্থ পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য। লেখা রয়েছে—ভাইরাসকেও মোকাবেলা করতে হবে। এর অর্থ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য। এমন তথ্য পেয়ে পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তারা আঁতকে উঠেছেন। পুলিশ সদর দপ্তর ডায়েরিগুলো খতিয়ে দেখছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একটি টিম আটক জঙ্গিদের কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। জুনুদ ও ভাইরাসের পাশাপাশি জঙ্গিরা জনাকীর্ণ স্থানকেও টার্গেট করেছে।

এ তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে।

জঙ্গি তৎপরতা বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল রবিবার পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিশেষ বৈঠক করেছেন। র‌্যাব সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বৈঠক করেছেন।

এসব বৈঠকে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আরো সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনো পুলিশ বা র‌্যাব সদস্য ইউনিফর্ম পরে একা চলবেন না; র‌্যাবের সব অফিস ও সব থানার মূল ফটকে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে; দায়িত্ব পালনের সময় গুলিভর্তি অস্ত্র সঙ্গে রাখতে হবে ও লাইফ জ্যাকেট পরতে হবে। এসংক্রান্ত একটি চিঠি গতকাল ৬৪ জেলা পুলিশ সুপারের কাছে পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, জঙ্গি কর্মকাণ্ড পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতিরোধ করা হবেই। তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে।

আইজিপি বলেন, ‘তবে আমরা উদ্বিগ্ন নই। ’ পুলিশ-র‌্যাবের পাশাপাশি জঙ্গি দমনে এগিয়ে আসতে দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

পুলিশ সূত্র জানায়, গত ৭ মার্চ কুমিল্লার চান্দিনা থেকে হাসান ও ইমতিয়াজ এবং ১৭ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের একটি বাসা থেকে রাজিয়া সুলতানা আরজিনা ও জহিরুল ইসলাম জসিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই জঙ্গিদের কাছ থেকে দুটি ছোট ডায়েরি উদ্ধার করা হয়। কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। তারা জঙ্গি কর্মকাণ্ড নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। ডায়েরিতে তারা কিছু সাংকেতিক পরিভাষা ব্যবহার করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, নব্য জেএমবির বর্তমান সমন্বয়ক মুসার মাধ্যমে তারা জেএমবিতে ভিড়েছে। গ্রেনেড বা বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর কৌশল তাদের শেখানো হয়েছে। সাংকেতিক ভাষা সম্পর্কেও তাদের অবহিত করা হয়েছে। মুসার নির্দেশ অনুযায়ী কাদের টার্গেট করা হয়েছে সে তথ্য ডায়েরিতে লিখে রাখা হয়েছে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তারা আরো জানায়, সাংকেতিক পরিভাষায় র‌্যাব ও পুলিশ হলো ‘জুনুদ’। আর গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা হলেন ‘ভাইরাস’। সহযোদ্ধাদের অভিযানে মেরে ফেলা বা গ্রেপ্তার করার কারণে জুনুদ ও ভাইরাসের ওপর আক্রমণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের মেরে নিজে মরতে হবে। এটা করলে তারা বেহেশতে যেতে পারবে। নির্দেশ রয়েছে—জনাকীর্ণ স্থানে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করে জানান দিতে হবে যে জঙ্গিরা মরেনি।

সূত্র জানায়, ডায়েরিতে তথ্য পাওয়া গেছে, জঙ্গিরা যখন আলোচনা বা বৈঠক করে তখন তারা সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে। রাস্তায় চলাফেরা করার সময়ও সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করা হয়। তারা গ্রেপ্তারকে বলে ‘অসুস্থ’, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়াকে বলে ‘রোগমুক্ত’, বোমা বা গ্রেনেডকে বলে ‘মেওয়া’।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিশোধ নিতে বা সক্রিয় থাকার বিষয়ে জানান দিতেই জঙ্গিরা হামলা চালাচ্ছে। তারা আমাদের বেছে নিয়েছে। ’ তিনি জানান, এই পরিপ্রেক্ষিতে পোশাকধারী পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের একলা চলতে নিষেধ করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে সতর্ক করা হয়েছে। বাস-লঞ্চ-ট্রেন, হাট-বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সাদা পোশাকের পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আত্মঘাতী জঙ্গিদের নিয়েই বেশি ভয়। তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টার্গেট করেছে। জনাকীর্ণ স্থানেও হামলা চালানোর চেষ্টা করবে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। ’ তিনি জানান, কমলাপুর রেলস্টেশন, শাহজালাল বিমানবন্দর, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, ঢাকার বাস টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সন্দেহভাজন যাত্রী ও পথচারীদের তল্লাশি করা হচ্ছে।

 


মন্তব্য