kalerkantho


মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

অপেক্ষায় নতুন ভবন

নওশাদ জামিল   

১৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



অপেক্ষায় নতুন ভবন

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নিজস্ব ভবন। ছবি : কালের কণ্ঠ

সুরম্য ও নান্দনিক ভবনটির দোতলায় উঠতেই চোখে পড়ে দেয়ালে খোদিত কবিতার উজ্জ্বল পঙিক্তমালা—‘সাক্ষী বাংলার রক্তভেজা মাটি/সাক্ষী আকাশের চন্দ্রতারা/ভুলি নাই শহীদের কোনো স্মৃতি/ভুলব না কিছুই আমরা। ’

মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতি তুলে ধরতে ও মুুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নিজস্ব ভবন। প্রায় এক শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। শিগগিরই এটি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও হেড অব ডিজাইন (ডিসপ্লে) মফিদুল হক বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সব কিছু প্রস্তুত করা হয়েছে। চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, শিগগির জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। তারপর এটি খুলে দেওয়া হবে সর্বসাধারণের জন্য। ’

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নির্মাণ ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে মফিদুল হক বলেন, ‘রাজধানীর সেগুনবাগিচায় একটি ভাড়া বাসায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। তখন সামনের পথরেখা আমাদের জানা ছিল না। যেমন মুক্তিযুদ্ধে যখন বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তখন কেউ জানত না সামনে কী ঘটবে।

দিনে দিনে নানা চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিণত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গবেষণার অন্যতম প্রতিষ্ঠানে। সেই প্রাণের প্রতিষ্ঠানটি এখন নিজস্ব  ভবনে আসছে। আমরা মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সবার জন্য এটি একটি আনন্দের খবর। ’

ভবনটি ঘুরে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও ইতিহাস তুলে ধরতে সাজানো হয়েছে জাদুঘরের গ্যালারিগুলো। প্রতিটি গ্যালারিতে থাকছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী নানা স্মারক। থাকছে মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ নানা ডকুমেন্ট। থাকছে নানা স্মারক ডিজিটাল প্রযুক্তিতে তুলে ধরার ব্যবস্থা।

জাদুঘরের ভবনটি নির্মিত হয়েছে দশমিক ৮২ একর জমির ওপর। ভবনে থাকছে তিনটি বেসমেন্ট ও চারটি গ্যালারি। প্রথম গ্যালারিটি ‘আওয়ার হেরিটেজ’ বা আমাদের ঐতিহ্য। তাতে থাকছে বাঙালি ঐতিহ্যের নানা দিক। দ্বিতীয় গ্যালারি ‘আওয়ার রাইট’-এ থাকছে প্রাক-মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মারক। এখানে সত্তরের নির্বাচনের পর থেকে বাঙালির ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন-ধ্বংসযজ্ঞ ও বাঙালির তা প্রতিরোধের ইতিহাস নানা উপকরণের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হবে। তৃতীয় গ্যালারির নাম ‘আওয়ার ব্যাটল’ বা আমাদের যুদ্ধ। তাতে একাত্তরের সশস্ত্র সংগ্রাম শুধু নয়, সাধারণ মানুষের সংগ্রাম-লড়াইয়ের চিত্রও ফুটে উঠবে। চতুর্থ গ্যালারি ‘আওয়ার ভিক্টোরি’তে স্থান পাবে একাত্তরের ১ আগস্ট থেকে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত নানা সময়ের স্মৃতিবিজড়িত উপাখ্যান।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেগুনবাগিচায় আগের ভবনটি ছোট ছিল। ফলে আমরা অনেক নিদর্শনই প্রদর্শন করতে পারতাম না। নতুন ভবনে পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। গ্যালারিও বিশাল আকারে নির্মিত হয়েছে। ফলে আমরা সেসব গ্যালারিতে নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন প্রদর্শন করতে পারব। ’

ডা. সারওয়ার আলী আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংগ্রহে লক্ষাধিক নিদর্শন রয়েছে। গ্যালারিগুলোতে আমরা ঘুরে ফিরে তা প্রদর্শন করব। এ ছাড়া জাদুঘরটিতে থাকছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবস্থা। অডিও-ভিডিও ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে নানা নিদর্শন। ’

জানা যায়, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের নানা বিষয় জানাতে থাকছে ইন্টারঅ্যাকটিভ স্পেস, ওপেন এয়ার থিয়েটার। এ ছাড়া থাকছে তিনটি সেমিনার হল, ২৫০ আসনবিশিষ্ট একটি অডিটরিয়াম। তাতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক, চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও অন্যান্য পারফর্মিং আর্ট পরিবেশন করা হবে। মুক্তিযুদ্ধের গবেষণার জন্য রিসার্স অ্যান্ড আর্কাইভের স্থানও রাখা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এর আগে ২০১০ সালে সর্বসাধারণের কাছে জাদুঘর নির্মাণে অনুদান চেয়েছিল জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। তাতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও সাড়া দেয়। এভাবে নির্মাণ ব্যয়ের পুরো অর্থই এসেছে জনগণের অনুদান থেকে। আর নতুন ভবনে অনুদানদাতাদের নাম থাকছে স্মারক হিসেবে।


মন্তব্য