kalerkantho


কড়াইল বস্তিতে ফের আগুন

খোলা আকাশের নিচে অসহায় লোকজন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



খোলা আকাশের নিচে অসহায় লোকজন

রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে গত বুধবার রাতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে গেছে কয়েক শ ঘর। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর গুলশানের কড়াইল বস্তিতে ফের আগুন লেগে নিঃস্ব হয়েছে বহু মানুষ। পুড়ে ছাই হয়েছে কয়েক শ ঘর।

এ নিয়ে চার মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার আগুন লাগল বস্তিটিতে। বুধবার গভীর রাতে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের চেষ্টায় বৃহস্পতিবার সকালের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনের সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে বৈদুতিক শর্টসার্কিট অথবা চুলা থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বস্তিবাসীর কেউ কেউ অভিযোগ করেছে, জমি দখল করার জন্য স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়েছে।   

গত বুধবার গভীর রাতে বস্তিবাসী যখন ঘুমিয়ে তখন আগুন লাগে। বস্তিবাসী জানায়, রাত ৩টার দিকে আগুন লাগে। এ নিয়ে গত ১০-১২ বছরে অন্তত ১৫ বার আগুন লাগল বস্তিটিতে। এর মধ্যে গত এক বছরে লেগেছে তিনবার।

আগুনে বস্তির অধিকাংশ টিন আর বাঁশের খুঁটি পুড়ে গেছে। সর্বশেষ গত ৬ ডিসেম্বর এই বস্তিতে আগুন লেগেছিল।

গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে মেয়র আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানান, আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আগুন কিভাবে লেগেছে তার তদন্ত করছে ফায়ার সার্ভিস। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে যারা থাকে তারা অবৈধভাবে ঘর তৈরি করে থাকে।

গুলশান লেকের দুই পাড়ে প্রায় দেড় শ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা কড়াইল বস্তিতে অর্ধলক্ষাধিক দরিদ্র মানুষের বাস। গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ খোলা আকাশের নিচে।

ঘটনার পর থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, এনজিও তাদের দুই বেলা খিচুড়ি আর শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেছে।

১৫ বছর ধরে কড়াইল বস্তিতে আছেন গার্মেন্টকর্মী আমেনা বেগম। মাঝ বয়সী এই নারী বিলাপ করতে করতে জানান, আগুন দেখে এক কাপড়ে ঘর থেকে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বের হতে পেরেছেন। এখন খোলা আকাশের নিচে কাপড়, খাবার ওষুধের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমেনা দুই সন্তান আর সবজি বিক্রেতা স্বামীকে নিয়ে এই বস্তিতে থাকতেন।

আবদুল্লাহ নামে এক রিকশাচালক বলেন, তাঁর গ্রামের বাড়ি বরিশাল। আট বছর ধরে তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এখানে একটি ঘর ভাড়া করে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আগুনে আমার জমানো নগদ টাহা,

বিছানা-তোশক, পোলা-মাইয়ার বই-খাতা সব পুইড়া ছাই হইয়া গেছে। এহন আমাগো কষ্ট ক্যাডায় দূর করবো। ’

কড়াইল বস্তি লাগোয়া একটি মুদির দোকান ছিল ষাটোর্ধ্ব সোলাইমান মিয়ার। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর দোকানে ছয়-সাত লাখ টাকার মালামাল ছিল। গত বছরের ১৪ মার্চ বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের সময় অল্পের জন্য তাঁর দোকান রক্ষা পেয়েছিল। সে সময় অল্প কিছু ক্ষতি হয়েছিল। এবার সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঠিক একইভাবে নিঃস্ব হয়েছেন আবু তালেব, শাপলা রানী, আলতাফ হোসেন, আরমানসহ আরো অনেক শ্রমজীবী মানুষ। খুপড়ি ঘরের পাশাপাশি তাঁদের কারো মুদি দোকান, কারো ইলেকট্রিক দোকান, কারো খাবার দোকান পুড়ে ছাই হয়েছে। তাঁরা এখন খোলা আকাশের নিচে ত্রাণের অপেক্ষায়।

এবার আগুন লাগার কারণ জানতে চাইলে বস্তির লোকজনের মধ্যে কেউ কেউ বলেছে, বৈদ্যুতিক কারণে, আবার কেউ বলেছে মশার কয়েল থেকে লাগতে পারে। কেউ বলেছে, জায়গাজমি দখল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে আগুন কিভাবে লেগেছে তা এখনই বলা যাবে না। আগুন লাগার অনেক কারণ থাকতে পারে। বিশেষ করে বস্তিটিতে প্রচুর অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ রয়েছে। তা ছাড়া গ্যাস, মশার কয়েল এমনকি চুলা থেকেও অনেক সময় আগুন লাগে। একবার আগুন লাগলে দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। ’

বস্তিটি উচ্ছেদের চেষ্টাও চলছে। তবে বারবার চেষ্টা চালিয়েও এই বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে বারবার আগুন লাগলেও নেপথ্যের কারণ বরাবরই অজানা রয়ে গেছে।


মন্তব্য