kalerkantho


স্বীকৃতি

দুই মহীয়সীকে সম্মাননা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দুই মহীয়সীকে সম্মাননা

‘সিআরপি’র প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি টেইলর এবং ‘বাঁচতে শেখা’র নির্বাহী পরিচালক অ্যাঞ্জেলা গোমেজের হাতে সম্মাননা তুলে দেন বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। ছবি : কালের কণ্ঠ

পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষকে দীর্ঘ ৪৭ বছর ধরে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বাংলাদেশকে ভালোবেসে মানুষের পাশে আছেন নিরলস। তিনি সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজডের (সিআরপি) প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি টেইলর। আরেকজন নির্যাতিত মানুষের পাশে থেকে মানবতার কল্যাণে কাজ করছেন নিত্যদিন অবিরাম। নির্যাতিত নারীর জন্য ত্রাতা হিসেবে দেখা মেলে তাঁর। তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাঁচতে শেখার নির্বাহী পরিচালক অ্যাঞ্জেলা গোমেজ। এ দুই মহীয়সী নারীকে সম্মাননা দিয়েছে দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন। ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের পত্রিকাটির অষ্টম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে এ সম্মাননা প্রদান করা হয়।

বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতি বছরই দেশের গুণীজনদের সম্মাননা দিয়ে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ প্রতিদিন ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড গতকাল মানবতার কল্যাণে ভূমিকা রাখা দুই নারীকে সম্মাননা প্রদান করে। সম্মাননাপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে একটি করে ক্রেস্ট ও দুই লাখ টাকা প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান দুই মহীয়সীর ভূয়সী প্রশংসা করে মানবতাবাদী কাজ চালিয়ে নিতে তাঁদের ৫০ লাখ টাকা প্রদানের ঘোষণা দেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সম্মাননাপ্রাপ্ত দুই নারীকে ফুলেল শুভেচ্ছা, ক্রেস্ট ও উত্তরীয় প্রদান করা হয়। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ও এসআইবিএল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) রেজাউল হক তাঁদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন। এতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম, কালের কণ্ঠ’র সম্পাদক কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, এসআইবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসানুল আজিজ প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন নিউজ টোয়েন্টি ফোরের হেড অব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স সামিয়া রহমান।

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন লাখ লাখ নারীর অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। এটিই নারীদের সবচেয়ে প্রিয় পত্রিকা। এই পত্রিকাটি নারী আন্দোলন, নারী স্বাধীনতা, নারীর সব কিছুতে নির্বিঘ্নভাবে বলার শক্তি রাখে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের সাংবাদিকদের শুভেচ্ছা জানাই। সাংবাদিকদের পাশে সব সময় ছিলাম। ভবিষ্যতেও থাকব। ’

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আরো বলেন, এমন দুজন মানুষকে সম্মাননা দিচ্ছি যাঁদের সম্পর্কে বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। ...এই দুই নারীর সঙ্গে দেখা হওয়া আমার জন্য সৌভাগ্য ও সার্থকতা। সিআরপি ও বাঁচতে শেখা দুই প্রতিষ্ঠানকে ২৫ লাখ করে ৫০ লাখ টাকা সাহায্য দিতে চাই, যা তাদের কাজে সহযোগিতা করবে। আশা করি ভবিষ্যতেও তাদের সাহায্য করব। আট কোটি মানুষকে বলব তাদের পথে চলুন, তাদের কাছে শিখুন, তাদের পথ অবলম্বন করুন। শান্তি পাবেন, সুখ পাবেন। আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে তাদেরকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। ’

সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) রেজাউল হক বলেন, ‘দুই মহীয়সী নারীর সম্মাননা অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে আমরাও কৃতজ্ঞ। ১৯৯৫ সালে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর একই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের পাশে আছি আমরাও। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ দেওয়া হচ্ছে আমাদের ব্যাংক থেকে। ’

বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন দেশ ও জনগণের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে কাজ করছি। আজকে দুই মহীয়সী নারীকে আমরা সম্মাননা দিতে পেরে আনন্দিত। ভ্যালেরি টেইলর ও অ্যাঞ্জেলা গোমেজ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবহেলিত মানুষের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। একইভাবে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপও মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ’

কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘কোটি মানুষের দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন। এই পত্রিকা আজ দুজন কিংবদন্তিকে সম্মানিত করছে। আরো একজন কিংবদন্তি আমাদের মধ্যে রয়েছেন। তিনি হলেন ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া ও বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। এই তিনজন কিংবদন্তি দেশ ও মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন। ’

সম্মাননা পাওয়া ভ্যালেরি টেইলর জন্মসূত্রে যুক্তরাজ্যের নাগরিক। ১৯৭৯ সালে ছোট পরিসরে শুরু করা তাঁর প্রতিষ্ঠানের অধীনে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বর্তমানে ১০টি চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসায় অগ্রণী ভূমিকা রাখা এই নারীকে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। ২০০৪ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়। আর শরীরে ক্যান্সারের বাসা থাকলেও তিন দশক ধরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি নারী ও শিশুকে বাঁচতে শিখিয়েছেন অ্যাঞ্জেলা গোমেজ। যাদের বেশির  ভাগই সমাজ ও পরিবারে অবহেলিত, নির্যাতিত ও সুবিধাবঞ্চিত। এখন তারা সবাই স্বাবলম্বী। এখন অধিকার নিয়ে সম্মানের সঙ্গে পরিবারে আছেন, সংসার করছেন। এই অসাধারণ কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ ম্যাগসাইসাই পুরস্কার, কিট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-লিট উপাধিসহ পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননাও।  

অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অ্যাঞ্জেলা গোমেজ বলেন, ‘বঞ্চিত মানুষের পাশে থেকেছি। ৪০ বছর ধরে কাজ করলেও কখনো পুরস্কারের আশা করিনি। অনেক অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তিন হাজারের বেশি মামলা ও অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে কিন্তু কখনো ভয় পাইনি। একটা কথাই ভেবেছি, আমি কোনো অপরাধ করিনি, মানুষের জন্য কাজ করছি। চুরি কিংবা কোনো চরিত্রহীন কাজ করিনি। এ জন্যই কোনো ভয় পায়নি। আমি একজন কুমারী খ্রিস্টান মেয়ে। একা মুসলমানদের মধ্যে থেকে কাজ করেছি। মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়েছি। কষ্ট হলেও জয় করেছি। কেউ আত্মার আত্মীয় না হলেও আত্মীয়ের মতো সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। বিরোধিতাকারী অনেকেই পরবর্তীতে মাফ চেয়েছে। অনেকে কাজ চালিয়ে দিতে উৎসাহ দিয়েছে। আজকের এই সম্মাননা কাজের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দেবে ও উৎসাহী করবে। ’ পুরস্কার দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ প্রতিদিন ও বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি টেইলর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আজ থেকে ৪৭ বছর আগে আমি বাংলাদেশে আসি। মানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছি। গত এক মাসে অন্তত ৮০ জন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীকে সেবা দিয়েছি। এর মধ্যে কিছুসংখ্যক নারীও ছিলেন। তাদের ফুটফুটে শিশুর কাছে মাকে ফেরত দিতে পেরে আমি খুশি। ’ এ সময় তিনি পক্ষাঘাতের বিষয়ে নিজের কয়েকটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বসুন্ধরা গ্রুপের আর্থিক অনুদান ঘোষণার পর ভ্যালেরি টেইলর বলেন, ‘এই অনুদান আমাদের উৎসাহিত করবে। মানবতার কাজে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত। বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। ’


মন্তব্য