kalerkantho


আন্দোলনের নামে গাবতলীতে তাণ্ডব

তাজুলসহ ৫৫ আসামি অধরা, নির্দেশদাতারা আড়ালে

এস এম আজাদ   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



তাজুলসহ ৫৫ আসামি অধরা, নির্দেশদাতারা আড়ালে

আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নামে রাজধানীর গাবতলী এলাকায় নজিরবিহীন অরাজকতা চালানো ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। ঘটনার ১১ দিন পার হলেও পুলিশের ওপর হামলা, অ্যাম্বুল্যান্সসহ যানবাহন ভাঙচুর ও পুলিশের বুথ আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

শনাক্ত হয়নি কথিত ওই আন্দোলনের নামে নাশকতা চালানোর হুকুমদাতা বা মদদদাতাদের নাম।

গাবতলীতে প্রায় ২৪ ঘণ্টার ‘সংঘাতময়’ পরিস্থিতির ঘটনায় পুলিশ চারটি মামলা দায়ের করে। এক শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় একটি মামলা হয়। সাতজন শ্রমিককে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করে পুলিশ। তবে এজাহারে নাম থাকা শ্রমিক নেতাসহ ৫৫ জন আসামি এখনো অধরাই আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাস্থলের নির্দেশদাতা হিসেবে আন্ত জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তাজুল ইসলামের নাম জানা যায়। দুটি মামলায় তাঁকে প্রধান আসামিও করা হয়েছে। তিনি প্রকাশ্যে ঘুরলেও পুলিশ বলছে, তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না।

দারুসসালাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেলিমুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদে আমরা অনেক তথ্য পেয়েছি।

এ ছাড়া কিছু আলামতও মিলেছে। সব বিষয়ে তদন্ত চলছে। আসামিরা এখন পলাতক।

তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছি আমরা। ’ জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘পলাতক তাজুল দুই মামলার প্রধান আসামি। প্রথম মামলায় ৪৬ জনের নাম আছে। পরবর্তী সময়ে ৫৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এরা শ্রমিক-পরিবহনের লোক। ’

সূত্র জানায়, পরিবহন শ্রমিকদের তাণ্ডবের সময় দারুসসালাম, মাজার রোড, গাবতলী, আমিনবাজার ও এর আশপাশ এলাকার সিসিটিভির (ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা) ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। সেগুলো দেখে আসামি যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। শ্রমিকদের অনেকের সঙ্গে কথাও বলে পুলিশ। তাদের তদন্তে অন্যতম নির্দেশদাতা হিসেবে আন্ত জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তাজুল ইসলামের নাম জানা যায়।  

শুক্রবার পর্যন্ত তদন্তকারীরা তাজুলকে পলাতক বলে দাবি করে এলেও তিনি এখনো প্রকাশ্যেই ঘুরছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে তিনি কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে কথাও বলেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো আন্দোলন করিনি। ড্রাইভারের বিরুদ্ধে রায়ের খবর পেয়ে শ্রমিকরাই গাড়ি বন্ধ করে। এর সঙ্গে জামায়াত-বিএনপির লোকজন মিলে এসব হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। ’ আন্দোলনের ডাক দিলেও পরে আপনাদের হাতে তা ছিল না—এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘না, আমি কোনো আন্দোলন ডাকিনি। ’ দুই মামলায় প্রধান আসামি আপনি, আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘মামলা তো হয়েছে ঠিকই। দেখা যাক, সমঝোতার চেষ্টা চলছে। ’  

সাভারে ট্রাকচাপা দিয়ে এক নারীকে হত্যার ঘটনায় চালক মীর হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জোকা এলাকায় বাস দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনায় বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন মানিকগঞ্জের আদালত। রায় ঘোষণার পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে কর্মবিরতিতে যান পরিবহন শ্রমিকরা। ওই দিন রাতে এবং পরদিন ১ মার্চ সকালে গাবতলীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। শ্রমিকরা যানবাহন ভাঙচুরের পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশ বুথ ও পুলিশের র‌্যাকার ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়। ব্যক্তিগত গাড়ি, রোগী বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্সসহ কিছুই শ্রমিকদের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি। সংঘর্ষে আট পুলিশসহ অর্ধশত মানুষ আহত হয় এবং এক পরিবহন শ্রমিক নিহত হয়। ওই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে চারটি এবং নিহত শ্রমিক শাহনূরের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়।

সহিংস ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দারুসসালাম থানা পুলিশ রফিকুল ইসলাম, হাসানুর, রবিন, সোহেল, ফজলে রাব্বী, আল-আমিন ও এনামুল হক নামের সাত শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে। আদালতের নির্দেশে তাদের দুই দফায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। রিমান্ড শেষে আসামিরা এখন জেলহাজতে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজন নির্দেশদাতার নামও জানতে পারে পুলিশ। এ ব্যাপারে দুই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, দারুস সালাম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জুবায়ের হোসেন গত ৬ মার্চ বলেন, ‘কয়েকজনের নাম জানা গেছে। এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে। তদন্তে ওপর মহলের কোনো চাপ নেই, কেউ কোনো প্রভাবও বিস্তার করছে না। যাদের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

গত শুক্রবার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, কাদের নাম এসেছে এবং কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না? ‘ঘটনার তদন্ত চলছে। এর বাইরে কিছুই বলা যাবে না। ’ এ কথা বলে প্রশ্ন এড়িয়ে যান এসআই জুবায়ের হোসেন।

মামলার এজাহারে আন্ত জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তাজুল ইসলাম ছাড়াও যাদের নাম আছে তারা হলো সম্পাদক আহম্মদ আলী, শ্রমিক নেতা আবুল হাসেম, সামছুল আলম, আবদুল সাত্তার, নসু, আবুল বাশার, কালাম মুন্সি, জুল জালাল, হাজি সুলতান, নাছির উদ্দিন, লোকমান ফরাজী, কালাম, আবু বক্কর, ইউসুফ, জজ মিয়া, জামাল, নুরুল ইসলাম, ফারুক হোসেন, মঞ্জু মিয়া, মিলন, মোবারক হোসেন, রাজিব হোসেন, শাহ আলম, হাবিল সিকদার, সিদ্দিকুর রহমান, কাওসার আহম্মেদ, মাহবুবুর রহমান, সাদেক হোসেন ওরফে তুফান, শহর আলী, বশির আহমেদ, হাজি আবু তালেব, লাট মিয়া, দুলাল, শামীম আহমেদ, সালাম, রফিকুল ইসলাম ওরফে বকুল, পারভেজ খান, আবু মিয়া, আওলাদ হোসেন, মোহাম্মদ আলী, হাবিবুল্লাহ, জাহাঙ্গীর হোসেন, আশফিউল্লাহ, সিদ্দিক হোসেন, ইব্রাহিম খলিল ও সুমন। এরা সবাই গ্রেপ্তার এড়িয়ে আছে।


মন্তব্য