kalerkantho


ঝুলে আছে ১৪১ অতিরিক্ত জেলা জজের পদোন্নতি

আশরাফ-উল-আলম ও রেজাউল করিম   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ঝুলে আছে ১৪১ অতিরিক্ত জেলা জজের পদোন্নতি

সারা দেশের আদালতে মামলা জট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আইন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টরা বিচারকের নতুন পদ সৃষ্টির সুপারিশ করেছে। বর্তমানে যে পদ রয়েছে তার মধ্যেও অনেক পদ শূন্য রয়েছে। বিচারক সংকটও বিরাজমান। এ অবস্থায় অতিরিক্ত জেলা জজ পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ঝুলে আছে দীর্ঘদিন ধরে। জানা গেছে, একটি মাত্র গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায় আটকে আছে ১৪১ জন অতিরিক্ত জেলা জজের পদোন্নতি।

জেলা জজ পদমর্যাদার ৪২টি পদ শূন্য রয়েছে। ৪১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। এসব ট্রাইব্যুনালে জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারকরা বিচার করেন। অতিরিক্ত জেলা জজ থেকে জেলা জজ পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে নতুন ৪১টি নারী-শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতেও গত দুই বছরে ১৪১ জন বিচারকের অতিরিক্ত জেলা জজ থেকে জেলা জজ পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।

সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত বছর জেলা জজ পদমর্যাদার যে বিচারকরা অবসরে গেছেন, এখনো সেসব পদ পূরণ করা সম্ভব হয়নি। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়েই ১৯ জন জেলা জজ অবসরে গেছেন। আবার এ বছর অবসরে যাবেন ২৪ জন। সব মিলিয়ে এ বছরের মধ্যে জেলা জজ পর্যায়ে ১১৪টির মতো পদ শূন্য হবে।

বিধি অনুযায়ী আইন মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের এপ্রিলে শূন্য ওই ১৪১ পদে বিচারকের পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা বিচারকদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে চেয়ে নেয় মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি (ডিপার্টমেন্টাল প্রমোশনাল কমিটি-ডিপিসি) এই বিচারকদের পদোন্নতির জন্য সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ চায়।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ওই ১৪১ বিচারকের মধ্যে ১৮ জনের যথোপযুক্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় এই প্রক্রিয়া আটকে যায়। তবে সূত্র জানায়, বিধান অনুযায়ী এ অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সব বিচারকের সভায় (ফুল কোর্ট রেফারেন্স) সম্মতি দরকার।

সুপ্রিম কোর্ট সূত্র জানায়, গত ৮ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে ফুল কোর্টের সভা হয়েছে। তাতে ওই ১৪১ বিচারকের পদোন্নতি সম্পন্ন করার তাগিদ দেওয়া হয়। অভিজ্ঞতা-সংক্রান্ত জটিলতায় যাঁদের পদোন্নতি সম্ভব হচ্ছে না, তাঁদের ক্ষেত্রে শর্ত শিথিলের পরামর্শ দেন ফুল কোর্ট সভা। এ পরামর্শ দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে চিঠিও পাঠান সুপ্রিম কোর্ট।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, এ প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। শিগগিরই সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশাবাদী।

সুপ্রিম কোর্ট সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, শৃঙ্খলা বিধান এবং চাকরির অন্য শর্তাবলি) বিধিমালা ২০০৭-এর ৪ বিধির উপবিধি (১) অনুযায়ী, জেলা ও দায়রা জজ/সমপর্যায়ের পদে পদোন্নতির জন্য অতিরিক্তি জেলা ও দায়রা জজ/সমপর্যায়ের বিচারক পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ১৫ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। গত সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট সভায় অতিরিক্তি জেলা জজ হিসেবে বিচারক পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা শিথিল করে ছয় মাস করার কথা বলা হয়। অর্থাৎ অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে ছয় মাসের বিচারিক অভিজ্ঞতাসহ ১৫ বছর চাকরির বয়স থাকতে হবে। এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে একটি গেজেট প্রকাশের পরামর্শ দেন ফুল কোর্ট সভা।

নাম প্রকাশ না করে একজন জেলা জজ কালের কণ্ঠকে জানান, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ফুল কোর্ট সভা থেকে আইন মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে এখন দরকার কেবল শর্ত শিথিল করে গেজেট প্রকাশ করা। কিন্তু তা করা হচ্ছে না।

