kalerkantho


র‌্যাবের অস্থায়ী ব্যারাকে বিস্ফোরণ

আত্মঘাতী যুবকের সঙ্গে ছিল আরো ৭-৮ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আত্মঘাতী যুবকের সঙ্গে ছিল আরো ৭-৮ জন

রাজধানীর আশকোনায় হজ ক্যাম্পের পাশে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) প্রস্তাবিত সদর দপ্তরের অস্থায়ী ব্যারাকে বোমা বিস্ফোরণে নিহত ‘আত্মঘাতী জঙ্গি’র পরিচয় জানা যায়নি গতকাল শনিবার রাত পর্যন্ত। এক নারী নিহত যুবককে নিজের ছেলে বলে দাবি করলেও এর প্রমাণ মেলেনি বলে জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা।

তবে জুয়েল রানা নামে নিখোঁজ হওয়া ফরিদপুরের এক যুবকের সঙ্গে নিহত আত্মঘাতীর কিছু মিল পেয়েছেন র‌্যাব-পুলিশের তদন্তকারীরা। পরিচয় যাচাই করতে সেই জুয়েলের স্বজনদের ঢাকায় আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সূত্র। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, নিহত যুবক একা হামলা চালাতে যায়নি। তার সঙ্গে আরো সাত-আটজন ছিল। র‌্যাব সদস্যরা ওই যুবককে চ্যালেঞ্জ করায় সে দ্রুত বিস্ফোরণ ঘটায়। ওই সময় আশপাশে থাকা অন্য জঙ্গিরা পালিয়ে যায়। বিস্ফোরণের ঘটনায় র‌্যাবের করা মামলায় এমনটি দাবি করা হয়েছে। এদিকে গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ‘আত্মঘাতী’ যুবকের মৃত্যু বোমা বিস্ফোরণে হয়েছে। তার একটি কিডনি পাওয়া যায়নি।

গত শুক্রবার বিস্ফোরণের পর আশকোনায় র‌্যাব ক্যাম্পের পাশ থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা এক যুবক র‌্যাবের হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। গত শুক্রবার বিকেলে মারা যাওয়া ওই যুবকের নাম আবু হানিফ মৃধা (৩২)। তার বাড়ি বরগুনার আমড়াগাছিয়া।

র‌্যাবের ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড ফরেনসিক উইংয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) রাশেদুজ্জামান বাদী হয়ে গত শুক্রবার রাতে বিমানবন্দর থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে নিহত ‘জঙ্গি’সহ নাম না জানা আরো সাত-আটজনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ‘আত্মঘাতী আসামি এবং আরো সাত-আটজন পলাতক আসামি ঘটনাস্থলে সশরীরে উপস্থিত হয়ে তাদের পরিচালনাকারী, পরামর্শদানকারী, মদদদাতা এবং নির্দেশদাতাদের বিভিন্ন স্বার্থ হাসিলের জন্য অর্থাৎ শান্তিকামী জনসাধারণের মধ্যে ভয়ভীতি, আশঙ্কা, উদ্বেগ তৈরি করে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপপ্রয়াস চালিয়েছে। ’

র‌্যাব হেফাজতে মৃত্যু : হানিফের মৃত্যুর ব্যাপারে র‌্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান বলেন, শুক্রবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে আশকোনা এলাকা থেকেই ওই যুবককে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করার পরপরই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। র‌্যাব ওই ব্যক্তিকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিছুক্ষণ পরই সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এরপর লাশ ওই হাসপাতালেই ছিল। র‌্যাবের আরেকটি সূত্র জানায়, শুক্রবার র‌্যাব ব্যারাকের কাছে মুনমুন কাবাব রেস্তোরাঁর পেছন থেকে সন্দেহভাজন যুবক হানিফকে আটক করা হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেন, গতকাল সন্ধ্যার আগেই লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে ভিসেরা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এক নারীর দাবি : হামলাকারীকে নিজের ছেলে বলে দাবি করেছেন এক নারী। ওই নারীর নাম আমিরন বিবি। গতকাল সকালে আশকোনায় র‌্যাব ব্যারাকে তিনি দাবি করেন, তাঁর ছেলে রফিক পাঁচ দিন ধরে নিখোঁজ ছিল। পত্রিকায় ছবি দেখে তিনি ছেলেকে চিনতে পেরেছেন। আমিরন বলেন, তাঁদের বাড়ি পিরোজপুরে। তাঁর ছেলে রফিক ঢাকায় চায়ের দোকানে কাজ করত। পাঁচ দিন আগে বাড়ি থেকে বেরোনোর পর তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি।

যোগাযোগ করা হলে র‌্যাবের মিডিয়া অ্যান্ড লিগ্যাল উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘একজন নারী এসেছেন। তিনি নিহত ব্যক্তিকে নিজের ছেলে বলে দাবি করেছেন। আমরা যাচাই-বাছাই করছি। ’ তিনি আরো বলেন, ‘ওই নারী কোথাও নিহত ব্যক্তির ছবি দেখে এখানে এসেছেন। তিনি কোথায় ছবি দেখলেন, আমরা তা জানি না। ’

