kalerkantho


লিবিয়া থেকে ফিরল ২৭ জন

কারাগারে অন্ধকার কক্ষে দিন-রাত নির্যাতন চলত

বন্দি আছে আরো কয়েক শ

সরোয়ার আলম   

৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



কারাগারে অন্ধকার কক্ষে দিন-রাত নির্যাতন চলত

সহায়-সম্পদ বিক্রি করে দালাল ধরে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন মাদারীপুরের রুহুল আমিন খান। তবে সেখানে গিয়ে পড়তে হয়েছিল চরম বিপদের মুখে।

দালালের প্রতারণায় প্রায় সাত মাস কারাবন্দি থাকতে হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে একবারের জন্যও পেটে ভাত পড়েনি। অন্ধকার কক্ষে রেখে চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন। পানি চাইলে প্রস্রাব পানের কথা বলত কারারক্ষীরা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলতে দেয়নি।

গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে কালের কণ্ঠ’র কাছে এসব কথা জানান রুহুল আমিন। তাঁর মতো আরো ২৬ জন গতকাল ভোরে দেশে ফিরেছে। পরে এ বিষয়ে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।

এদিকে র‌্যাব ও পুলিশ অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েছে, বিদেশে মানবপাচারকারীর সঙ্গে শাহজালাল ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পুলিশসহ সিভিল এভিয়েশনের অন্তত ৬৭ জন জড়িত।

এরই মধ্যে তাদের একটি তালিকা করা হয়েছে। তালিকাটি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। দালালচক্র স্বল্প আয়ের লোকজনকে প্রলোভন দেখিয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের যোগসাজশে বিদেশে পাঠিয়ে সর্বস্বান্ত করছে।   

দেশে ফেরা ওই ২৭ জন জানায়, লিবিয়ায় গিয়ে কয়েক শ বাংলাদেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তারা সেখানে কারাবন্দি আছে। কারাগারের কক্ষগুলোতে ২৪ ঘণ্টাই অন্ধকার থাকে। লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটানো হয়। বাংলাদেশি দালালরা লিবিয়ার দালালদের সঙ্গে এক হয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। লিবিয়ায় যাওয়া বাংলাদেশিদের অনেককে অপহরণ করেও দালালরা বাংলাদেশ থেকে মুক্তিপণ আদায় করছে। দূতাবাসের কেউ তাদের খোঁজ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করে তারা।

আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে লিবিয়া থেকে ৩৪ জনকে বাংলাদেশে ফেরত এনেছে র‌্যাব। গতকাল যারা ফেরত এসেছে তারা হলো টাঈাইলের আমিনুর ইসলাম, রনি মিয়া, পাবনার মাইদুল ইসলাম, বাবু, মোহন আলী, মাগুরার আনোয়ার হোসেন, নারায়ণগঞ্জের ফালান মিয়া, নওগাঁর আব্দুল মতিন, কুড়িগ্রামের আবুল হোসেন, চাঁদপুরের মনির, মানিকগঞ্জের রেজাউল করিম, মোহাম্মদ আলম, গোপালগঞ্জের শেখ রনি, মাহাবুবুল শেখ, বাচ্চু মিয়া, কামরুজ্জামান, মাদারীপুরের ইসরাফিল সিকদার, রুবেল মুন্সি, সুরুজ মিয়া, রাজিব মাতুব্বর, আলমগীর শেখ, ইলিয়াস মাতুব্বর, বাবু খলিফা, সোহান খান, রনি মুন্সি, মাহাবুব খালাসি, রবিউল ব্যাপারী, জাহিদুল ফকির, আহামেদ আলী, আসাদুল ইসলাম, রুহুল আমিন খান, কুষ্টিয়ার রবিউল ইসলাম, জামির আলী, শরীয়তপুরের মতিউর রহমান, বরিশালের মোহাম্মদ আলী, বগুড়ার করিম মণ্ডল ও খুলনার রাসেল মাতুব্বর।

রুহুল আমিন খান বলেন, ‘প্রায় সাত লাখ টাকা দেওয়ার পর দালালচক্র আমাকে স্টুডেন্ট ভিসা দেয়। গত বছরের জুনে চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর হয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তুরস্কে। সেখান থেকে লিবিয়া। দালালরা সেখানে আমাকে নোয়াখালীর সোহাগের হাতে তুলে দেয়। সোহাগের সঙ্গে লিবিয়ার পুলিশ ও দালালদের ভালো সম্পর্ক আছে। তারা কাজ না দিয়ে আমার গ্রামের বাড়িতে পরিবারের কাছে ফোন করে আরো দুই লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না পেয়ে তারা আমাকে পুলিশে দেয়। কারাগারে রাখা হয় কনডেম সেল। চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। লোহার রড দিয়ে পা ও মাথায় আঘাত করে অজ্ঞান করে ফেলত। লিবিয়ার বিভিন্ন কারাগারে কয়েক শ বাংলাদেশি আটক রয়েছে। ’ মাদারীপুরের আহমেদ আলী বলেন, ‘ছয় লাখ করে টাকা নিয়ে স্থানীয় দালাল আমিসহ ১০ জনকে ঢাকায় আরেক দালাল মাহবুবের কাছে পাঠায়। মাহবুব গত বছর আমাদের পাঠায় লিবিয়ায়। বিমান থেকে নামার পরই লিবিয়ান কয়েকজন নাগরিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি একটি কক্ষে নিয়ে যায়। এরপর নির্যাতন করে পরিবারের কাছ থেকে আরো টাকা হাতিয়ে নেয় তারা। পরে ট্রলারে করে ইতালির উদ্দেশে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সাগরে টহল পুলিশ আটক করে আমাদের কারাগারে নিয়ে যায়। ছয় মাস ছয় দিন জেল খাটতে হয়। ’

শরীয়তপুরের মতিউর রহমান জানান, গত বছরের জুনে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে দালালরা তাঁকে লিবিয়ায় পাঠায়। যাওয়ার পরপরই তাঁকে কারাগারে নিয়ে যায় পুলিশ। প্রায় সাত মাস কারাগারে থাকতে হয়েছে। অন্ধকার রুমে রেখে নির্যাতন করত। পানির পরিবর্তে প্রস্রাব পান করতে বলত।

দালালচক্র প্রসঙ্গে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। লিবিয়া থেকে যাদের ফেরত আনা হয়েছে তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। যারা তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল তাদের ধরা হবেই। তিনি লোকজনকে সব জেনেশুনে তারপর বিদেশ যেতে বলেছেন।  

র‌্যাব সূত্র জানায়, গত ১ মার্চ রাতে র‌্যাব-৩-এর একটি টিম শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে উদ্ধার করে। দালালচক্র তাদের ইন্দোনেশিয়া দিয়ে মালয়েশিয়া পাঠাতে চেয়েছিল। উদ্ধার পাওয়াদের তথ্যের ভিত্তিতে ৭ মার্চ আন্তর্জাতিক পাচারকারীচক্রের অন্যতম সদস্য শফিকুল ইসলাম ওরফে গুরু, তানজিম ও আবুল বাশারকে গ্রেপ্তার করা হয়। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, ট্যুরিস্ট ভিসার মাধ্যমে তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশে মানবপাচার করছে। টাঙ্গাইল পাবনা, মাগুরা, নওগাঁ, যশোর ও ঢাকার আশপাশের লোকাল এজেন্টদের মাধ্যমে গত এক বছরে সহস্রাধিক লোককে তারা বিদেশে পাঠিয়েছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের ১০ কর্মকর্তা, এপিবিএন ও সিভিল এভিয়েশনের অনেকে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত।

 


মন্তব্য