kalerkantho


জোড়া খুন : আটক পীর ও খাদেমের স্বীকারোক্তি

গুরু-শিষ্য মতাদর্শের দ্বন্দ্বে হত্যাকাণ্ড

দিনাজপুর প্রতিনিধি   

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গুরু-শিষ্য মতাদর্শের দ্বন্দ্বে হত্যাকাণ্ড

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জের দৌলা গ্রামে কাদেরিয়া মোহাম্মদিয়া দরবার শরিফের কথিত পীর ফরহাদ হোসেন চৌধুরী ও নারী মুরিদ রূপালী বেগম খুনের দায় স্বীকার করেছেন আরেক পীর। কুড়িগ্রাম থেকে আটক পীর ইছাহাক আলী ও কাদেরিয়া মোহাম্মদিয়া দরবারের খাদেম সাইদুর রহমান গতকাল শুক্রবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

জবানবন্দিতে খুনের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে তাঁরা বলেছেন, তরিকা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে ফরহাদ হোসেনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ইছাহাক আলী ও সাইদুর ছাড়াও স্থানীয় পাঁচজন সহায়তা করেছে।

তারা ইছাহাক আলীর মুরিদ।

গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করার দাবি জানিয়ে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন দিনাজপুরের পুলিশ সুপার হামিদুল আলম।

পুলিশ সুপার জানান, জোড়া খুনের নেপথ্যের মূল কারণ উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে। এ ঘটনায় জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। মূলত তরিকাসংক্রান্ত মতাদর্শের কারণেই এ হত্যাকাণ্ড। পীরগুরু ইছাহাক আলীর তরিকা হলো জিকির, আজকার ও মাহফিল, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া। কিন্তু তাঁর শিষ্য ফরহাদ হোসেন চৌধুরী নামাজ ছাড়াই যেকোনোভাবে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভের আরাধনার পথ দেখাতেন।

এ ছাড়া গুরুর চেয়ে শিষ্যের মুরিদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ঈর্ষাকাতর হন ইছাহাক আলী। পথের কাঁটা দূর করতে ফরহাদ হোসেন চৌধুরীকে হত্যার পরিকল্পনা আঁটেন তিনি।

ফরহাদ হোসেন হত্যা মামলায় তাঁর পীরগুরু ইছাহাক আলীকে গত বুধবার কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর পাথরডুবি গ্রামের বাড়ি থেকে আটক করা হয়। পুলিশ সুপার জানান, গতকাল সকাল পর্যন্ত দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিতে রাজি হন ইছাহাক আলী। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তিনি জবানবন্দিতে বলেছেন, ঘটনার দিন গত সোমবার সন্ধ্যার দিকে ফরহাদ হোসেন চৌধুরীর দরগার খাদেম সাইদুর রহমানের সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী দরগায় প্রবেশ করেছিল পীরগুরু ইছাহাক আলীসহ আরো পাঁচজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সাইদুর দরগার দরজা খুলে দিয়েছিলেন। তারা ঢুকে দেখে দরগার বিশ্রাম কক্ষে টেলিভিশন দেখছিলেন (কথিত) পীর ফরহাদ হোসেন চৌধুরী। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং বালিশচাপা দিয়ে শরীর অবশ করে বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে তারা। এর আগে দরগার কর্মী নারী মুরিদ রূপালী বেগমকে মুখ চেপে কাবু করে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশ সুপার জানান, জোড়া খুনে ৭ পয়েন্ট ৬৫ এমএম পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছে। মূলত গুলিতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও এ কথা বলা হয়েছে। ব্যবহূত পিস্তলের গুলির দুটি খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী অন্যদের চিহ্নিত করা হয়েছে। যে গুলি ছুড়েছে সে পীরগুরু ইছাহাক আলীর পুরনো মুরিদ। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। হত্যায় অংশ নেওয়া অন্য পাঁচজনকেও ধরার চেষ্টা চলছে।  

গত মঙ্গলবার আটক দরবারের খাদেম সাইদুর রহমান ও মুরিদ সমর আলীকে আটক করা হয়।

গতকাল দিনাজপুরের অতিরিক্ত মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম এফ এম আহসানুল হকের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ইছাহাক আলী ও সাইদুর রহমান। মুরিদ সমর আলীকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।

আদালত পুলিশের পরিদর্শক শহীদ সরওয়ারর্দী জানান, দুপুরের দিকে ইছাহাক আলী ও সাইদুর রহমানকে আদালতে হাজির করেন জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পুলিশের উপপরিদর্শক বজলুর রশিদ। জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার পর সন্ধ্যার দিকে দুজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।


মন্তব্য