kalerkantho


ঝালকাঠি ও রাজশাহীতে চুরির অপবাদ

মা-মেয়ে ও দুই ছাত্রকে গাছে বেঁধে নির্যাতন

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ও ঝালকাঠি প্রতিনিধি   

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মা-মেয়ে ও দুই ছাত্রকে গাছে বেঁধে নির্যাতন

রাজশাহীতে দুই কিশোরকে এভাবে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয়।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার আগরবাড়ী গ্রামে মোবাইল ফোন চুরির অপবাদ দিয়ে মা ও মেয়েকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করেছে প্রতিবেশী দেলোয়ার হোসেন। এ সময় নাতনি দুই বছরের শিশুও আহত হয়। গত বুধবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। মা-মেয়ে-নাতনিকে উদ্ধার করে ওই দিন রাতে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা এখন হাসপাতালে বেডে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

এদিকে রাজশাহীর দুর্গাপুরে ছাগল চুরির অভিযোগে দুই স্কুল ছাত্রকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ঝালুকা ইউনিয়নের দুই সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে মামলার প্রধান আসামি ইউপি চেয়ারম্যান পলাতক রয়েছেন।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন ঝালুকা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য ও আন্দুয়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মোতালেব (৪৮) এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য ও হাড়িয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল লতিব মির্জা (৪৫)।

ঝালকাঠির ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার দুপুরে আগড়বাড়ী গ্রামের মুদি দোকানদার দেলোয়ার হোসেনের মেয়ের বিয়ের দিন ছিল। বিয়েতে নিমন্ত্রণ পেয়ে অংশ নেয় মা রোকেয়া বেগম, মেয়ে নারগিস বেগম ও নারগিসের দুই বছরের শিশু স্বর্ণা। বিকেলে বিয়েতে আসা এক বরযাত্রীর স্মার্টফোন হারিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। কনের বাবা দেলোয়ার হোসেন মোবাইল চুরির অপবাদ দেয় ওই মা-মেয়েকে। এ ঘটনা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে পাঁচ দিন ধরে ঝগড়া-বিবাদ চলতে থাকে। এর মধ্যে গত বুধবার বিকেলে দেলোয়ার ও তার নাতি জুয়েল লোকজন নিয়ে মা-মেয়েকে ধরে নিয়ে যায় অন্য এক প্রতিবেশীর বাড়িতে। সেখানে প্রথমে তাদের বাঁশের লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। একপর্যায়ে মা-মেয়েকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়। এ সময় মেয়ের কোলে থাকা দুই বছরের নাতনি শিশু স্বর্ণাও গুরুতর আহত হয়।

গতকাল সকালে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মহিলা ওয়ার্ডের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন রোকেয়া বেগম ও তাঁর মেয়ে নারগিস। তাঁদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শিশু স্বর্ণার মাথায়ও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হাসপাতালে মা রোকেয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ টাচ মোবাইল (স্মার্টফোন) নিয়া কী করমু। মিথ্যা অপবাদ দিয়া আমাগো সম্মানহানি করছে। এতেও থামে নাই তারা। আমারে ও আমার মেয়েরে গাছের লগে বাইন্দা রশি দিয়া পিটাইছে। এর আগে বাঁশের লাঠি দিয়াও মারছে। ’ আহত মেয়ে নারগিস বলেন, ‘আমরা কান্নাকাটি করলেও তারা মারধর করতে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ আসছে, এমন খবর পেয়ে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে আমরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় হাসপাতালে ভর্তি হই। ’ নারগিসের স্বামী সুমন সিকদার বলেন, ‘আমরা থানায় মামলা করব। পরিবারের সবার সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা চলছে। ’

আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা গোলাম ফরহাদ বলেন, দুই নারী ও এক শিশুকে বুধবার রাতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পিটিয়ে আহত করার চিহ্ন রয়েছে। তাঁদের চিকিৎসা চলছে।

তবে অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন বলে, ‘আমার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের এক বরযাত্রীর একটি স্মার্টফোন চুরি হয়। আমাদের ধারণা, রোকেয়া ও তাঁর মেয়ে ফোনটি চুরি করেছে। কিন্তু তারা স্বীকার পাচ্ছে না। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে, কোনো মারামারি হয়নি। ’