গত ২০ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের পক্ষে সহকারী রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান ভূঁইয়া আইন মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, জেলা জজের শূন্যতা পূরণে বর্তমানে সংকট চলছে। ২০১৭ সালের মধ্যে জেলা জজের শূন্য পদ পূরণের জন্য প্যানেল তৈরির কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বর্তমানে বিচার বিভাগে চাকরিকাল ১৫ বছর ও অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে বিচারিক কাজে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিচারকদের জেলা জজ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু প্যানেল তৈরিতে কিছু অতিরিক্ত জেলা জজের বিচারিক কাজে দুই বছরের অভিজ্ঞতা নেই। এ কারণে জেলা জজের পদ পূরণে ওই অভিজ্ঞতা শিথিল করা প্রয়োজন।

ওই চিঠিতে আরো বলা হয়, জেলা জজ বা সমপর্যায়ের পদটি বিচার ভািগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ। সারা দেশে বর্তমানে ৩০ লক্ষাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কাজেই ওই পদ শূন্য থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। জেলা জজের শূন্য পদ পূরণে এখনই উদ্যোগ না নিলে বিচারকের চরম সংকট দেখা দেবে। সংকট মুকাবিলায় জেলা জজ পদে পদোন্নতির শর্ত শিথিল করা প্রয়োজন। এ কারণেই বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বিধিমালা-২০০৭-এর ৪ বিধির উপবিধি (৪)-এর আলোকে বিচারিক অভিজ্ঞতা পরবর্তী এক বছরের জন্য শিথিল করত মোট চাকরিকাল ১৫ বছর বহাল রেখে অতিরিক্ত জেলা জজ বা সমপর্যায়ের পদে দুই বছরের চাকরির অভিজ্ঞতাসহ ছয় মাসের বিচারিক কাজের অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করে তা গেজেট আকারে প্রকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

সুপ্রিম কোর্টের এমন অনুরোধের পরও ছয় মাসের বেশি পার হয়েছে। কিন্তু গেজেটটি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অতিরিক্ত জেলা জজদের জেলা জজ হিসেবে পদোন্নতি ঝুলে আছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, ১৪১ জন অতিরিক্ত জেলা জজের জেলা জজ হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি এখনো চলমান।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, অধস্তন আদালতগুলোতে এখন প্রায় ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন। অনেক আদালাতে বিচারক নেই। এমনও জেলা রয়েছে, যেগুলোতে জেলা জজ নেই বা জেলা জজ পদমর্যাদার অনেক আদালতে বিচারক নেই। এভাবে চললে মামলাজট বেড়েই চলবে। এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে পদোন্নতির বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আইন কমিশনের সদস্য ড. এম শাহ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে বিচারক নিয়োগ এবং পদোন্নতির জন্য বেশ সময় দরকার হয়। এ দীর্ঘ প্রক্রিয়া বিচারিক কাজেও বিঘ্ন ঘটায়। মামলাজট থেকে বের হতে চাইলে এই প্রক্রিয়ার লাগাম টেনে ধরতে হবে। নিয়োগ পাওয়া বিচারকের প্রশিক্ষণ ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। আবার শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ দিতে হবে। নিয়মিত প্রতি বছর অন্তত ২০০ জন করে নতুন বিচারক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। জনস্বার্থে এ রকম সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

পদোন্নতি থেমে আছে অন্যদেরও : জেলা জজের শূন্য পদ পূরণ না হওয়ায় অতিরিক্ত জেলা জজদের পদোন্নতি হচ্ছে না। আর অতিরিক্ত জেলা জজদের পদোন্নতি না হওয়ায় যুগ্ম জেলা জজ, সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজদেরও পদোন্নতি হচ্ছে না।

ঢাকার একজন যুগ্ম জেলা জজ কালের কণ্ঠকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতিরিক্ত জেলা জজদের পদোন্নতি না হওয়ায় তাঁরও পদোন্নতি হচ্ছে না। অথচ অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে পদোন্নতির জন্য যে চাকরিকাল অতিক্রান্ত হওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি দিন চাকরি করছেন তিনি। এভাবে পদোন্নতি বঞ্চিত থেকে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েছেন।


মন্তব্য