kalerkantho


ব্যাংকার আরিফা হত্যাকাণ্ড

সাবেক স্বামী রবিনই খুনি!

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সাবেক স্বামী রবিনই খুনি!

ডিভোর্সের পরও মাদকাসক্ত উগ্র মেজাজি রবিন নিয়মিত বিরক্ত করে আসছিল আরিফাকে। ব্যাংকে চাকরি করার পাশাপাশি নিজেকে সামলে নিয়ে ফের নতুন করে জীবনযাপনের চেষ্টা করছিলেন আরিফা।

কিন্তু রবিন তা কোনোভাবে হতে দিচ্ছিল না। অফিস, ঘর এমনকি রাস্তায় জনসম্মুখেও তাঁকে নানাভাবে নাজেহাল করত। হত্যার হুমকিও দিত রবিন। নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে আরিফা একপর্যায়ে রাজধানীর কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাঁকে নিরাপত্তা দিতে পারল না। শেষ পর্যন্ত রবিন তাঁকে হত্যাই করল।

গল্পের মতো কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখ ভিজে যায় স্বজনদের। ছোট বোনের খুনি রবিনকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন বড় ভাই আবদুল্লাহ আল আমিন বুলবুল।

কলাবাগান থানার ওসি ইয়াসির আরাফাত কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাংককর্মী আরিফাকে তাঁর সাবেক স্বামী রবিনই যে খুন করেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

কারণ ঘটনাস্থল থেকে ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডের ১৩ ওয়েস্ট অ্যান্ড স্ট্রিটের নিজ বাসার দরজার সামনে যমুনা ব্যাংকের কর্মকর্তা আরিফুন নেছা আরিফাকে (২৭) ছুরিকাঘাত করা হয়। স্থানীয়রা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুপুর ১২টার দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তাঁর সাবেক স্বামী ফখরুল ইসলাম রবিনকে আসামি করে রাতে হত্যা মামলা করেছেন নিহতের ভাই আবদুল্লাহ আল আমিন বুলবুল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাবাগান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সমির চন্দ্র সূত্রধর বলেন, রবিনকে ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। তাঁকে ধরতে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সব থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।

তদন্ত কর্মকর্তা সমির বলেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তা যাচাই-বাছাই করে মনে হচ্ছে, আরিফাকে হত্যা করতেই সেন্ট্রাল রোডের ওই বাসার সামনে এসেছিল রবিন। সেন্ট্রাল রোডের একটি সুরক্ষিত ভাসায় থাকতেন আরিফা। ঘটনাস্থলের মালিক সমিতির অফিসের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসি) ফুটেজ সংগ্রহ করে ঘটনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সকাল ৮টা ৪৪ মিনিটে আরিফা মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গেটের বাইরে বের হন। এর পর ৮টা ৪৭ মিনিটের দিকে আরিফা তাঁর সাবেক স্বামী রবিনকে সঙ্গে নিয়ে একই গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকেন। ওই সময় দুজনের হাতেই ছিল ব্যাগ। তাঁরা বাসার দিকে হাঁটছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আর্থাৎ ৮টা ৫১ মিনিটে রবিনকে দৌড়ে পালাতে দেখা যায়। এর মধ্যেই আরিফা খুন হন। ওই সময়ই রবিন তার সাবেক স্ত্রী আরিফাকে হত্যা করে পালিয়ে যায় বলে ভিডিও ফুটেজ দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এদিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত রবিনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে না পারলেও ঘটনার পর সে ফেসবুকে নিহত আরিফার স্বজনদের হুমকি দেয়। রবিন নিজের ফেসবুক ওয়ালে স্ট্যাটাস দেয় এভাবে ‘বলেছিলাম বাঁচতে দে...জীবন নষ্ট করিস না...এখন বুজো? অনিক, তানজিনা, শিল্পী, রিয়াদ, পলাশ, মাসুদ দেখা হবে মনে রাখিস। ’ এরা সবাই নিহত আরিফার স্বজন বলে জানা গেছে। বিশেষ করে রবিন যাদের হুমকি দিয়েছে তাঁরা হলেন আরিফার দুই ভাই পলাশ এবং মাসুদসহ তার খালাতো বোন শিল্পী।

