kalerkantho


প্রদর্শনী

পাটপণ্যে সুদিনের বার্তা

মোশতাক আহমদ   

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পাটপণ্যে সুদিনের বার্তা

জাতীয় পাট দিবস উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে দুই দিনব্যাপী পাটপণ্য মেলায় বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখছেন ক্রেতারা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রপ্তানি পণ্যের অন্যতম খাত হিসেবে পাট একসময় পেয়েছিল সোনালি আঁশের খেতাব। দিনে দিনে সেই সোনালি আঁশ আন্তর্জাতিক বাজার হারিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় খাতটি ধীরে ধীরে মুখ থুবড়ে পড়েছে। পাট চাষে আগ্রহ হারিয়েছে বাংলার কৃষকও। অতীতের সেই গৌরবময় অবস্থানে পাটকে নিয়ে যেতে চলছে নানামুখী উদ্যোগ। এরই অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে শুরু হয়েছে পাটপণ্যের বিশেষ প্রদর্শনী।

রাজধানীর ফার্মগেটের অনতিদূরে খামারবাড়িতে বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন ঘেঁষে বিশাল জায়গা জুড়ে বসেছে তিন দিনব্যাপী এই পাটপণ্যের মেলা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এ মেলার উদ্বোধন করেন।

ফার্মগেট থেকে খামারবাড়ির দিকে যেতে হাতের ডানে তাকালে মনে হবে যেন কোনো পাটের বাড়ি। পুরো আয়োজনে সাজসজ্জায় পাটের উপস্থিতি। মেলার প্রবেশপথের সুবিশাল গেটটিও পাটে মোড়ানো।

আর ভেতরে ঢুকলে তো কথাই নেই, সব কিছুতেই সোনালি আঁশের ব্যবহার। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই আঙিনায় একই সঙ্গে ৬০টি স্টলে পাটের রকমারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

পাট দিয়ে যে দৃষ্টিনন্দন ও কারুকার্যময় এত কিছু তৈরি করা সম্ভব তা এই প্রদর্শনীতে একবার ঢুঁ না মারলে পুরোপুরি উপলব্ধি করা যাবে না। কী নেই এ আয়োজনে? খেলনা, ঘর সাজানোর নানা সামগ্রী, নিত্যব্যবহার্য নানা জিনিসের বিশাল আয়োজন এক ছাদের নিচে। যে কেউ একবার দেখলেই নিজের করে পেতে ইচ্ছা করবে। প্রদর্শনীতে সরাসরি পাট থেকে বুননের আয়োজনও রাখা হয়েছে। আর আগতরা প্রতিটি জিনিসে হাত রাখছে; দেখছে মুগ্ধতার দৃষ্টি নিয়ে।

ব্যাংকার স্বামীর হাত ধরে মেলায় এসেছিলেন সালিমা। দুজনে হাত ধরাধরি করে ঢুকলেন একটি আঙিনায়। ভেতরে ঢুকেই যেন দ্বিধায় পড়ে গেলেন সদ্য বিবাহিত সালিমা। সবই পছন্দ হচ্ছে। কোনটা ছেড়ে কোনটা কিনবেন—এমন অভিব্যক্তিতে একে একে পণ্যগুলো নাড়াচাড়া করছেন। কিনছেনও দুই হাতে।

কী কিনলেন—এই প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন দুজনই। কথা বললেন ব্যাংকার স্বামী আফজাল—‘ভাই, পাটের এই চিরচেনা গন্ধটা অনেক দিন পাইনি। মেলায় এসেছিলাম সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে পাটের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। এখন তো সবই কিনতে ইচ্ছে করছে!’ আধঘণ্টা পর দেখা গেল, এই দম্পতির দুই হাতে পাটে তৈরি জিনিসপত্র আর ধরছে না। তাঁরা একে একে কিনে নিয়েছেন কিচেন টাওয়েল, নকশাখচিত ব্যাগ, পাদুকা, টেবিল ক্লথ, থ্রিপিস, হালকা শাড়িসহ আরো বেশ কিছু পাটপণ্য।

মেলা প্রাঙ্গণে দেখা গেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থীকেও। অনেকে অফিসের সময় বাঁচিয়ে একটু আগেই এসে ঢুকে পড়েছেন মেলায়। কিছু দম্পতি সন্তান সঙ্গে নিয়ে মেলা ঘুরে প্রয়োজনের জিনিস কিনেছেন। সন্তানের হাতভর্তি পাটের তৈরি নানা খেলনা।

 মনোরম পরিবেশে মেলার আঙিনায় একেকটি স্টল যেন একেকটি পাটঘর। সবই যেন সোনালি আঁশে তৈরি এক খণ্ড এতিহ্য। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি স্টলই ক্রেতা-দর্শনার্থীর পদচারণে জমজমাট। পুতুল, স্যান্ডেল, কার্পেট, শোপিস, স্লিপার, ফুলদানি, হরেক খেলনা, ওয়াল ম্যাট, বিভিন্ন রকমের ব্যাগ, শতরঞ্জিসহ নানা ধরনের পাটপণ্য কিনতে স্টলে স্টলে ভিড় করছে আগতরা। বিশেষত বিভিন্ন বয়সের নারীদের পদচারণ ছিল চোখে পড়ার মতো।

মেলার ৩০ নম্বর স্টলে বাহারি সব পাটপণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে পঞ্চগড়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হ্যান্ড টাচ। স্টলটি ঘিরে নানা বয়সী ক্রেতা-দর্শনার্থীর ভিড়। ক্রেতা সামলানোর ব্যস্ততার ফাঁকে কথা হলো স্টল মালিক মোহাম্মদ আলী খানের সঙ্গে। জানা গেল, এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি পাটের কাপড় বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। সে তুলনায় দেশের বাজারে বিক্রি কিছুটা কম। জানালেন, পাটে তৈরি এক গজ থান কাপড়ের দাম পড়ছে মাত্র ২০০ টাকা। শাড়ি দেড়-দুই হাজার বা সামান্য একটু বেশি। হ্যান্ড টাচের মালিক বললেন, ‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলার পাটপণ্য বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এখন আমাদের পঞ্চগড়ের কারখানায় পাট দিয়ে ১৮০ রকমের পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। ’

মেলার আয়োজক বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বললেন, ‘আমরা মূলত পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছি। সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাটপণ্যের এ মেলা সেই উদ্যোগেরই অংশ। ’ তিনি জানালেন, মেলা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই আয়োজন শেষ হবে আগামী শনিবার রাত ৮টায়।


মন্তব্য