এদিকে র‌্যাব ও পুলিশের সূত্র জানায়, গতকাল রাত পর্যন্ত নিহত যুবকের পরিচয় শনাক্ত না হলেও একজনের সঙ্গে কিছু মিল পাওয়া গেছে। তদন্তে কয়েক মাস আগে নিখোঁজ হওয়া ফরিদপুরের এক যুবকের সঙ্গে নিহতের কিছু মিল পাওয়া গেছে। এ জন্য সেই জুয়েল রানার স্বজনদের ঢাকায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরিচয় যাচাই করা হবে। এরই মধ্যে তাদের খবর দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র।

হঠাৎ বিস্ফোরণ : বিমানবন্দর থানায় করা মামলার এজাহারে বলা হয়, শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে ল্যান্স করপোরাল মিজান একজন অচেনা লোককে ব্যারাকের উত্তর-পূর্ব পাশের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকতে দেখেন। ওই যুবককে ব্যারাকের গোসলখানার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে চ্যালেঞ্জ করে তার পরিচয় এবং ভেতরে ঢোকার কারণ জানতে চাওয়া হয়। লোকটি তার ডান হাত বুকের ওপর রেখে বোমার বিস্ফোরণ ঘটনায়। এজাহারে বাদী বলেন, ‘তখন আমরা কোনো কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। ’ এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বিস্ফোরণের শব্দে আশকোনা হাজি ক্যাম্পসহ আশপাশের লোকজন গেটে উপস্থিত হয়ে জানায়, বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলের কাছে রাস্তা থেকে তারা সাত-আটজনকে পালিয়ে যেতে দেখে। র‌্যাব সদস্য মিজানুর রহমান আত্মঘাতীকে চ্যালেন্স ও বাধা না দিলে আত্মঘাতী ব্যারাকে বা ডাইনিংয়ে ঢুকে মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ চালাত। এজাহারের শেষ অংশে বাদী উল্লেখ করেন, আত্মঘাতী জঙ্গি বা সন্ত্রাসী কোনো নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় সদস্য বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে।

এত ছিনভিন্ন লাশ আর দেখিনি : গতকাল সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে নিহত যুবকের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। সেখানকার ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ পরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এর আগে অন্য জঙ্গিদের লাশেরও ময়নাতদন্ত করেছি। বিস্ফোরণের ধরনের কিছু মিল আছে। তবে এতটা ছিন্নভিন্ন দেহ এর আগে আর দেখিনি। ’ ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, লাশের পেটের ভেতর বেল্ট ও ইলেকট্রিক তার পাওয়া গেছে। দুই হাত ও পেটে কালো স্কচটেপ পাওয়া যায়। পেটের ওপর বেল্ট দিয়ে বোমা বেঁধে হামলা চালিয়েছিল বলে এমন হয়েছে। তিনি আরো বলেন, লাশের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। হামলার সময় যুবক শক্তিবর্ধক উত্তেজক কিছু সেবন করেছিল কি না তা জানতে রক্তের নমুনাও রাখা হয়েছে। এটি রিমোট কন্ট্রোল বোমা কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার পেটে বেল্ট, তার ও স্কচটেপ পাওয়া গেছে। তাই এটি রিমোট কন্ট্রোল বোমা নয়।

যেভাবে চলছে তদন্ত : র‌্যাব ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ‘আত্মঘাতী জঙ্গি’ হামলার পর থেকেই বিমানবন্দর, আশকোনা ও উত্তরাসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করেছেন র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। হামলাকারী যুবক র‌্যাবের ওই ক্যাম্পে ঢোকার আগে কারো সঙ্গে দেখা করেছিল বা ফোনে কথা বলেছিল কি না—এসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। র‌্যাবের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, তদন্ত চলছে। সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনে যা যা দরকার তার সব কিছু করা হচ্ছে। আত্মঘাতী তরুণ কোনো জঙ্গি দলের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

আলামত : র‌্যাব সূত্র মতে, সুইসাইডাল ভেস্ট থাকায় বোমা বিস্ফোরণের পর যুবকের মরদেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। তবে মরদেহের পাশ থেকে বেশ কয়েকটি আলামত পাওয়া গেছে। মরদেহের পাশে একটি কালো ব্যাগ, কালো-হলুদ-সাদা রঙের একটি ক্যাপ, স্যান্ডেল, গামছা ও কালো কাপড়ের টুকরা পাওয়া গেছে। র‌্যাবের ধারণা, হামলাকারী যুবকের পরনে কালো প্যান্ট ও সাদা চেক শার্ট ছিল। এ ছাড়া মরদেহের পাশ থেকে দুটি অবিস্ফোরিত বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে ওই বোমা দুটি নিষ্ক্রিয় করে র‌্যাবের বোম্ব ডিস্পোজাল ইউনিট।

প্রতিবেদন দিতে হবে ২৫ এপ্রিল : আমাদের আদালত প্রতিবেদক জানান, গতকাল দুপুরে ঢাকা সিএমএম আদালতে আশকোনার ‘আত্মঘাতী হামলা’সংক্রান্ত মামলাটির এফআইআর দাখিল করা হয়। ঢাকা মহানগর হাকিম এ কে এম মঈনুদ্দিন সিদ্দিকী মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৫ এপ্রিল দিন ধার্য করেন। আদালতে কর্মরত সংশ্লিষ্ট থানার জিআর শাখার কর্মকর্তা লিয়াকত হোসেন এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

গত শুক্রবার জুমার নামাজের আগে রাজধানীর আশকোনায় র‌্যাবের ব্যারাকে ঢুকে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় এক যুবক। ওই সময় র‌্যাবের দুই সদস্যও আহত হন।


মন্তব্য