রবিনের ব্যাপারে তাৎক্ষণিক খোঁজখবর নিয়ে পুলিশ জানতে পেরেছে, জামালপুরের সদর উপজেলার বাসিন্দা রবিন ছোট থেকেই খারাপ ছিল। মাদকাসক্ত ও বদমেজাজিও ছিল। তার বাবা বেঁচে নেই। তবে মা আছেন। তার বড় ভাই একটি ব্যাংকে চাকরি করেন। পরিবারে দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে রবিন দ্বিতীয়। তাদের বাড়ি জামালপুরের বাজারিপাড়ায় সকালবাজার এলাকায়। ২০০৭ সালে এসএসসি পাসের পর অ্যাকাউন্টিংয়ে অনার্স করে। সর্বশেষ একটি সিমেন্ট কম্পানিতে মার্কেটিং বিভাগে চাকরি করত সে। তবে সেই চাকরি ছেড়ে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে এমবিএতে ভর্তি হয়েছিল রবিন।

জানা গেছে, আরিফা আর রবিন দুজনই জামালপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা। একসময় আরিফা পড়ত জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আর রবিন জামালপুর জিলা স্কুলে। একই সঙ্গে তারা কোচিংও করত। সেই সূত্রে তাদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর আরিফা ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। আট বছরের প্রেমের সম্পর্কের পর চার বছর আগে রবিন-আরিফা বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু স্বামীর বাড়িতে যাওয়ার পর বনিবনা না হওয়ায় ছয় মাসের মধ্যে তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে যান। এরপর তিনি ঢাকায় এসে ফের পড়ালেখা শুরু করে। ইডেন কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। কিন্তু বিয়ের পর রবিনের আচার-আচরণ আরিফাকে হতাশ করে এবং তিনি শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে আসেন। বছরখানেক আগে আরিফা যমুনা ব্যাংকে চাকরিতে যোগ দেন। ধানমণ্ডির সেন্ট্রাল রোডে আইডিয়াল কলেজের পাশের ওই বাসায় সাবলেট থাকা শুরু করেন। এর মধ্যে আরিফা আর রবিন একবার নিজেদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করে। তবে তা সফল হয়নি। রবিনের উগ্রতায় ত্যক্তবিরক্ত হয়ে মাসতিনেক আগে তাকে তালাক দেন আরিফা। এটা রবিন মেনে নিতে পারছিল না। এখন দ্রুত গ্রেপ্তার করে রবিনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছে স্বজনরাও।

তালাকের পর থানায় জিডি করার পরও কেন সাবেক স্বামী রবিনকে ওই বাসার ভেতর ঢোকান আরিফা এ বিষয় তদন্তে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রবিন সব সময় আরিফাকে ফলো করত। ঘটনার আগে হয়তো অনেক অনুনয়ের কারণে তাকে বাসায় আসার অনুমতি দেন আরিফা। এরপর রবিনকে বাসায় নিয়ে আসতে সাতসকালে নিজেই বাসা থেকে বের হন। তখন রবিনের সঙ্গে ছিল বেশ কয়েকটি ব্যাগভর্তি জিনিসপত্র। বাসার ভেতর ঢোকার মুহূর্তে অর্থাৎ বারান্দা থেকে সিঁড়ি লাগোয়া দরজার সামনে পৌঁছতেই রবিন নিজের কাছে থাকা ছুরি আরিফার ঘাড়ে মেরে পালিয়ে যায়।

মেয়ের শোকে এখন পাগলপ্রায় আরিফার মা আফিফা খাতুন। দীর্ঘদিন মেয়েকে দেখে রাখছিলেন তিনি। মেয়ের যেন কোনো বিপদ না হয়, সেটাই সব সময় কামনা করতেন তিনি। মেয়ের শোকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

পারিবারিক সূত্র জানায়, আরিফাকে গতকাল শুক্রবার সকালে তাঁর গ্রামের বাড়ি জামালপুরের হাজরাবাড়ীতে দাফন করা হয়েছে। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন আরিফা।


মন্তব্য