kalerkantho


ঠেঙ্গার চর নিয়ে চট্টগ্রাম নোয়াখালী টানাটানি

রাশেদুল তুষার, ঠেঙ্গার চর ঘুরে এসে   

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ঠেঙ্গার চর নিয়ে চট্টগ্রাম নোয়াখালী টানাটানি

সরকার ঠেঙ্গার চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এখন আলোচিত বঙ্গোপসাগরের চরটি। প্রায় এক যুগ আগে জেগে ওঠা ১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের চরটি এখনই বসবাসের উপযোগী কি না তা নিয়ে চলছে আলোচনা। এরই মধ্যে চরটি কোন জেলার অংশ তা নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের মধ্যে। উভয় পক্ষই এটিকে নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৪ সালে সরকারি সিদ্ধান্তে ৬০টি মৌজার ৬০০ বর্গমাইলের সন্দ্বীপ উপজেলা নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রাম জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। ওই সময় জেলার সংশোধিত মানচিত্রও চূড়ান্ত করা হয়। যদিও সেই অনুযায়ী সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়নি। ফলে জাহাইজ্যার চর (বর্তমানে স্বর্ণদ্বীপ), উরির চর নিয়ে নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে সীমানা বিরোধ রয়েছে। এই সীমানা বিরোধে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ঠেঙ্গার চর।

সূত্র জানায়, সন্দ্বীপ উপজেলা থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরত্বে জেগে ওঠা নতুন এ চরের অবস্থান হলেও এর যাবতীয় দাপ্তরিক কাজ হয় নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে। কিন্তু সন্দ্বীপের মানুষ ঠেঙ্গার চরকে ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ভাঙনে বিলুপ্ত হওয়া ‘ন্যায়ামস্তি’ ইউনিয়ন হিসেবেই দাবি করে।

এ নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে আন্দোলন করছে সন্দ্বীপবাসী। সবশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সন্দ্বীপ থেকে নৌ-শোভাযাত্রা করে ঠেঙ্গার চরে ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নের সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয় তারা।

জাহাইজ্যার চর, উরির চর ও ঠেঙ্গার চরের নতুন ভূমির সীমানা সন্দ্বীপের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করতে হাইকোর্টে রিটও করেছেন সন্দ্বীপের কালাপানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল হক চৌধুরী বায়রন। তিনি জানান, ১৯১৩-১৬ সালে করা সিএস ম্যাপ অনুযায়ী সন্দ্বীপের মূল ভূখণ্ডের আয়তন ছিল ৬০০ বর্গমাইল। সেই জরিপ অনুযায়ী সীমানা চূড়ান্ত করা হলে এই চরগুলো সন্দ্বীপের আওতায় থাকে।

এদিকে হাতিয়া উপজেলার লোকজনও ঠেঙ্গার চরকে নিজেদের অধীনে রাখতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এই দুই উপজেলার সাধারণ মানুষের পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনও চরটিকে নিজেদের অধীনে নিতে তত্পর। নথি হিসেবে তারা তুলে ধরছে সরকারি বনায়নের গেজেট নোটিফিকেশনের কাগজপত্র।

এ প্রসঙ্গে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. গোলাম জাকারিয়া বলেন, ‘সন্দ্বীপের বন বিভাগ কয়েক বছর আগে সেখানে বনায়ন করেছে। বনায়ন করার সরকারি গেজেট নোটিফিকেশন আমাদের কাছে রয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এবং সিএস নকশার কাগজপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটা সন্দ্বীপেরই একটা অংশ। ’

নথিতে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জুন ১৩-১৯/২০১১(অংশ)/১৪৬৬ নম্বর স্মারকের গেজেটে সন্দ্বীপ অংশে ন্যায়ামস্তি মৌজার নাম উল্লেখ করে এই চরের সাত হাজার একর ভূমির মধ্যে তিন হাজার ৭০০ একর ভূমিতে ‘সংরক্ষিত বন এলাকা’ হিসেবে ৬ ধারা জারি করা হয়।

প্রায় একই দাবি হাতিয়ার ইউএনও মো. রেজাউল করিমের। তিনি বলেন, ‘হাতিয়ার নলখিরা যে ফরেস্ট রেঞ্জ সেখান থেকে এই চরে বনায়ন করা হয়েছে। সেই বিবেচনায় এটা বরাবরই হাতিয়ার অংশ এবং হাতিয়া থেকে এর যাবতীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ’

স্থানীয় লোকজনের কাছে ঠেঙ্গার চর নামে পরিচিত থাকলেও শ্রুতিমধুর ও সৌন্দর্যবৃদ্ধি করার জন্য নোয়াখালীর বর্তমান জেলা প্রশাসক বদরে মুনির ফেরদৌসের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এই চরের নাম ‘চরমুনির’ করা হচ্ছে। এ জন্য জেলা প্রশাসক গত ৪ জানুয়ারির ০০.৪২.৭৫০০.০২২.৪৬.০৩০.১৬—৩৬ নম্বর স্মারকে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর চরটির নাম চরমুনির করার প্রস্তাব দেন।

নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক বদরে মুনির সরকারি সফরে অস্ট্রেলিয়া থাকায় বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে আছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক ড. মাহে আলম। ঠেঙ্গার চরের মালিকানা প্রসঙ্গে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, রেকর্ড জরিপের তথ্যমতেই এটা নোয়াখালীর হাতিয়ার অন্তর্ভুক্ত। গত দেড় বছর ধরে এই চরের যাবতীয় কাজকর্ম নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অন্য কেউ দাবি করলে দালিলিক কাগজপত্র থাকতে হবে। ’

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরেফিনও এখন সরকারি সফরে চীনে রয়েছেন। জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (ভূমি অধিগ্রহণ) মো. দৌলতুজ্জামান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তজেলা সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের। আমি যতটুকু জানি ঠেঙ্গার চরসহ সন্দ্বীপের অন্যান্য চরের সঙ্গে নোয়াখালী জেলার সীমানা বিরোধ নিয়ে বিভাগীয় কমিশনার চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ভূমি রেকর্ড অধিদপ্তরকে দিয়ারা জরিপ করার জন্য চিঠি দিয়েছেন। এই জরিপ হলেই বলা যাবে কে নদী সিকস্তি আর কে নদী পয়স্তি। ’

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ফেব্রুয়ারি মাসের আইন-শৃঙ্খলা সভায় ঠেঙ্গার চরের মালিকানা নিয়ে সন্দ্বীপবাসীর ক্ষোভ ও উত্তেজনার বিষয়টি তুলে ধরেন সন্দ্বীপের ইউএনও মো. গোলাম জাকারিয়া। তখন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক সরেজমিনে একটি রিপোর্ট দেওয়ার নির্দেশনা দেন। গত শনিবার ওই রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মো. গোলাম জাকারিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরো চরটি একসময় সন্দ্বীপের বিলীন হওয়া ন্যায়ামস্তির চর হিসেবে বন বিভাগের রেকর্ডে রয়েছে। সেই কাগজপত্রও রিপোর্টের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। ’


মন্তব্য