kalerkantho

সফল নারী

বাধাজয়ী ‘কবিতা’

রফিকুল ইসলাম ও মির্জা খালেদ, পাথরঘাটা থেকে   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বাধাজয়ী ‘কবিতা’

দক্ষিণাঞ্চলের বিখ্যাত পাথরঘাটা ঘাটে মাছ বিক্রি করছেন কবিতা রানী কর্মকার। ছবি : কালের কণ্ঠ

জন্মভিটা ছেড়ে শিশু বয়সেই বাবার হাত ধরে এসেছিলেন সাগরতীরের নতুন ঠিকানায়। বাল্যবয়সেই বিয়ে। স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল সোনালি দিনের। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্থায়ী হয়নি। কিছুদিনের ব্যবধানেই স্বামী নিরুদ্দেশ। গর্ভে সন্তান নিয়ে যেন অকূলসাগরে পড়ে যান। কিন্তু সাহস হারাননি। জীবনের তাগিদে বেরিয়ে পড়েন ঘর ছেড়ে। বেছে নেন সাগরপারে ফেলনা মাছ কুড়ানোর বৃত্তি। কিন্তু তাতে তো সংসার চলে না। একপর্যায়ে পাড়ি জমান ঢাকায়।

কাজ নেন মিষ্টির দোকানে। সেখানেও নানা বাধা। পাড়ি জমান ভারতে। শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেন সাগরপারে। আর এখানেই তিনি কঠোর শ্রমে জয় করেছেন দারিদ্র্য। আজ তিনি সমুদ্রগামী মাছ ধরার চারটি ট্রলারের মালিক। আছে নোঙর তৈরির ব্যবসাও।

সংগ্রামী এই নারীর নাম কবিতা কর্মকার। ট্রলারে মাছ ধরা আর নোঙরের দোকানে তাঁর অধীনে কাজ করে ৫০ জনের বেশি পুরুষ কর্মী। মাঝি-শ্রমিক ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণের প্রধান ব্যবস্থাপক তিনি নিজেই। রসদ (খাবার) নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে জেলেদের পাঠানো এবং আহরিত মাছ ঘাটে এলে নিজেই নিলাম ডাকের মাধ্যমে তা বিক্রি করেন। এই ব্যবসা চালাতে গিয়ে তাঁকে অনেক সময়ই পুরুষের মতো কঠোর হতে হয়। আর সে কারণেই বুঝি বাবার দেওয়া নামটি হরিয়ে গেছে। সবাই তাঁকে ডাকে ‘বিন্দু মাসি’।

পেছন ফিরে দেখা : গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার মধুসূদন কর্মকার কাজের খোঁজে এসেছিলেন সাগরতীরের জেলা বরগুনায়। সঙ্গে দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলেটা সবার ছোট। মেজো মেয়ে কবিতার বয়স তখন ১১ বছর। সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের বাবুগঞ্জ বাজারে কর্মকারের দোকান দেন মধুসূদন। কবিতা বাবার সঙ্গে দোকানে কাজ করত। অভাবের সংসারে যেন বোঝা কমাতেই বাবা কবিতার বিয়ে দিয়ে দেন দিনমজুর ননী কর্মকারের সঙ্গে। কিন্তু ননীর আয় সংসার চালানোর মতো ছিল না। সে জন্য তিনি থাকতেন ঘরজামাই হিসেবে।

কবিতা তখন সন্তানসম্ভবা। এই অবস্থায় তাঁকে ফেলে ননী নিরুদ্দেশ হন। কবিতা পড়েন গভীর সংকটে। বাবার অর্থিক অবস্থা ভালো নয়। অসুস্থ অবস্থায় শারীরিক পরিশ্রমও সম্ভব নয়। এ অবস্থায়ই পৃথিবীর আলো দেখে ছেলেসন্তান মিলন। শুরু হয় আরেক সংকট। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে বাবুগঞ্জ বাজারে কুচা মাছ (ফেলনা) কুড়ানো শুরু করেন কবিতা। সেই মাছ গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে সংসারে কিছুটা আর্থিক জোগানের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ধারদেনা করে বাবুগঞ্জে চা বিক্রির ছোট একটি দোকান দেন। কিন্তু অভাব পিছু ছাড়ে না। একপর্যায়ে বরগুনা ছেড়ে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। কাজ নেন মিষ্টির দোকানে। কিন্তু শিশুসন্তানকে বাড়তি ঝামেলা মনে করে মালিক আর তাঁকে কাজে রাখতে চান না। ওদিকে অসুস্থতায় বাবা শয্যাশায়ী। ফিরে যান বাবার কাছে। চিকিৎসার জন্য তাঁকে নিয়ে অবৈধ পথে পাড়ি জমান ভারতে। ধার করে সামান্য যে টাকা নিয়ে যান তা কয়েক দিনেই শেষ হয়ে যায়। বিদেশ-বিভুঁইয়ে পরিচিতজনও কেউ নেই। এ অবস্থায় সন্তানের হাত ধরে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে নামতে হয় ভারতের রাস্তায়। বাবাকে নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। বরগুনায় আসার সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে মারা যান বাবা।