ঝালকাঠি থানার উপপরিদর্শক ফারুক হোসেন বলেন, ‘বুধবার রাতে পুলিশ ওই এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে মারামারির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের হাসপাতালে পাঠায়। এ সময় আহতদের ছাড়া অন্য কাউকে দেখা যায়নি। এ ঘটনায় এখনো কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। ’

রাজশাহীতে দুই স্কুল ছাত্রকে নির্যাতন : রাজশাহীর দুর্গাপুরে ছাগল চুরির অভিযোগে দুই স্কুল ছাত্রকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দুই ইউপি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মামলার প্রধান আসামি ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোজাহার আলীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ বলেছে, তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিনি উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে একটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বলে প্রত্যাক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার রাতে আন্দুয়া গ্রামের রেজাউলের বাড়ি থেকে একটি ছাগল চুরি হয়। পরের দিন ভোর ৫টায় জার্জিস ও রতন নামের ওই দুই ছাত্র ছাগল বিক্রির উদ্দেশ্যে পবার কাটাখালী বাজারের দিকে যাচ্ছিল। পথে হরিয়ান বাজার দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের আটক করে নৈশ প্রহরী। পরে ওই দুই ছাত্র চুরির বিষয়টি স্বীকার করে। এরপর খবর পেয়ে আবদুল মোতালেব সকাল ৭টার দিকে হরিয়ান বাজারে গিয়ে তার জিম্মায় নিয়ে আসে জার্জিস ও রতনকে। এরপর সকাল ১১টার দিকে ছাগল মালিক রেজাউলের বাড়ির পাশে সালিস বসানো হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় চেয়ারম্যান মোজাহার আলী মণ্ডল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সালিস বৈঠকে ওই দুই কিশোরকে গাছের সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক পেটানোর নির্দেশ দেন চেয়ারম্যান মোজাহার আলী। এরপর স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য আবদুল মোতালেব প্রথমে লাঠি দিয়ে পেটান দুই স্কুল ছাত্রকে। নির্যাতনের পর দুই কিশোরের পরিবারের লোকজনকে খবর দেওয়া হয়। পরিবারের লোকজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে দুই পরিবারের কাছ থেকে ১৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এর মধ্যে দুই হাজার ৫০০ টাকা তুলে দেওয়া হয় ছাগল মালিককে। বাকি টাকা ইউপি সদস্য আবদুল মোতালেবের কাছেই রেখে দিতে বলেন চেয়ারম্যান মোজাহার আলী। পরে  জার্জিস ও রতনকে পরিবারের লোকজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এদিকে সালিস বৈঠকে নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজ রাতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে বুধবার রাতে নির্যাতনের শিকার স্কুল ছাত্র জার্জিসের বাবা জিয়াউর রহমান বাদী হয়ে ইউপি চেয়ারম্যান মোজাহার আলী ও দুই ইউপি সদস্যকে প্রধান আসামি করে মোট আটজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন।

নির্যাতনের শিকার উপজেলার হাড়িয়াপাড়া গ্রামের জিয়াউর রহমানের ছেলে জার্জিস হোসেন (১৫) ও পলাশবাড়ী গ্রামের সেকু আলীর ছেলে রতনকে (১৫) গতকাল সকালে দুর্গাপুর থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। জার্জিস ও রতন উপজেলার আমগাছি সাহার বানু উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। তবে তারা দুজনই তাদের নানার বাড়ি আন্দুয়া গ্রামে থাকত।

এ ব্যাপারে ইউপি সদস্য আবদুল মোতালেব বলেন, ‘ছাগল চুরির কথা প্রথমে তারা স্বীকার না করায় তাদের গাছে বেঁধে রাখা হয়। তবে তাদের নির্যাতন করা হয়নি। ’ তবে সালিসে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করলেও ইউপি চেয়ারম্যান মোজাহার আলী মণ্ডল দুই স্কুল শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের হুকুম দেননি বলে দাবি করেন।

দুর্গাপুর থানার ওসি রুহুল আলম জানান, ওই ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। মামলা দায়েরের পর দুপুরে অভিযান চালিয়ে দুই ইউপি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে চেয়ারম্যান পলাতক রয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।


মন্তব্য