kalerkantho


দুটি আইনের খসড়া আজ মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে

ভূমি ব্যবহারের জন্য ছাড়পত্র নিতে হবে

আশরাফুল হক রাজীব   

২০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ভূমি ব্যবহারের জন্য ছাড়পত্র নিতে হবে

জমির অপরিকল্পিত ব্যবহার ঠেকাতে ‘নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন, ২০১৭’-এর খসড়া তৈরি করেছে সরকার। এই আইন কার্যকর ও বাস্তবায়নের জন্য ক্ষমতাধর উপদেষ্টা পরিষদ ও নির্বাহী পরিষদের বিধান রাখা হয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে কোনো জমি ব্যবহার বা উন্নয়নকাজের জন্য ওই উপদেষ্টা পরিষদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে। সম্পূর্ণ নতুন এই আইনের খসড়াটির নীতিগত অনুমোদনের জন্য আজ সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভা বৈঠকে এটি উপস্থাপন করা হতে পারে।

এ ছাড়া আজকের মন্ত্রিসভা বৈঠকের জন্য মন্ত্রীদের কাছে পাঠানো এজেন্ডায় ‘প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড আইন, ২০১৭’, ‘বালাইনাশক আইন, ২০১৭’ ও ‘বস্ত্র আইন, ২০১৭’-এর খসড়া রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরের জন্য দুটি চুক্তির খসড়া অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন : সুষ্ঠু নগরায়ণের লক্ষ্যে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইনের খসড়া করা হয়েছে। এতে ভূমির অপরিকল্পিত ব্যবহার বন্ধ হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। স্থানীয় সরকারগুলো তাদের নিজ নিজ আইনে নিজস্ব এলাকা উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা করে থাকে। কিন্তু মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদন করার কোনো বিধান তাদের নেই। ফলে যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে।

সূত্র জানায়, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন কার্যকর হওয়ার পর তা বাস্তবায়নের জন্য নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী এ পরিষদের চেয়ারম্যান হবেন। ২০টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিব বা সিনিয়র সচিবরা হবেন সদস্য। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা এবং স্থাপত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি, ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টের সভাপতি ও নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক এ পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। উপদেষ্টা পরিষদ বছরে কমপক্ষে দুইবার সভা করবে। পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা এবং ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নীতি ও বিধিবিধানসংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা অন্যতম। সরকারের জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগী হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে এ পরিষদ। সরকারি সংস্থার নেওয়া উন্নয়নকাজ এই আইনের আওতায় প্রণীত পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করাও হবে উপদেষ্টা পরিষদের কাজ। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে উন্নয়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের জন্য সুপারিশ প্রণয়ন করা; সব অধিদপ্তর, সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহারসংক্রান্ত কাজের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া; পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত সব উপাদানের মান নির্ধারণ, পরিকল্পনার বিভিন্ন স্তরবিন্যাস, বিজ্ঞানভিত্তিক ও জন অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা পদ্ধতি নির্ধারণ করা। এসংক্রান্ত গণশুনানির উপায় ও পদ্ধতি নির্ধারণ করবে এ পরিষদ।

এই উপদেষ্টা পরিষদকে সহায়তা দেওয়ার জন্য নির্বাহী পরিষদ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে খসড়া আইনে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বা সচিব নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান হবেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এ পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। তাঁদের সাথে ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স, ইঞ্জিনিয়ার্স ও আর্কিটেক্টের প্রতিনিধি রাখা হয়েছে।

খসড়া আইন অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি, যাদের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা এবং ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত সেসব সংস্থা, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উপদেষ্টা পরিষদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেবে। তবে এ ক্ষেত্রে উপদেষ্টা পরিষদ ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতা দিতে পারবে। উপদেষ্টা পরিষদের কর্মপরিধি নির্ধারণ করে দিয়ে খসড়া আইনে বলা হয়েছে, এ পরিষদ নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা এবং ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন দেবে। তারা ওই ছাড়পত্র দিতে পারবে। প্রচলিত অন্য কোনো আইন বা বিধিতে যাই থাকুক না কেন বিভিন্ন সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ওই উপদেষ্টা পরিষদের সুপারিশ অনুসরণ করবে।