সাফল্যের শুরু : কবিতার জীবনে এবার নতুন অধ্যায়। বাবার শেষকৃত্য শেষ করেই বাবুগঞ্জে ছোট্ট করে খাবারের দোকান খোলেন। ভাতের পাশাপাশি বিক্রি করতে শুরু করেন ডালপুরি, শিঙাড়া ও হাতে বানানো মিষ্টি। এভাবে চলে তাঁর সাত-আট বছর। সাফল্য আসতে শুরু করে। সুদিন দেখে ননী কর্মকারও ফিরে আসেন সংসারে। ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে কবিতার। এরই মধ্যে তাঁদের সংসারে আসে কন্যাসন্তান মালা।

সংগ্রামী নারী কবিতা কিন্তু এতটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকতে চাননি। স্বামী-সন্তান নিয়ে ২০০৭ সালে চলে আসেন পাথরঘাটা পৌর শহরের ব্রিকফিল্ড এলাকায়। শুরু করেন নোঙর তৈরির ব্যবসা। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নোঙর তৈরি করেন ননী। আর নোঙর তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত লোহা ঢাকা ও খুলনা থেকে কিনে আনা, লেনদেন এবং পরিবহনের দায়িত্ব পালন করেন কবিতা।

সাগরতীরবর্তী পাথরঘাটায় নোঙরের ব্যাপক চাহিদা থাকায় ক্রমে কবিতার ব্যবসার প্রসার-প্রচার হতে থাকে। পাশের পিরোজপুর, বাগেরহাট, পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকেও জেলেরা আসে নোঙর কেনার জন্য। কঠোর শ্রমের ফসল হিসেবে এই দম্পতি এখন ব্রিকফিল্ড এলাকায় তিনটি প্লটের মালিক।

মাছের ব্যবসা : ২০১১ সালের দিকে হাত বাড়ান সাগরে মাছ ধরার ব্যবসার দিকে। একটি ট্রলার দিয়ে গভীর সমুদ্রে ১২ জেলেকে রসদ দিয়ে ইলিশ ধরার জন্য পাঠান। এখন তিনি চারটি ট্রলারের মালিক। জেলেরা মাছ ধরে ঘাটে নিয়ে আসে। কবিতা সেই মাছ নিজেই নিলামদরে বিক্রি করেন।

ট্রলারের মাঝি কাইয়ুম হাওলাদার বলেন, ‘বিন্দু মাসি কঠোর হলেও আমাদেরকে কখনোই ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেন না। মাছ বিক্রি করে নিজেই আমাদের হিসাব চুকিয়ে দেন। চুক্তির বাইরেও তিনি আমাদের বাড়তি টাকা দেন। বেশ কয়েকবার তাঁর ট্রলার জলদস্যুদের কবলে পড়ে। তিনি নিজেই মোবাইল ফোনে দস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আটক ট্রলার ছাড়িয়ে এনেছেন। ’

গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত ট্রলারপ্রতি ২০ থেকে ৪০টি নোঙর প্রয়োজন হয়। স্থানীয়ভাবে পাথরঘাটা পৌর শহরের ব্রিকফিল্ড এলাকায়ই পাঁচটি দোকানে এসব নোঙর তৈরি হয়। এর চারটিই কবিতা ও তাঁর আত্মীয়দের।

পাথরঘাটা পৌরসভার সাবেক মেয়র মল্লিক মো. আইয়ুব বলেন, শহরের ব্রিকফিল্ড এলাকায় কবিতাই প্রথম নোঙর তৈরির কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বোন, ভাই আর বোনের মেয়েজামাই এই ব্যবসায় আসেন। এই ব্যবসায় নারীদের এই অগ্রসরতার কারণে এলাকাটি এখন বৌ-বাজার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

মিলন ও মালা ওদের মাকে নিয়ে গর্বিত। ওদের মন্তব্য, ‘মায়ের কারণে আমরা শূন্য থেকে এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি। মায়ের সিদ্ধান্তই পরিবারে চূড়ান্ত। মায়ের ভাই-বোনেরাও তাঁর সিদ্ধান্তের বাইরে যান না। ’

ননী কর্মকার বলেন, ‘অভাবের সময় পরিবার ছেড়ে গিয়ে ভুল করেছিলাম। বিষয়টি বুঝতে পেরেই আবার পরিবারের কাছে ফিরে এসেছি। পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে আসার সব অর্জনই কবিতার। ’

কবিতা রানী কর্মকার বলেন, ‘জীবন সহজ নয়। শিশুকাল থেকেই প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে উঠেছি। প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে গিয়ে শিখেছি। পরিস্থিতির চাপে পড়ে ভিক্ষা পর্যন্ত করেছি। কঠোর না হলে ব্যবসা টেকে না। কঠোরতার কারণে সবাই আমাকে ভারতের সিনেমার খলনায়িকার নামে বিন্দু মাসি বলে ডাকে। আমি তাতে রাগ করি না। ’

বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, একসময় বাজারে ফেলনা মাছ (কুচা) কুড়াতেন কবিতা কর্মকার। সংগ্রাম করে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত। এখন তিনি সমুদ্রগামী চারটি জেলে ট্রলারের মালিক। তিনি জানান, তাঁদের সমিতির সদস্যসংখ্যা এক হাজার এক শ। এর মধ্যে দুজন নারী—পাথরঘাটা পৌর এলাকার কবিতা কর্মকার ও চরদুয়ানী ইউনিয়নের জ্ঞানপাড়া গ্রামের পিয়ারা বেগম।

উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ফাতিমা পারভীন বলেন, নারীরাও যে একটি পরিবারের উন্নতির জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন এর বাস্তব উদাহরণ কবিতা।


মন্তব্য