kalerkantho


সিরিয়ায় আত্মঘাতি জঙ্গি নিয়াজ

সন্তানদের জানতে দেবেন না স্ত্রী

নূপুর দেব, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) থেকে ফিরে   

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সন্তানদের জানতে দেবেন না স্ত্রী

আয়েশার বয়স এখন তিন বছর। প্রায় দুই বছর আগে বাবার কোলে উঠতে না উঠতেই বাবা হঠাৎ নিখোঁজ। তার দুই বছরের বড় বোন মরিয়মের স্কুলে যাওয়ার সময় শ্মশ্রুমণ্ডিত কোনো মানুষকে দেখলে বাবার কথা মনে পড়ে। তখন মায়ের কাছে বাবা কোথায় জানতে চায়। মা প্রিয়া মরিয়মকে বলতে পারে না, তার বাবা নেই। এই দুই কন্যাকে তিনি কখনো জানাবেন না, তাদের বাবা আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন।

কথাগুলো বলছিলেন সিরিয়ায় নিহত আত্মঘাতী জঙ্গি নিয়াজ মোরশেদ রাজার মেজ বোন জান্নাতুল মাওয়া শম্পা। তিনি চট্টগ্রাম মহানগরীর চিটাগাং গ্রামার স্কুলের (সিজিএস) প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা। শম্পা গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন।

শম্পা বলেন, ‘চার ভাই-বোনের মধ্যে নিয়াজ ছিল সবার ছোট। মা-বাবাসহ পরিবারের সবার প্রিয় নিয়াজ এভাবে বিপথগামী হবে তা আমরা কেউ কোনো দিন কল্পনাও করিনি।

সে একবারের জন্যও চিন্তা করেনি যে তার দুই অবোধ শিশুর ভবিষ্যৎ কী হবে। আমাদের কথা বাদই দিলাম। বিয়ের পর স্ত্রীর সঙ্গেই ছিল বেশি দিন। আমাদের কী দোষ! সে সিরিয়ায় ট্যাংকার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে। আর এদিকে তার বিপথগামিতার কারণে, তার শোকে পরিবার তছনছ হয়ে গেছে। আমার মা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আবোল-তাবোল বকেন। কয়েক দিন পর পর হাসপাতালে নিতে হয়। ’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবসাইট সাইট ইনটেলিজেন্স আত্মঘাতী বাংলাদেশি বোমারুর যে ছবি প্রকাশ করেছে সেটি নিয়াজ মোরশেদ রাজার। প্রকাশিত ভিডিও দেখে ছোট ভাইকে শনাক্ত করেন মেজ বোন জান্নাতুল মাওয়া শম্পা। তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালের ৪ মার্চ ঢাকার বারিধারার ফ্ল্যাট থেকে জুমার নামাজ পড়ার জন্য নিয়াজ বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। ওই সময় বাসায় মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান ছিল। ওই দিন মধ্য রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাসায় তল্লাশি করে। নিখোঁজের ঘটনায় আমাদের পরিবার থেকে ঢাকার বাড্ডা থানায় একটি জিডি করা হয়। সিরিয়া থেকে আমাকে মাঝেমধ্যে ফোন করত নিয়াজ এবং পরিবারের খবরাখবর নিত। ’

আইএস জঙ্গি হিসেবে ভাই নিহত হওয়ার ঘটনাটি কখন জেনেছেন জানতে চাইলে শম্পা বলেন, ‘ভিডিওটি প্রকাশ হওয়ার পর সবাই জানছেন। কিন্তু আমার ভাই রাজার নিহত হওয়ার খবরটি আমরা পেয়েছি ২০১৫ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি। সিরিয়া থেকে নিজেকে নিয়াজের বন্ধু পরিচয় দিয়ে ফোন করে একজন আমাকে বলেন, একটা মিশনে গিয়েছিল নিয়াজ। ট্যাংকার বিস্ফোরণের ঘটনায় মারা গেছে। এ খবর শুনে আমাদের পরিবার ভেঙে পড়ে। মা পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘খবর পাওয়ার সাত দিন পর বারিধারার ফ্ল্যাট ছেড়ে দুই সন্তানকে নিয়ে রাজার স্ত্রী ফাতেমাতুল সাবিহা প্রিয়া তার বাবার বাসায় গিয়ে ওঠে। মাকে আমি চট্টগ্রামে নিয়ে আসি। আমার সঙ্গেই আছে। কয়েক দিন পর আবার হাসপাতালে নিতে হবে চিকিৎসার জন্য। ’

জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ‘নিয়াজ লেখাপড়ায় অতি মেধাবী ছিল। আমরা ভাই-বোন সবাই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে অধ্যয়ন করেছি। তার লাইফটা আধুনিক ছিল। বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার চার-পাঁচ বছর আগে থেকে তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। তবে সে পরিবর্তন যে বিপথগামিতা বা জঙ্গি হওয়া তা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। কোরআন-হাদিস পড়ত। হঠাৎ দাড়ি রেখেছে। পোশাক-আশাকও পরিবর্তন করেছে। অত্যন্ত শান্ত ছিল, স্মার্ট ছিল। এ রকম ছেলে জঙ্গি হবে আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। ’

গতকাল দুপুরে নিয়াজের গ্রামের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের খন্দকিয়া গ্রামে গিয়ে জানা গেল, তাদের পরিবারের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে থাকা তার চাচাদের দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক নেই। ২০১১ সালের ৪ জুলাই নিয়াজের বাবা এ কে এম কামাল উদ্দিন (৫৩) মারা যাওয়ার পর দাফন করার জন্য বাড়িতে গিয়েছিলেন নিয়াজ। পরে আর বাড়ি যায়নি।

ছোট চাচা চট্টগ্রামের একটি পত্রিকার সম্পাদক ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘আমার বড় ভাইয়ের জানাজার নামাজ পড়ার সময় দেখি তার হাত বুকের মধ্যে। আমরা কেউ এভাবে নামাজ পড়ি না। নামাজের ভিন্নতা দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে উত্তর দিয়েছিল—এভাবেই নামাজ পড়তে হয়। তবে সে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়বে তা এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তার জন্য আমাদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন সবাইকে এখন নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। পরিবারের আশা-ভরসার প্রতীক ছিল নিয়াজ। ’ তিনি বলেন, ‘কেউ যাতে এ পথে না যায় সে ব্যাপারে সবাইকে বিশেষ করে মা-বাবাকে সতর্ক থাকতে হবে। ’

নিয়াজের বাবা এ কে এম কামাল উদ্দিন ব্যাংকার ছিলেন। তাঁরা আট ভাই-বোন। তিনি সবার বড় ছিলেন। ছোট ভাই আবদুল কাইয়ুম হাটহাজারী চিকনদণ্ডী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। ভাই-বোনরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। ২০১১ সালের ২ জুলাই কামাল উদ্দিন মারা যান। তিনি বিসিসিআই ও আল-বারাকার কর্মকর্তা ছিলেন। সর্বশেষ ইউসিবিএলের ডিএমডি ছিলেন।

নিয়াজ মোরশেদ রাজার জন্ম ঢাকার শাহজাহানপুরে। চট্টগ্রাম মহানগরের নাসিরাবাদে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে লেখাপড়া করে। এরপর জাম্বিয়ার লুসাকাতে ‘ও’ লেভেল পাস করে। পরে চিটাগাং গ্রামার স্কুল থেকে ‘এ’ লেভেল পাস করে অস্ট্রেলিয়ায় যায় স্নাতকোত্তর পড়ার জন্য। সেখানে ব্রুকলিন ইউনিভার্সিটিতে ব্যবসায় প্রশাসন ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করে। মাঝেমধ্যে দেশে আসত।

সর্বশেষ বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে ২০১০ সালে অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফেরে। ২০১১ সালের ৪ জুলাই বাবা মারা যাওয়ার ১৭ দিন আগে নিয়াজের আকদ হয় চট্টগ্রামের পটিয়ার প্রিয়ার সঙ্গে। শ্বশুরের বাসা ঢাকার কমলাপুরে রেলওয়ে কলোনিতে। সেখানে এখন দুই মেয়ে নিয়ে প্রিয়া থাকেন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।


মন্তব্য