kalerkantho


মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধে মরিয়া সিন্ডিকেট

হায়দার আলী   

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধে মরিয়া সিন্ডিকেট

জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি ঠেকাতে কাজ করছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে দেশটিতে জনশক্তি পাঠানো শুরু হলেও আবার সেটা বন্ধে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি চক্র।

দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজেরা লাভবান হওয়ার চিন্তা থেকেই তারা মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে উচ্চ আদালতে একের পর এক রিট মামলা করছে।

জানা গেছে, জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে গত দুই মাসে চারটি রিট মামলা করা হয়েছে। পরে উচ্চ আদালতে শুনানি শেষে সেসব মামলা খারিজ হয়ে গেছে। এদিকে যারা এসব মামলা করছে তাদের বিরুদ্ধেও জনশক্তি রপ্তানিসংশ্লিষ্ট নানা গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। লিবিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে জালিয়াতির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় সিন্ডিকেটভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির সনদও বাতিল করেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, বিগত পাঁচ বছরে বিদেশে কর্মী পাঠানোর রেকর্ড নেই এমন প্রতিষ্ঠানও রিট মামলা করে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে করা এক রিট মামলা গত সোমবার খারিজ হয়ে যায়। বায়রার সদস্য আরিজ এন্টারপ্রাইজের মালিক সৈয়দ বাবর উদ্দিন বাদী হয়ে করা ওই মামলায় প্রবাসীকল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ১৬ জনকে প্রতিপক্ষ করা হয়। এভাবে গত দুই মাসে চারটি রিট মামলা করেন ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

মেসার্স এ আর ট্রেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রাকিব মুকুল, মেসার্স আকাশ ভ্রমণের মালিক ও বায়রার সাবেক মহাসচিব মনসুর আহমেদ কালাম, ইস্টার্ন বিজনেস অ্যাসোসিয়েট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওয়ালিউল্লাহ, অর্চিড ভিউয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বায়রার বর্তমান যুগ্ম মহাসচিব ওবায়দুল আরিফ ও রিয়াজ ওভারসিসের স্বত্বাধিকারী রিয়াজুল ইসলামসহ ১০ থেকে ১২ জনের একটি গ্রুপ মালয়েশিয়ায় জনশক্তি পাঠানোর বিষয়ে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বায়রা এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছর থেকেই মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হতো। কিন্তু একের পর এক মামলাসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় শেষ পর্যন্ত গত ১০ মার্চ তা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। প্রথম লটে বিমানবন্দরের কার্গো লোডার পদে ৯৮ জনের একটি দল মালয়েশিয়ায় পৌঁছায়। তবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বায়রার একাধিক সদস্যের আশঙ্কা, এভাবে উচ্চ আদালতে রিট মামলার কারণে

সঠিক সময়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে না পারলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। কর্মী না পেয়ে মালয়েশিয়ার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীর জন্য নেপাল, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের দিকে ঝুঁকতে পারে।

বায়রার কয়েকজন সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তারা কাজে মনোযোগী, কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়ায় না। অল্প সময়ের মধ্যে ভাষা শিখে নেয়। কাজের দক্ষতার কারণেই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদা বেশি। কিন্তু মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মী না পেলে এই সুযোগটি নেপাল নিয়ে নিতে পারে।

জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়ে আদালতে রিট করেছিলেন মেসার্স ইউনাইটেড এক্সপোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম রফিক। পরে তিনি মামলাটি প্রত্যাহার করে নেন। প্রত্যাহার করে নেওয়ার সময় লিখিত আবেদনে তিনি বলেন, ‘বায়রার যুগ্ম মহাসচিব ওবায়দুল আরিফসহ সংগঠনটির একটি সিন্ডিকেটের প্ররোচনায় উচ্চ আদালতে মামলাটি করেছিলাম। ’ কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমাকে ভুল তথ্য দিয়ে বায়রার একটি সিন্ডিকেট আদালতে রিটটি করায়। বিষয়টি বুঝতে পেরে তা প্রত্যাহার করে নিই। ’

ওবায়দুল আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার প্ররোচনায় মামলা করতে যাবে কেন? চাইলে নিজেই তো মামলা করতে পারি। লিখিত এমন অভিযোগ বায়রায় করা হয়েছে এমনকি মামলা প্রত্যাহারের লিখিত আবেদনেও প্ররোচনাকারী হিসেবে তাঁর নাম বলা হয়েছে জানালে তিনি বলেন, ‘এটা তিনি সত্য কথা বলেননি। আর কেউ সংক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করলে তো আমরা কিছুই করতে পারি না। ’

বায়রার সভাপতি বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘ প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে বায়রার বৈধ সদস্যদের নাম মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে সে দেশের সরকার দশটি এজেন্সি বাছাই করে জানিয়ে দেয়, এই প্রতিষ্ঠানগুলোই কেবল লোক পাঠাতে পারবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সরকার কিংবা বায়রার কিছু করার নেই। কিন্তু অসাধু সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ার বাজারটি বন্ধ করতেই মামলাসহ নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করছে।

পাথফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনালের মালিক ও বায়রার সদস্য মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ওবায়দুল আরিফসহ ১০ থেকে ১২ জনের একটি সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ার বাজার বন্ধে উঠে পড়ে লেগেছে। যারা একের পর এক মামলা করছে, তাদের উচিত বাংলাদেশে কথা না বলে মালয়েশিয়ার সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা। কারণ ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে তারাই কর্মী নিতে চায়। সিদ্ধান্ত বদলাতে হলে মালয়েশিয়া সরকার পুনর্বিবেচনা করবে। কর্মী পাঠাতে না পেরে এভাবে মিথ্যা রিট মামলা করলে শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ’

বায়রার মহাসচিব মোহাম্মদ রুহুল আমিন স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি খোলার পেছনে আমাদের সরকার বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা বেশ শক্তিশালী। সেই বাজারটিতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বারবার বাধার সৃষ্টি করছে বায়রার ভেতরেরই একটি চক্র। এরা বারবার ভুল ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে উচ্চ আদালতে নামে-বেনামে রিট করছে। এমনকি তারা আগামীতে আরো রিট মামলা করে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির হুমকি দিচ্ছে। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বায়রার এক সদস্য বলেন, ‘বায়রার যুগ্ম মহাসচিব (১) ওবায়দুল আরিফসহ একটি সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি বন্ধের পাঁয়তারা করছে। সরকারের উচিত সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেওয়া।


মন্তব্য