উপদেষ্টা পরিষদ যেকোনো সংস্থাকে তাদের নিজস্ব কার্যক্রমের আওতায় গৃহীত পরিকল্পনা ও ভূমি উন্নয়ন কর্মসূচির পুনঃপর্যালোচনা করার নির্দেশ দিতে পারবে। দেশের সার্বিক উন্নয়নের সমন্বয় ও সামঞ্জস্যের জন্য বিভিন্ন আইন ও নীতিমালার অসামঞ্জস্য আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করতে পারবে। উপদেষ্টা পরিষদ নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরকে সার্বিকভাবে নগর অঞ্চলের পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনা প্রণয়নকারী ও সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার জন্য নিয়োগ করতে পারবে। নতুন কোনো আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো খুলনা, রাজশাহী ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষসহ সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নিজস্ব এলাকার মধ্যে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা এবং ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনা প্রণয়নকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কর্মসূচি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তা দূর করার ব্যবস্থা নেবে পরিষদ। কোনো বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য কোনো ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে মনে করলে তাদের আপত্তি বিবেচনার সুযোগ দেবে এবং এ বিষয়ে গণশুনানি করবে। এই আইনের বাইরে গিয়ে কোনো ভূমির উন্নয়ন করা যাবে না। এই আইনের বাইরে গিয়ে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা ভূমির উন্নয়ন করলে তা বন্ধ করার নির্দেশ দিতে পারবে স্থানীয় সরকার প্রশাসন। এই আইনের আদেশ লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে আইনের খসড়ায়। 

প্রবাসীকল্যাণ বোর্ড আইন : নারী অভিবাসী কর্মীদের কল্যাণের বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে ‘প্রবাসীকল্যাণ বোর্ড আইন, ২০১৭’ নামে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করছে সরকার। নতুন এ আইন কার্যকরের সঙ্গে সঙ্গে ওয়েজ আর্নারস কল্যাণ তহবিল বিধিমালা কার্যকারিতা হারাবে। অভিবাসী কর্মী, তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সুরক্ষা ও নিরপত্তা নিশ্চিত করা এবং কল্যাণের জন্যই এ আইন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এই বোর্ড অভিবাসীদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণার্থে প্রকল্প গ্রহণ ও পরিচালনা করবে; প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের কল্যাণার্থে তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দেবে; বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীদের কল্যাণে কার্যক্রম পরিচালনা ও তত্ত্বাবধান করবে; অভিবাসী মৃত কর্মীর লাশ স্বদেশে ফেরত আনা এবং সৎকারে সহায়তা প্রদান করবে; অসুস্থ, আহত, পঙ্গু, অক্ষম প্রবাসীদের দেশে আনা ও চিকিৎসায় সহায়তা দেবে; বিদেশে মৃত্যুবরণকারীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেবে; প্রবাসীদের মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ, বকেয়া বেতন, ইনস্যুরেন্সের অর্থ ও সার্ভিস বেনিফিট আদায়ে সহায়তা করবে; প্রবাসী কর্মীদের মেধাবী সন্তানদের বৃত্তি প্রদান ও তাদের আইনি সহায়তা দেবে; প্রবাসী কর্মীদের জন্য তথ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা করবে।

এ ছাড়া বিদেশে কর্মরত কোনো নারী অভিবাসী বিপদগ্রস্ত বা দুর্ঘটনার শিকার হলে তাঁকে উদ্ধার করে দেশে ফেরত আনা, চিকিৎসাদান ও আইনি সহায়তা প্রদান করা; দেশে প্রত্যাগত নারী অভিবাসী কর্মীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করা এবং নারী অভিবাসীদের নিরাপত্তার জন্য দেশে কিংবা বিদেশে সেফ হোম প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা হবে প্রবাসীকল্যাণ বোর্ডের কাজ।


মন্তব্য