kalerkantho


সরকারকে ‘চাপে’ রেখে ভাস্কর্য সরানোর কৌশল হেফাজতের!

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সরকারকে ‘চাপে’ রেখে ভাস্কর্য সরানোর কৌশল হেফাজতের!

স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে বিভিন্ন পরিবর্তন আনার পর এবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণের দাবিটিও সরকারকে এক ধরনের ‘চাপে’ রেখে কৌশলে আদায় করার কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ন্যায়বিচারের প্রতীক ওই ভাস্কর্যকে ‘গ্রিক দেবীর মূর্তি’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা অপসারণের দাবিতে প্রায় এক মাস ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে সংগঠনটি।

সর্বশেষ গত শুক্রবার চট্টগ্রাম মহানগরে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা ভাস্কর্য অপসারণ করা না হলে ঢাকা ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুমকি দিয়েছেন। তবে এই হুমকির সঙ্গে একমত নন হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও মহাসচিব হাফেজ মুহাম্মদ জুনাইদ বাবুনগরী। ভাস্কর্য ইস্যুতে আগামী ৫ মে ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত বা কর্মসূচি নেই বলে জানিয়েছেন হেফাজতের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা। শুধু তাই নয়, আপাতত সরকারবিরোধী বড় কোনো কর্মসূচিতেও যাচ্ছে না সংগঠনটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা জানান, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আছেন ইসলামী ঐক্যজোটসহ ২০ দলীয় জোটের শরিক কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দলের নেতারাও। ওই দলগুলোর অনেক নেতা ভাস্কর্য ইস্যুতে হেফাজতকে আবার রাজপথে নামিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পাঁয়তারা করছেন। ওই নেতাদের পক্ষ থেকেই বিভিন্ন সমাবেশে কঠোর কর্মসূচির হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবে হেফাজতের নীতিনির্ধারকরা এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন না।

ভাস্কর্য অপসারণ দাবির আন্দোলন প্রসঙ্গে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব হাফেজ মুহাম্মদ জুনাইদ বাবুনগরী গত রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই ইস্যুতে সরকার পতনের কোনো দাবি আমাদের সংগঠনে নেই।

আমরা কাউকে গদিতে বসানো বা নামানোর পরিকল্পনায়ও নেই। হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন। ’ চট্টগ্রামে গত শুক্রবারের সমাবেশে ৫ মে ঢাকায় যাওয়ার যে হুমকি দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে কী বলেছে না বলেছে তার সঙ্গে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির ও মহাসচিবের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা ওই সমাবেশে ছিলাম না। যাঁরা বিভিন্ন কথা বলেছেন তাঁরা সংগঠনের দায়িত্বশীল কেউ নন। আমির ও মহাসচিবের সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো কর্মসূচি পালন হবে না। ঢাকায় যাওয়ার কোনো কর্মসূচি এখন আমাদের নেই। ’

জুনাইদ বাবুনগরী আরো বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের কারণে সরকার জনগণের মনের ভাব বুঝে পাঠ্যপুস্তকে আংশিক ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন করেছে। ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশে ইসলামী ভাবধারা ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে না। সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে গ্রিক দেবীর মূর্তি অপসারণের জন্য আমরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি। এই ব্যাপারে আমাদের সংগঠনের ঢাকা মহানগর শাখার পক্ষ থেকে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এই দাবিতেও আমাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ। আশা করি সরকার পাঠ্য বইয়ের মতো জনগণের মনের ভাব বুঝে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ওই মূর্তি সরাবে। ’

একই বিষয়ে হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর প্রেসসচিব মাওলানা মুনির আহমদ বলেন, ‘হুজুর একটু অসুস্থ। ফোনে কথা বলাটা ঠিক হবে না। ’ ভাস্কর্য ইস্যুর কর্মসূচি প্রসঙ্গে মুনির আহমদ বলেন, “বড় হুজুর (আল্লামা শফী) গত শুক্রবার ফেনীতে সানে রেসালাত সম্মেলনে বলেছেন, ‘বল প্রয়োগে আমরা দাবি আদায়ের পক্ষে নই। জনমত তৈরি করব। ’ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ইসলামবিরোধী গ্রিক দেবীর মূর্তি সরানোর জন্য। জনমত তৈরির কাজ চলছে। ”

হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের যৌক্তিক দাবি অনুযায়ী সরকার পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন এনেছে। তার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ। আমরা মনে করি, পাঠ্যপুস্তকে আমাদের ৭০ শতাংশ দাবি পূরণ হয়েছে। এখনো অনেক দাবি অপূরণ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ওপর আমরা অত্যন্ত আশাবাদী ও আস্থাশীল। তিনি সব সময় জনগণের মনের ভাষা বুঝতে পারেন। দীর্ঘ অর্ধশতাধিক বছরের বেশি পুরনো দল আওয়ামী লীগ। এই দল স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। তাই এ দলের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন। ’

হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘মূর্তি কখনো ন্যায়বিচারের মানদণ্ড হতে পারে না ইসলামপ্রধান দেশে। মূর্তিকে কেন্দ্র করে যাতে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য সরকারকে অবিলম্বে তা অপসারণের দাবি জানাচ্ছি। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে না পারে সে ব্যাপারে সরকার হেফাজতের যৌক্তিক দাবি অবশ্যই মেনে নেবে। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে মূর্তিটি অপসারণ করবে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে মূর্তি দেখতে চায় না। মূর্তি অপসারণের জন্য আমরা ঈমানি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সরকার যদি চাপে পড়ে এতে আমাদের কিছু করার নেই। ’

মঈনুদ্দিন রুহী জানান, গত সপ্তাহে হাটহাজারীতে হেফাজতে ইসলামের কার্যালয়ে আমিরের সভাপতিত্বে মূর্তি অপসারণের বিষয়টি নিয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। চলতি মাসে এই ব্যাপারে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে আলেম ওলামাদের নিয়ে আরেকটি বৈঠক হতে পারে।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব ভাস্কর্যবিরোধী একটি বিবৃতি দিয়েছেন। ওই বিবৃতি দেওয়ার পরের দিন ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদ ও ঢাকার বায়তুল মোকাররম চত্বরে ভাস্কর্য অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ঘোষণা করে তা পালন করেন। এরপর গত ১০ মার্চ একই দাবিতে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সংগঠনের মহানগর শাখা।


মন্তব্য