kalerkantho


লালন স্মরণোৎসব

সাধু গুরু ভক্তে মুখর ছেঁউড়িয়া

তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া   

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সাধু গুরু ভক্তে মুখর ছেঁউড়িয়া

মরমি বাউল সাঁই লালনের সাধনভূমি কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় সাধু-গুরু-ভক্তরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

তাদের কারো হাতে একতারা, কারো হাতে ঢোল আর কারো হাতে বাঁশি। সাংসারিক স্বার্থ হাসিলের কোনো চিন্তা নেই তাদের মনে। তাদের একটাই চিন্তা—গুরুর দর্শন লাভ।

কাল দিনভর আখড়াবাড়ির আঙিনায় ভিড় করেছে হাজার হাজার মানুষ। মরমি বাউল সাঁই লালন শাহ জীবনভর মানুষের ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন।

সাধু, গুরু ও ভক্তদের পদচারণে মুখর এখন লালনের সাধনভূমি কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া। আখড়াবাড়িতে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় শুরু হয়েছে লালন স্মরণোৎসব। তিন দিনব্যাপী এ উৎসব চলবে আগামীকাল সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত।

গতকাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. জহির রায়হানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ ফারুক হোসেন। মুখ্য আলোচক ছিলেন অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে আসা বাউল-সাধকরা চাল-জল গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক আচার শুরু করে।

রাতে ছিল অধিবাস গ্রহণ। আজ রবিবার সকালে বাল্য-সেবা ও দুপুরে পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে তারা সাধুসঙ্গ শেষ করবে।

স্মরণোৎসব উপলক্ষে ছেঁউড়িয়ায় আখড়াবাড়িতে ভিড় জমেছে ভক্ত, সাধু ও দর্শনার্থীদের। আখড়াবাড়ির ভেতরে বসেছে বাউল-ফকিরদের আসর আর কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে বসেছে বিশাল

মেলা। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা দোকানিরা পসরা সাজিয়ে বসেছে। সেখানে লালনমঞ্চে চলছে আলোচনা, রাতভর চলবে লালনের গান। লালন একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ উৎসবের আয়োজন করেছে।

লালনের মাজারের প্রধান খাদেম মোহাম্মদ আলী শাহ ফকির জানান, ‘ভাববাদী লৌকিক ধর্মের স্রষ্টা বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁই। জীবদ্দশায় এমন ফাল্গুনের জ্যোত্স্নালোকে দোলপূর্ণিমা উৎসব করতেন তিনি। অনুষ্ঠানটি তিনি পাঁচ ঘর নিয়ে করতেন। নিজের ঘর, দেলবার সাঁই, চৌধুরী সাঁই, পাঞ্জু সাঁই ও মহিম সাঁইজির ঘর নিয়ে। লালন ফকিরের সাধুসংঘের ধারা অনুসারে তাঁর ভক্ত-অনুসারীরা প্রতিবছর দোলপূর্ণিমায় দোল-উৎসব উদ্যাপন করত। সেই পরম্পরা চলছে এখনো। ছেঁউড়িয়ার কালীগঙ্গা নদীর তীরে এমনই একদিনে লালন সাঁইজির আবির্ভাব ঘটেছিল। ’

পাবনার মুলাডুলি থেকে আসা বাউল রুহুল শাহ বলেন, ‘আসি আত্মশুদ্ধি লাভের আশায়। সাধন-ভজনের মধ্য দিয়ে সব পাপ ধুয়েমুছে পবিত্র হতে। ’

ফরিদপুর থেকে আসা নিজাম শাহ বলেন, ‘এখানে আসি নিজেকে চেনার জন্য এবং সাধু-গুরুদের সঙ্গে মহামিলনের জন্য। ’

ফরিদপুরের হৃদয় শাহ বলেন, ‘সাঁইয়ের গানের মাঝেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টির রহস্য। সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক তাঁর গানের মূলমন্ত্র। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষকে একই স্রোতধারায় আনার জন্য আমরণ কাজ করেছেন তিনি। ’

মানিকগঞ্জ থেকে আসা ফকির বাদল শাহ বলেন, ‘মরমি সাধক বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁই বাঙালির চেতনায় এক অবিস্মরণীয় কালপুরুষ। লালন সাঁইয়ের সংগীত আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তাই আমি নিয়মিত এখানে আসি। ’

লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক সেলিম হক জানান, লালনের মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা প্রেরণা জোগায় ভক্তদের। অধ্যাত্ম-সাধনার নিগূঢ় পদ্ধতি শিষ্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর গানের মাধ্যমে। উৎসবে সেই নিগূঢ় তত্ত্ব, সাধন-প্রণালী জানতে পারে ভক্তরা।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মেহেদী হাসান বলেন, ‘গতবারের তুলনায় এবার অনেক বেশি সাধু-গুরু-ভক্ত এসেছে আখড়াবাড়িতে। সারা রাত তারা সাধুসঙ্গ করবে, সাঁইজিকে স্মরণ করবে। তাদের নিরাপত্তায় আমরা পর্যাপ্ত শক্তি নিয়োগ করেছি আখড়াবাড়ি ও আশপাশে। ’

লালন একাডেমির সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. জহির রায়হান বলেন, ‘মহামতী ফকির লালন শাহ তাঁর দর্শনে জাত-পাত ও ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে শুধু মানুষের কথা বলেছেন। সোনার মানুষ হতে হলে সহজ মানুষকে ভজতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা ছেঁউড়িয়ায় স্মরণ উৎসব উদ্যাপন করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। ’


মন্তব্য